যুক্তরাজ্যে আইএলআর নিয়ে মন্ত্রিসভায় দ্বন্দ্ব: অনিশ্চয়তায় হাজারো বাংলাদেশি 

যুক্তরাজ্যে স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি বা ইনডেফিনিট লিভ টু রিমেইন (আইএলআর) পাওয়ার কঠোর নতুন নিয়ম প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে লেবার সরকারের মন্ত্রিসভায় মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। লিভারপুলে ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির বার্ষিক সম্মেলনের প্রাক্কালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদের কঠোর অভিবাসন নীতির সরাসরি বিরোধিতা করেছেন কমিউনিটিজ সেক্রেটারি অ্যাঞ্জেলা রেনার। নতুন এই প্রস্তাবে কেয়ার ভিসাসহ নির্দিষ্ট কিছু খাতে স্থায়ী আবাসন পাওয়ার ন্যূনতম সময়সীমা ৫ বছর থেকে বাড়িয়ে সর্বোচ্চ ১৫ বছর করার সুপারিশ করা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাজ্যে কেয়ার ও বিভিন্ন দক্ষ পেশায় কর্মরত হাজার হাজার বাংলাদেশি কর্মী এবং তাদের পরিবার চরম উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার মধ্যে সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় দিন গুনছেন।

জানা গে‌ছে সম্মেলনে যোগ দিতে দলটির শীর্ষ নেতারা যখন মার্সি সাইডে একত্রিত হচ্ছেন, ঠিক তখনই সরকারের অভ্যন্তরীণ এই মতপার্থক্য প্রকাশ্য রূপ নিল।

সম্মেলনের আগে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে অ্যাঞ্জেলা রেনার জানান, করোনা-পরবর্তী সময়ে কর্মী সংকট মেটাতে যেসব বিদেশি কর্মী যুক্তরাজ্যে এসেছেন, পেছনের তারিখ থেকে তাদের ওপর এই কঠোর নিয়ম চাপিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব তিনি কোনোভাবেই সমর্থন করবেন না। নতুন খসড়া অনুযায়ী, যেসব কেয়ার ওয়ার্কার পাঁচ বছর পর স্থায়ী বসবাসের আশা করেছিলেন, তাদের ক্ষেত্রে সময়সীমা তিন গুণ বাড়িয়ে ১৫ বছর করার কথা বলা হয়েছে। এই প্রস্তাবকে অন্যায্য ও ‘আন-ব্রিটিশ’ বা ব্রিটিশ মূল্যবোধবিরোধী আখ্যা দিয়ে রেনার বলেন, জাতীয় সংকটের সময়ে যারা যুক্তরাজ্যের দুর্বল নাগরিকদের সেবায় সাড়া দিয়ে পরিবার নিয়ে এখানে এসেছেন, কয়েক বছর পর তাদের জন্য নিয়মের শর্ত এভাবে বদলে দেওয়া যায় না।

এই নীতিগত বিরোধের পটভূমি তৈরি হয়েছে মূলত ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের শাসনামলে তৈরি হওয়া রেকর্ড অভিবাসনের হাত ধরে। সে সময় দেশটির আবাসিক ও গৃহভিত্তিক সেবা খাতের তীব্র সংকট কাটাতে ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে প্রায় ১ লাখ ৮৫ হাজার বিদেশি কেয়ার ওয়ার্কার নিয়োগ দেওয়া হয়, যার মধ্যে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মীও রয়েছেন। পাঁচ বছর কাজের পর যুক্তরাজ্যে স্থায়ী আবাসন (আইএলআর) পাওয়া যাবে- এমন সুস্পষ্ট শর্তেই তারা দেশটিতে এসেছিলেন।

তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই বিপুলসংখ্যক অভিবাসনের ফলে স্থানীয় অবকাঠামো, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আসন ও দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর মাত্রাতিরিক্ত চাপ পড়ছে। 

হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ১৬ লাখ মানুষের স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অভিবাসীর চাপ কমাতে ইতোমধ্যে পূর্ববর্তী প্রশাসন কেয়ারারদের পরিবার নিয়ে আসার সুযোগ বন্ধ করেছে এবং নতুন নিয়োগ স্থগিত করেছে। কিন্তু যারা ইতোমধ্যে যুক্তরাজ্যে অবস্থান করে সেবা দিচ্ছেন, তাদের ক্ষেত্রে পেছনের তারিখ থেকে মেয়াদ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত ব্যাপক আইনি ও নৈতিক বিরোধিতার জন্ম দিয়েছে।

এদিকে প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহামের নেতৃত্বাধীন সরকারে ফিরে আসার পরও নিজের পূর্ববর্তী অবস্থানে অনড় রয়েছেন অ্যাঞ্জেলা রেনার। তবে ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিট বা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ইঙ্গিত দিয়েছে, প্রস্তাবিত এই নীতি নিয়ে নতুন করে মূল্যায়ন চলছে। বিদেশি সোশ্যাল কেয়ার কর্মীদের এই বর্ধিত নিয়মের আওতামুক্ত রাখার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি প্রশাসনিক ন্যায্যতা বজায় রাখার কথা ভাবছে সরকার, যা হাজার হাজার বাংলাদেশি কেয়ারার ও তাদের পরিবারের জন্য নতুন আশার সঞ্চার করেছে।

সংসদ সদস্যদের মধ্যেও এই প্রস্তাব নিয়ে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। স্থানীয় কমিউনিটিতে কর্মরত বিদেশি কেয়ারারদের এই আইনের আওতামুক্ত রাখার দাবি জানিয়ে একটি যৌথ চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন লেবার পার্টির প্রায় একশ জন এমপি। এমপিদের আশঙ্কা, হাজারো দক্ষ পেশাজীবীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত করে তুললে সামাজিক সেবাকেন্দ্রে কর্মী সংকট আরও তীব্র হবে।

এরই মধ্যে যুক্তরাজ্যের বৃহত্তম পাবলিক সেক্টর ট্রেড ইউনিয়ন ‘ইউনিসন’ লিভারপুলে লেবার পার্টির সম্মেলনস্থলের বাইরে ব্যাপক বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে। ২৮ সেপ্টেম্বর কিংস ডকে অনুষ্ঠিতব্য এই সমাবেশে শত শত স্বাস্থ্য ও কেয়ার কর্মী অংশ নিয়ে ১৫ বছরের নিয়ম বাতিল, স্থায়ী বসবাসের সহজ পথ এবং নিয়োগকর্তাভিত্তিক ভিসার বদলে খাতভিত্তিক নিরাপদ ভিসার দাবি জানাবেন। ইংল্যান্ডের সোশ্যাল কেয়ার খাতে বর্তমানে প্রায় ১ লাখ ১১ হাজার পদ শূন্য রয়েছে এবং এ খাতের কর্মশক্তির প্রায় ৩০ শতাংশই বিদেশি কর্মী।

অন্যদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ তার ‘আর্নড সেটেলমেন্ট’ মডেলের পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেছেন, দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সংকট এড়াতে অভিবাসন ব্যবস্থার সংস্কার জরুরি। তবে তিনি আশ্বস্ত করেছেন যে, অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে দ্রুতই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হবে।

প্রস্তাবিত মডেলে স্থায়ী বসবাসের মূল সময়সীমা ৫ বছর থেকে বাড়িয়ে ১০ বছর করার কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে উচ্চ আয়ের পেশাজীবীদের জন্য ৩ থেকে ৫ বছরে এবং এনএইচএস-এর তালিকাভুক্ত চিকিৎসক ও শিক্ষকদের জন্য ৫ বছরে আইএলআরের সুযোগ রাখা হলেও, লেভেল-৬ এর নিচের পদমর্যাদায় থাকা সোশ্যাল কেয়ার কর্মীদের ক্ষেত্রে ১৫ বছর অপেক্ষার পাশাপাশি বি-২ লেভেলের ইংরেজি দক্ষতা অর্জনের শর্ত যুক্ত রয়েছে।

তবে বিতর্ক থাকলেও এনএইচএস স্বাস্থ্যকর্মী ও নির্দিষ্ট কিছু খাতে দক্ষ অভিবাসীদের জন্য ৫ বছর বা তার কম সময়ে দ্রুত স্থায়ী হওয়ার পথ বহাল রাখার আভাস মিলেছে। এছাড়া যারা ইতোমধ্যে যুক্তরাজ্যে কর্মরত রয়েছেন, তাদের ক্ষেত্রে এই নিয়ম শিথিল রাখার ব্যাপারেও আলোচনা চলছে। হোম অফিসও বর্তমান কর্মীদের ক্ষেত্রে একটি ভারসাম্যপূর্ণ রূপরেখা তৈরির কথা বিবেচনা করছে। হাউস অব লর্ডসের সংশ্লিষ্ট কমিটিও পেছনের তারিখ থেকে আইন কার্যকর করার বিরোধিতায় সরব হয়েছে। ফলে যুক্তরাজ্যের মূলধারার সেবায় নিয়োজিত বাংলাদেশি কর্মী ও তাদের পরিবারগুলোর জন্য শিগগিরই কোনও স্বস্তিদায়ক ঘোষণা আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।