ব্রিটিশ-বাংলাদেশি মেয়র লুৎফুর রহমানের নেতৃত্বাধীন পূর্ব লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের ‘ক্রমাবনতিশীল আর্থিক পরিস্থিতি’ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্বাধীন নিরীক্ষক বা অডিটররা। চলতি অর্থবছরে স্থানীয় এই বরো কাউন্সিলটি তাদের নির্ধারিত বাজেটের চেয়ে প্রায় ১৯ মিলিয়ন পাউন্ড অতিরিক্ত ব্যয়ের ঝুঁকিতে রয়েছে বলে সতর্ক করা হয়েছে। লন্ডনের প্রভাবশালী দৈনিক ইভনিং স্ট্যান্ডার্ড এর এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
বহুজাতিক পেশাদার নিরীক্ষা সংস্থা আর্নস্ট অ্যান্ড ইয়ং (ইওয়াই)-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বাজেটের এই বিশাল ঘাটতি মূলত ‘কার্যকর আর্থিক পরিকল্পনা এবং বাজেট নিয়ন্ত্রণের পরিপন্থী’। সংস্থাটি স্পষ্ট করে জানিয়েছে, এই অতিরিক্ত ব্যয় বরাদ্দের কারণে কাউন্সিলের বাজেট প্রণয়নের ভিত্তির নির্ভরযোগ্যতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
এর আগে গত জুলাই মাসে টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিল আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়, ২০২৭ সালের মার্চে শেষ হতে যাওয়া চলতি অর্থবছরে নির্ধারিত সীমার বাইরে গিয়ে তাদের অতিরিক্ত ব্যয় দাঁড়াতে পারে ১৯.২ মিলিয়ন পাউন্ডে। গত অর্থবছরেও কাউন্সিলটি বাজেটের চেয়ে ১৯.৪ মিলিয়ন পাউন্ড অতিরিক্ত খরচ করেছিল।
প্রতিবেদনে বলা হয়, এই অপরিকল্পিত ব্যয়ের সিংহভাগই তৈরি হয়েছে প্রাপ্তবয়স্ক ও শিশুদের সামাজিক সেবা এবং গৃহহীন পরিবারগুলোর জন্য অস্থায়ী আবাসনের ক্রমবর্ধমান খরচ ও চাহিদার কারণে যা আইনগতভাবে স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে নিশ্চিত করতে হয়।
যুক্তরাজ্যজুড়ে সামাজিক সেবার ক্রমবর্ধমান সংকট নিরসনে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। বর্তমানে সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থা পুরো ব্রিটেনের স্থানীয় প্রশাসন ও সাধারণ নাগরিকদের জীবনযাত্রার ওপর ভয়াবহ আর্থিক বোঝা তৈরি করেছে। ‘লন্ডন কাউন্সিলস’-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে রাজধানীর ৩৩টি কাউন্সিলের সম্মিলিত ঘাটতি ৫.২ বিলিয়ন পাউন্ডে পৌঁছাতে পারে এবং অর্ধেকেরও বেশি স্থানীয় কর্তৃপক্ষ দেউলিয়াত্বের চরম ঝুঁকিতে রয়েছে।
সংকট সামাল দিতে লন্ডনের নয়টি কাউন্সিলকে ব্রিটিশ সরকারের বিশেষ জরুরি আর্থিক ঋণ নিতে হয়েছে। এ ছাড়া বেশ কয়েকটি বরোকে স্থানীয় গণভোট ছাড়াই কাউন্সিল ট্যাক্স ৫ শতাংশের বেশি বাড়ানোর সরকারি অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
তবে টাওয়ার হ্যামলেটসের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, তাদের কাউন্সিল সরকারের কাছে কোনও জরুরি ঋণের আবেদন করেনি এবং কাউন্সিল ট্যাক্স নির্ধারিত সীমার ওপরে বৃদ্ধির কোনও অনুমোদনও চাওয়া হয়নি।
গত সপ্তাহে অডিট কমিটির বৈঠকে ইওয়াই-এর প্রতিনিধি স্টিফেন রিড জানান, কাউন্সিলের সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থাপনার পর্যালোচনা এখনও চলমান থাকলেও তাদের অডিট টিম ইতোমধ্যে টাওয়ার হ্যামলেটসের ‘আর্থিক কাঠামোর অবনতি’ স্পষ্ট দেখতে পেয়েছে।
কাউন্সিলের স্ট্র্যাটেজিক ও করপোরেট ফিন্যান্সের সিনিয়র ম্যানেজার ক্রিস লেসলি অতিরিক্ত ব্যয়ের ব্যাখ্যা দিয়ে জানান, অর্থবছর শেষের দিকে শিশুদের সামাজিক সেবার মতো ‘চাহিদাভিত্তিক সেবায়’ অপ্রত্যাশিত খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় এমন চাপ সৃষ্টি হয়েছে। ভবিষ্যৎ বছরগুলোতে বাস্তবসম্মত ও টেকসই বাজেট তৈরি করতে ব্যয়ের পূর্বাভাস ব্যবস্থায় সংস্কার জরুরি বলেও তিনি স্বীকার করেন।
অডিটরদের প্রতিবেদনে আরও সতর্ক করা হয়েছে যে, এই ধারাবাহিক বাজেট ঘাটতি কাউন্সিলের জরুরি সংরক্ষিত তহবিল বা ক্যাশ রিজার্ভের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। গত বছরের তুলনায় কাউন্সিলের অবাধ্যতামূলক রিজার্ভ ৫৫.৫ মিলিয়ন পাউন্ড থেকে নেমে ৪০.৫ মিলিয়নে দাঁড়িয়েছে এবং সামগ্রিক রিজার্ভ কমেছে ৫০ মিলিয়ন পাউন্ডেরও বেশি। এর ফলে ভবিষ্যতে যেকোনও বড় অর্থনৈতিক ধাক্কা বা জরুরি পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার সক্ষমতা অনেকটাই সংকুচিত হয়ে পড়বে।
এ প্রসঙ্গে টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের একজন মুখপাত্র বলেন, অস্থায়ী আবাসন এবং শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কদের সামাজিক সেবার যে আর্থিক ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, তা বিবেচনায় নিয়েই বাজেটে ৩০ মিলিয়ন পাউন্ডের বিকল্প তহবিল আলাদা করে রাখা হয়েছে। এই দূরদর্শী পদক্ষেপের ফলে অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ তৈরি হলেও কাউন্সিল নিজস্ব তহবিল থেকেই তা সমন্বয় করতে সক্ষম হবে।
মুখপাত্র আরও বলেন, টাওয়ার হ্যামলেটস প্রতি বছরই সফলভাবে ভারসাম্যপূর্ণ বাজেট প্রণয়ন করে। আমরা লন্ডনের সেই ১৪টি বরোর অন্তর্ভুক্ত নই, যাদের সরকারের জরুরি আর্থিক সহায়তা নিতে হয়েছে কিংবা ঘাটতি পূরণে ৫ শতাংশের বেশি ট্যাক্স বাড়াতে বাধ্য হতে হয়েছে।