মুখ ঢাকা নিষিদ্ধ করার পুলিশি আদেশ অমান্য করার অভিযোগে এক অভিনব ও নাটকীয় ঘটনার জন্ম দিয়েছেন এক ব্রিটিশ অভিবাসনবিরোধী আন্দোলনকারী। নিজের বিরুদ্ধে আনা জনশৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগের শুনানিতে সম্পূর্ণ ইসলামিক বোরকা পরে আদালতে হাজির হয়েছেন ৭৬ বছর বয়সী এক শ্বেতাঙ্গ পুরুষ। তিনি দাবি করেছেন, এটি তার ব্যক্তিগত ধর্মীয় অনুভূতির অংশ।
অভিযুক্ত টিমোথি মিলার যুক্তরাজ্যের হ্যাম্পশায়ারের হেজ অ্যান্ড এলাকার বাসিন্দা। গত ১২ সেপ্টেম্বর পোর্টসমাউথে অনুষ্ঠিত এক বৃহৎ অভিবাসনবিরোধী বিক্ষোভে নিজের পরিচয় গোপন রাখার অভিযোগে বুধবার (১৪ অক্টোবর) পোর্টসমাউথ ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয় তাকে। কালো নেকাব-বোরকা পরিহিত ওই ব্যক্তি সঙ্গে এনেছিলেন একটি কমলা রঙের ফাইল ও মহিলাদের হ্যান্ডব্যাগ। নিজস্ব আইনজীবী ছাড়া নিজেই শুনানিতে অংশ নিয়ে জেলা জজ স্টিফেন অ্যাপ্টেডের এজলাসে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন তিনি। আদালত আগামী ১৬ ফেব্রুয়ারি তার মামলার পরবর্তী বিচারকার্য নির্ধারণ করেছেন।
শুনানি শুরু হতেই আদালতের এজলাসটি এক অভূতপূর্ব বিতর্কের মঞ্চে পরিণত হয়, যেখানে আইনের চোখে ধর্মীয় ছাড়ের প্রকৃত সংজ্ঞা এবং প্রতিবাদের উদ্দেশ্যে সাজানো কৌশলের মধ্যে স্পষ্ট সংঘাত তৈরি হয়। ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে অভিবাসীদের নৌকা আগমনের প্রেক্ষাপটে গত সেপ্টেম্বরে পোর্টসমাউথের উপকূলে প্রায় দুই হাজার মানুষ বিক্ষোভ দেখায়। আইনশৃঙ্খলার অবনতি ও পরিচয় গোপন রুখতে হ্যাম্পশায়ার পুলিশ বিক্ষোভের আগেই যে কোনও ধরনের মুখ ঢাকা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে জরুরি ক্ষমতা প্রয়োগ করেছিল।
আদালতকক্ষে পরিচয় শনাক্তকরণের জন্য মিলারকে কিছুক্ষণের জন্য মুখের নেকাব সরাতে নির্দেশ দেওয়া হয়, যা শেষ হতেই তিনি পুনরায় মুখ ঢেকে নেন। মুখ ঢাকার নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের বিষয়ে তার সুনির্দিষ্ট আত্মপক্ষ সমর্থন কী- বিচারকের এমন প্রশ্নের জবাবে মিলার দাবি করেন, তাকে বেআইনিভাবে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং আইনের প্রয়োগ সব সম্প্রদায়ের জন্য সমান হওয়া উচিত।
তবে বিচারক তার এ যুক্তির ভিত্তি সরাসরি নাকচ করে দেন। জেলা জজ অ্যাপ্টেড বলেন, সমাজ বা রাষ্ট্রের নীতির প্রতি সাধারণ অসন্তোষ ব্রিটিশ ফৌজদারি আইনের আওতায় কোনও বৈধ আইনি প্রতিরক্ষা হতে পারে না। বিচারক তাকে স্মরণ করিয়ে দেন যে, ধর্মীয় ছাড়ের দাবি করতে হলে কেবল মুখের কথা নয়, বরং ‘প্রকৃত ধর্ম পালনের বস্তুনিষ্ঠ ও বাস্তব প্রমাণ’ প্রয়োজন। শুনানিতে মিলার যুক্তি দেখান, তিনি অত্যন্ত অনুসন্ধিৎসু মনের অধিকারী এবং তার মনে হয়েছে বর্তমান ব্রিটিশ প্রেক্ষাপটে ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা সবচেয়ে সুবিধাজনক।
পোর্টসমাউথের এই ঘটনা মূলত দক্ষিণ ইংল্যান্ডজুড়ে অভিবাসনবিরোধী বিক্ষোভ ঘিরে সৃষ্ট বিশৃঙ্খলা ও পুলিশের কঠোর পদক্ষেপের একটি অংশ। এ বছরের শুরুর দিকে ডোভার এলাকায় বিক্ষোভকারীরা মুখ ঢেকে গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক ও বন্দর অবরোধের মতো সহিংস পদক্ষেপ নেওয়ার পর পুলিশ কঠোরভাবে মুখ ঢাকা নিষিদ্ধের নির্দেশ দেয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্যমতে, পুলিশের বডি ক্যামেরায় শনাক্তকরণ এড়াতে বিক্ষোভকারীরা পরিকল্পিতভাবে বালাক্লাভা, স্কার্ফ বা বিভিন্ন কাপড় ব্যবহার করে আসছিল।
সেপ্টেম্বরের বিক্ষোভে মিলারকে কেবল চোখ খোলা রাখা ‘নিকাব’ ও ঢিলেঢালা ‘আবায়া’ পরে দেখা গেলেও, প্রসিকিউশনের আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্রে জালের মতো চোখের পর্দাযুক্ত সম্পূর্ণ শরীরের পোশাক ‘বোরকা’ ব্যবহারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
শুনানিতে মিলার দাবি করেন, গ্রেফতারের আগে পুলিশ সদস্যরা তাকে একবারও মুখের ঢাকনা সরাতে অনুরোধ করেননি, যা পুলিশের বডি ক্যামেরার ফুটেজেই প্রমাণিত হবে। ইসলামি সংস্কৃতির সাথে নিজের পরিচিতি তুলে ধরতে তিনি অতীতে মরক্কোতে বসবাস এবং বাহরাইন ও দুবাই সফরের অভিজ্ঞতা আদালতের সামনে আনেন। একই সাথে তিনি প্রশ্ন তোলেন, যুক্তরাজ্যে প্রবেশের সময় অভিবাসীদের ধর্মীয় পরীক্ষা নেওয়া হয় না কেন।
ব্রিটেনে ইসলাম ধর্মের ফরজ বা বাধ্যতামূলক কাজকে উহ্য রেখে কিছু মানুষ বোরকা বা নিকাবকে ধর্মে বাধ্যতামূলক হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। তাদের নানা কট্টরপন্থী ব্যাখ্যা মুসলমানদের কীভাবে ব্রিটেনে বর্ণবাদীদের টার্গেটে পরিণত করছে, সেটি নিয়ে মুসলিম তরুণ প্রজন্মের মধ্যে জোর আলোচনা রয়েছে। আর এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে এক অভিবাসনবিরোধী বিক্ষোভকারী ধর্মীয় পোশাকের অপব্যবহার করে আইনের চোখে পার পাওয়ার অপচেষ্টা চালানোয় পুরো বিষয়টি এখন তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
ব্রিটিশ আইনি বিশেষজ্ঞদের মতে, ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য এই বিচার প্রক্রিয়া আদালতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হবে। এর মাধ্যমে নির্ধারিত হবে জনসমাগমে মুখ ঢাকা নিষেধাজ্ঞার সময় ধর্মীয় পোশাকের সুবিধাকে কেউ কৃত্রিম উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে পারে কি না।
আদালতে মিলার জানিয়েছেন, মামলা লড়তে আইনি খরচ জোগাড়ে তিনি ক্রাউডফান্ডিং বা গণতহবিল সংগ্রহের পরিকল্পনা করছেন। আগামী ১৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মিলারকে নিঃশর্ত জামিন দিয়েছেন আদালত। তবে বিচারক তাকে স্পষ্টভাবে সতর্ক করে দিয়েছেন যে, পোশাকটি প্রকৃত ধর্মীয় অনুভূতির প্রতিফলন ছিল নাকি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার আদেশকে অমান্য করার একটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কৌশল ছিল- তা প্রমাণের জন্য কেবল দাবি নয়, উপযুক্ত আইনি প্রমাণের প্রয়োজন হবে।