জেরুজালেম ইস্যুতে জাতিসংঘে ভোট: কে ছিল কার পক্ষে

জেরুজালেম ইস্যু নিয়ে সাধারণ পরিষদের জরুরি বৈঠকে ভোটাভুটি হওয়ার আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্র হুমকি দিয়ে আসছিলো। দেশটি জানিয়েছিল, তাদের প্রস্তাবের বিরুদ্ধে যারা ভোট দেবে তাদের ‘দেখে নেওয়া’ হবে। বন্ধ করে দেওয়া হবে বিভিন্ন দেশকে দেওয়া সহযোগিতা। এরপরও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ সহায়তা পাওয়া প্রায় সব দেশই তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। খুব একটা কাজ করেনি ইসরায়েলি প্রভাবও। জাতিসংঘের এই ভোটাভুটিতে যুক্তরাষ্ট্রের হেরে যাওয়ার কারণের মধ্যে রয়েছে আরব ও ইউরোপে ট্রাম্পের সমর্থন হারানো, ইসরায়েলি প্রভাব ও লাতিন আমেরিকায় ফিলিস্তিন নিয়ে মনোভাবের পরিবর্তন। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের বিশ্লেষণে এমনটি উঠে এসেছে।

বৃহস্পতিবার মার্কিন স্বীকৃতি প্রত্যাখ্যানের প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছে ১২৮টি দেশ। বিপরীতে ট্রাম্পের প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছে মাত্র ৯টি দেশ। ভোটদান থেকে বিরত ছিল ৩৫ দেশ। আর অনুপস্থিত ছিলেন ২১ দেশের প্রতিনিধি। মার্কিন সহায়তা পাওয়া বেশিরভাগ দেশই মুসলিম কিংবা আরব দেশ ট্রাম্পের হুমকি উপেক্ষা করে তারা সবাই ফিলিস্তিনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ আরব মিত্র সৌদি আরবও মার্কিন স্বীকৃতির বিরুদ্ধে ভোট দেয়।

ইসরায়েলি সহায়তা পাওয়া কয়েকটি দেশ ভোটদান থেকে বিরত ছিল। তবে নেতানিয়াহুর ব্যবসায়িক পরিধি বাড়ানোর বড় দুই লক্ষ্যস্থল চীন ও ভারত ভোট দিয়েছে ফিলিস্তিনিদের পক্ষেই। ভারতের সঙ্গে ইসরায়েলে কূটনৈতিক সুসম্পর্ক এবং জেরুজালেম ইস্যুতে ভারত এতদিন নিরপেক্ষ অবস্থানে ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত ফিলিস্তিনিদের পক্ষে ভোট দিয়েছে তারা।

মার্কিন সহায়তা

ইসরায়েল ছাড়া মার্কিন সহায়তা পাওয়া বেশির ভাগ দেশ মুসলিম ও আরব দেশ। এছাড়া আফ্রিকার অনেক দেশও মার্কিন সহায়তা পায়। কিন্তু আফগানিস্তান, মিসর, জর্ডান ও পাকিস্তান সবাই রায় দিয়েছে ফিলিস্তিনিদের পক্ষে। আফ্রিকার নাইজেরিয়া, ইথিওপিয়া, তাঞ্জানিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকা ট্রাম্পের প্রস্তাব প্রত্যাখানেই ভোট দিয়েছেন। আফ্রিকায় ইসরায়েলের সহায়তা পাওয়া দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র কেনিয়াই তাদের সমর্থন দিয়েছে। ইসরায়েলকে সমর্থন জানাতে ভোটদানে তারা বিরত ছিল বলে জানান ফরেন এসিসট্যান্স ডট গভ।

আরব মিত্র

আরব বিশ্বও ট্রাম্পের প্রস্তাব প্রত্যাখানের পক্ষে ভোট দিয়েছেন। ‍মুসলিম দেশ হওয়াতে এমন অবস্থান প্রত্যাশিতই ছিল। কিন্তু এতে করে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছে হোয়াইট হাউস। সৌদি আরব, মিসর ও অন্যান্য আরব দেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকলেও তাদের সমর্থন পাননি ট্রাম্প। এছাড়া ইরানের মুখোমুখি হতে মধ্যপ্রাচ্যে আঞ্চলিক সহায়তা প্রয়োজন ছিল যুক্তরাষ্ট্রের। সেটাও জটিল হওয়ার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে শান্তিপ্রক্রিয়ার মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ট্রাম্পের ভূমিকাও দুর্বল হয়ে গেছে।

ফিলিস্তিনিদের বিজয়

ফিলিস্তিনিরা তাদের পক্ষে এত বিপুল সমর্থনের প্রশংসা করে জানায়, ‘আরও একবার প্রমাণিত হলো যে, বিশ্ব ফিলিস্তিনিদের পক্ষে রয়েছে।’ এর আগেও জাতিসংঘের বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সমর্থন পেয়ে আসছিল ফিলিস্তিন।

২০১২ সালে সাধারণ পরিষদে ফিলিস্তিনকে জাতিসংঘ সদস্যপদ দেওয়ার ক্ষেত্রে ১৩৮টি দেশ সমর্থন দিয়েছিল। বৃহস্পতিবার ভোট ছিল ১২৫টি।

merlin_131528252_db5450a5-2ea0-4da8-a5df-2f23f8029f22-master768

ইসরায়েলি প্রভাব

বিগত কয়েক বছরে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু আফ্রিকা, এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার বেশ কিছু দেশে প্রভাব বিস্তার করতে সমর্থ হয়েছে। যারা ভোটদানে বিরত ছিল তাদের প্রশংসা করে নেতাননিয়াহু বলেন, ‘এই অদ্ভূত নাটকে অংশ না নেওয়ার জন্য ধন্যবাদ’।

আর্জেন্টিনা ও মেক্সিকো এর আগে ফিলিস্তিনের সমর্থনে থাকলেও বৃহস্পতিবার ইসরায়েলের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এমনকি গুয়াতেমালা ও হন্ডুরাসের অবস্থানও একইরকম ছিল। জেরুজালেম নিয়ে ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের পক্ষেই ভোট দিয়েছে তারা।

কেনিয়ার মতো উগান্ডা ও দক্ষিণ সুদানের মতো আফ্রিকান দেশগুলোও ভোটদান থেকে বিরত ছিল। মিয়ানমার ও ফিলিপাইনও বিরত ছিলো ভোটাদান থেকে। ২০১২ সালে তারা ফিলিস্তিনের পক্ষেই ছিল। তবে এশিয়ায় ভারত ও চীন ইসরায়েলের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

ইউরোপে সমর্থন হারাচ্ছেন ট্রাম্প?

মধ্যপ্রাচ্যে শান্তিপ্রক্রিয়ায় ইউরোপকে সবসময়ই পাশে চেয়েছেন ট্রাম্প। তবে বৃহস্পতিবার সাধারণ পরিষদের ভোটে ইউরোপের শক্তিশালী তিনটি দেশই ট্রাম্পের প্রস্তাব প্রত্যাখানে ভোট দিয়েছে। ফ্রান্স, ব্রিটেন ও জার্মানি অবস্থান নিয়েছে ফিলিস্তিনের পক্ষে।

পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি ও চেক রিপাবলিকের মতো ইসরায়েল ঘনিষ্ঠ অন্যান্য ইউরোপীয় দেশগুলো ভোটদানে বিরত ছিল । ইউরোপের মাঝে এই বিভাজনও ইসরায়েল-ফিলিস্তিনি সহিসংতা থামানোর প্রক্রিয়া জটিল করে তুলতে পারে।

সূত্র: টাইমস অব ইসরায়েল, এপি।