ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি গুরুত্বপূর্ণ যুক্তরাষ্ট্র সফর শুরু করেছেন। মঙ্গলবার তিনি ওয়াশিংটনের উদ্দেশে রওনা দিয়েছেন। তার এই সফরকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের জন্য যুগান্তকারী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। সফরের গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডায় থাকবে প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা জোরদার এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তি বিনিময়। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ খবর জানিয়েছে।
খবরে বলা হয়েছে, এই সফরে ভারত গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন প্রযুক্তিতে প্রবেশগম্যতা পাবে। সাধারণত মিত্র নয় এমন দেশের সঙ্গে এসব প্রযুক্তি বিনিময় করে না ওয়াশিংটন। যা দুই দেশের সম্পর্ক গভীর হওয়ার ইঙ্গিত দেয়। বৈশ্বিক রাজনীতিতে শুধু যে দেশ দুটি কাছাকাছি আসছে তা নয়, বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কও জোরদার হচ্ছে।
শীতল যুদ্ধের সময় ওয়াশিংটন ও নয়াদিল্লির সম্পর্ক ছিল সন্দেহে ভরা। কিন্তু গত দুই দশকে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক ঘনিষ্ঠ হয়েছে ভারত। এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতি ও আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গে শক্তিশালী সম্পর্ক গড়ে তুলতে যুক্তরাষ্ট্রের সব প্রেসিডেন্ট আগ্রহ ও সমর্থন দিয়েছেন। এর ওপর দাঁড়িয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতার সম্পর্ক বিস্তৃত করেছেন। বিশেষ করে বিশ্বজুড়ে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলা ও ইন্দো-প্রশান্ত অঞ্চলে নিরাপত্তা জোরদার করতে ভারতকে কাছে টানছে বাইডেন প্রশাসন।
শুধু তাই নয়, বাইডেন প্রশাসন চায় নয়াদিল্লির চিরাচরিত প্রতিরক্ষা অংশীদার রাশিয়ার কাছ থেকে দেশটিকে দূরে সরিয়ে আনতে। ইউক্রেনে যুদ্ধ শুরুর পর মস্কোর সঙ্গে বাণিজ্য বাড়িয়েছে ভারত। সস্তায় রুশ তেল কিনছে বিপুল পরিমাণে। যা পশ্চিমাদের হতাশার কারণ।
ভারতকেও ‘দ্বিধার ইতিহাস’ থেকে বেরিয়ে আসতে হয়েছে। ২০১৬ সালে মার্কিন কংগ্রেসে দেওয়া ভাষণে মোদি যেমনটি বলেছিলেন, চীনের সঙ্গে সামরিক উত্তেজনা ও ভঙ্গুর সম্পর্কের কারণে পশ্চিমাদের দিকে নজর দিচ্ছে তার সরকার।
এর আগে বেশ কয়েকবার যুক্তরাষ্ট্র সফর করেছেন মোদি। কিন্তু এটিই তার পূর্ণ কূটনৈতিক মর্যাদাসম্পন্ন প্রথম রাষ্ট্রীয় সফর। যা বাইডেনের শাসনামলে তৃতীয় এবং কোনও ভারতীয় নেতার তৃতীয় সফর।
সোমবার ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিনয় কোয়াত্রা বলেছেন, আমাদের সম্পর্কের জন্য এটি একটি মাইলফলক। এটি খুব তাৎপর্যপূর্ণ সফর, খুব গুরুত্বপূর্ণ সফর।
এই সফরে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা খাত, বিশেষ করে দুই দেশের সামরিক শিল্পে অগ্রগতি প্রত্যাশা করা হচ্ছে বলে উল্লেখ করেছেন কোয়াত্রা। কারণ ভারত দেশে নিজের জন্য আরও বেশি অস্ত্র ও সরঞ্জাম উৎপাদন করতে চায়, যা রফতানি করার লক্ষ্যও রয়েছে নয়াদিল্লির।
জেট ইঞ্জিন, ড্রোন, সেমিকন্ডাক্টর
মোদির যুক্তরাষ্ট্র সফরে যে গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা আসতে পারে তার মধ্যে রয়েছে, ভারতে জেনারেল ইলেক্ট্রিকের ইঞ্জিন উৎপাদনে বাইডেন প্রশাসনের অনুমতি। যা ভারতীয় যুদ্ধবিমানের জন্য উৎপাদন করা করা হবে। এছাড়া জেনারেল অ্যাটোমিকসের তৈরি ৩১টি সশস্ত্র এমকিউ-৯বি সীগার্ডিয়ান ড্রোন ক্রয় চূড়ান্ত হতে পারে। এসব ড্রোনের আনুমানিক মূল্য ৩০০ কোটি ডলার। প্রতিরক্ষা ও অত্যাধুনিক প্রযুক্তি বাণিজ্যে বাধা অপসারণ করে মসৃণ করা।
৮ জুন একটি অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ইন্দো-প্রশান্ত বিষয়ক অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি এলি র্যাটনার বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির এই সফরকে মানুষ মার্কিন-ভারত সম্পর্কের প্রকৃত পাটাতন হিসেবে দেখবে মানুষ। কারণ নির্দিষ্টভাবে এর সঙ্গে প্রতিরক্ষার সম্পর্ক রয়েছে।
তিনি বলেছেন, নিজের স্বার্থ সুরক্ষিত পারে এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তায় ভূমিকা রাখতে পারে এমন একটি শক্তিশালী ভারত যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সুবিধাজনক।
ভারতের এক সিনিয়র কর্মকর্তা বলেছেন, সেমিকন্ডাক্টর, সাইবারস্পেস, অ্যারোস্পেস, কৌশলগত অবকাঠামো ও যোগাযোগ, বাণিজ্যিক মহাকাশ প্রকল্প, কোয়ান্টাম কম্পিউটিউং এবং শিল্প ও প্রতিরক্ষা খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিয়ে সফরে আলোচনা হবে।
তিন দিনের সফর শুরু হবে ২১ জুন নিউ ইয়র্কে। প্রেসিডেন্ট বাইডেনের সঙ্গে মোদি একটি রাষ্ট্রীয় নৈশভোজ ও পারিবারিক নৈশভোজে অংশ নেবেন, মধ্যাহ্ন ভোজে তাদের সঙ্গে থাকবেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন। এছাড়া নয় বছরের মধ্যে দ্বিতীয়বার কংগ্রেসের একটি যৌথ অধিবেশনে তিনি ভাষণ দেবেন।
যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের সঙ্গেও বৈঠক করবেন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী। এছাড়া জাতিসংঘ সদর দফতরে আন্তর্জাতিক ইয়োগা দিবসের একটি অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করবেন।
নয়াদিল্লির এশিয়া সোসাইটি পলিসি ইনস্টিটিউট-এর সিনিয়র ফেলো সি. রাজা মোহন বলেন, এটি কোনও নিয়মিত সফর নয়। এটি ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের একটি মৌলিক টার্নিং পয়েন্ট। বিষয়টি চীনকে মোকাবিলা বা চীন বিরোধিতার নয়। এটি হলো এশিয়ার শক্তিগুলোর মধ্যে নতুন ভারসাম্য তৈরি করা। বহুধাবিভক্ত এশিয়ায় কোনও একক শক্তি আধিপত্য বিস্তার করছে না।