সম্প্রতি ফেসবুকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মার্ক জাকারবার্গ প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান দলের প্রেসিডেন্ট পদের প্রার্থীতা প্রত্যাশী ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থানকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। ফেসবুকের বার্ষিক এফ৮ ডেভেলপার কনফারেন্সে মূল বক্তব্যে জাকারবার্গ নিজের এ অবস্থান ব্যক্ত করেন।
আরও পড়ুন: ফিলিস্তিনকে সমর্থন জানিয়ে ইতিহাস ভাঙলেন স্যান্ডার্স, নীরবতার পথেই হিলারি
বক্তব্যে মার্কিন ধনকুবের ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম সরাসরি উল্লেখ না করে জাকারবার্গ বলেন, আমি দেয়াল তুলে দেওয়া ও অন্যান্য আখ্যা দিয়ে মানুষের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করার আতঙ্কিত আহ্বানের কথা শুনছি। আমি শুনছি তারা মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে স্তব্ধ করার ডাক দিচ্ছেন। অভিবাসনকে মন্থর করা, বাণিজ্য কমিয়ে আনা এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে ইন্টারনেট সুবিধা বন্ধ করে দেওয়ার কথাও বলা হচ্ছে।
ডেভেলপার কনফারেন্সে জাকারবার্গের এ বক্তব্য অপ্রত্যাশিত ছিলো। ধারণা করা হচ্ছে, ৩১ বছরের এ বিলিওনিয়ার রাজনীতি ও বাণিজ্যকে এখন আর আলাদা করে ভাবতে রাজি নন। এর আগে রাজনৈতিক প্রচারণায় অর্থ সহযোগিতা করলেও জাকারবার্গ ও তার কোম্পানি কখনও রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করেননি।
এমনকি ফেসবুক কোম্পানির ভেতরে রাজনৈতিক আলোচনা আরও স্পষ্ট। গত মাসে ফেসবুকের এক কর্মকর্তা কোম্পানির একটি জরিপের মাধ্যমে জাকারবার্গের কাছে জানতে চান, কোম্পানির পক্ষ থেকে ২০১৭ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে প্রেসিডেন্ট হওয়া থেকে বিরত রাখবেন কি না?
প্রতি সপ্তাহে ফেসবুকের কর্মকর্তারা অভ্যন্তরীন একটি জরিপের মাধ্যমে কিছু প্রশ্নের উত্তর জানতে চান। ৪ মার্চের জরিপে প্রশ্ন ছিল, ২০১৭ সালে ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট হওয়া ঠেকাতে ফেসবুকের কী ধরনের দায়িত্ব রয়েছে?
ওই জরিপটির একটি স্ক্রিনশটে দেখা যায় প্রশ্নটি জনপ্রিয়তার তালিকায় ৫ম স্থানে অবস্থান করছে।
জাকারবার্গকে প্রশ্নটি করায় অথবা ফেসবুক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ট্রাম্প-বিরোধী কর্মকর্তা থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। প্রশ্নটি ও মঙ্গলবার জাকারবার্গের দেওয়া বক্তব্যে সিলিকন ভ্যালির রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট হয়। এ অবস্থান অভিবাসনের পক্ষে, বাণিজ্যের পক্ষে ও ইন্টারনেটের ব্যবহার বৃদ্ধির পক্ষে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হাজির হয়েছে। কর্মকর্তাদের প্রশ্নের উত্তরে যদি জাকারবার্গ হ্যাঁ বলেন তাহলে বুঝা যায় বিশ্বে ফেসবুক এখন কতটা প্রভাবশালী ও হুমকি হয়ে উঠেছে। এটা অপ্রত্যাশিত। বিশ্বের ১ বিলিয়নেরও বেশি মানুষ এখন ফেসবুক ব্যবহার করে। এখান থেকেই মানুষ খবর পাচ্ছে, নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান শেয়ার করছে, রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে মিথষ্ক্রিয়া করছে। এছাড়া এখানেই রাজনৈতিক নেতারা নিজেদের বাজেট বাড়িয়ে প্রচারণা চালাচ্ছেন। তবে ফেসবুকে যা ঘটছে তা যাচাই-বাছাই করার আইনি কোনও দায়িত্ব ফেসবুকের নেই।
আরও পড়ুন: প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হচ্ছেন না পল রায়ান!
ইউসিএলএ-এর আইনের অধ্যাপক ইউজেনে ভলখ বলেন, ফেসবুক চাইলে যে কোনও বিষয়কে তারা প্রমোট অথবা ব্লক করতে পারে। নিউ ইয়র্ক টাইমসের মতোই অধিকার রয়েছে ফেসবুকের। তারা চাইলে সম্পূর্ণভাবে ট্রাম্পকে ব্লক করতে পারে।
যদিও নিউ ইয়র্ক টাইমসে ফেসবুকের মতো ট্রাম্পের সমর্থনে কোনও পেজ নেই। ফেসবুকে ডোনাল্ড ট্রাম্প ফর প্রেসিডেন্ট বা ডোনাল্ড ট্রাম্প ফর প্রেসিডেন্ট ২০১৬ নামে কয়েকটি পেজ রয়েছে।
ফেসবুককে বেশির ভাগ মানুষই মিডিয়া কোম্পানি হিসেবে দেখেন না। এমন একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখেন, যেখান থেকে বিভিন্ন বিষয় জানা যায়। দৈনিক পত্রিকা, ম্যাগাজিন বা নিউজ সাইটের মতো ফেসবুক নয়। কিন্তু যদি ফেসবুক তাদের অ্যালগরিদম সম্পাদনা করে কোনও কোনও বিষয়কে সামনে নিয়ে আসতে চায় বা ব্লক করতে চায় তাহলে বিষয়টি অনেক গুরুত্বপূর্ণ। চিরাচরিত গণমাধ্যমের রাজনৈতিক অবস্থান সম্পর্কে সাধারণ পাঠকের ধারণা থাকে। এসব গণমাধ্যমের সম্পাদকীয়, মতামত ও পছন্দের রাজনৈতিক অবস্থানের ওপর বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তবে ফেসবুকের ক্ষেত্রে এ সুযোগ নেই। অথচ ফেসবুকের রয়েছে এসব গণমাধ্যমের চাইতে বেশি মানুষের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ।
ফেসবুকের ক্ষেত্রে বুঝা যায় না আসলে কী দেখা যাচ্ছে না। জানা যায় না, আসলে কোন বিষয়টা পক্ষপাতিত্বমূলকভাবে করা হচ্ছে যা বিশ্বকে প্রভাবিত করতে পারে।
অতীতেও ফেসবুক কিছু কারসাজি করেছে। ২০১২ সালের প্রেসিডেন্ট নিবার্চনের সময় ফেসবুক গোপনে ১.৯ মিলিয়ন ব্যবহারকারীর নিউজ ফিড কারসাজি করেছিল। ২০১০ সালেও ৬১ মিলিয়ন ফেসবুক ব্যবহারকারীর নিউজ ফিড কারসাজি করে গোপনে।
ফেসবুকের এসব গোপন পরীক্ষা নিয়ে একটি বিশদ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। তাতে দাবি করা হয়, ফেসবুক ৩ লাখ ৪০ হাজার মানুষকে ভোট দিতে আগ্রহী করে তুলেছিল। ২০১২ সালেও মানুষের আবেগ নিয়ে পরীক্ষার অভিযোগ রয়েছে ফেসবুকের বিরুদ্ধে। এরপরেও ফেসবুক ৭ লাখ মানুষের নিউজ ফিড সম্পাদনা করে দেখিয়ে দিয়েছে চাইলে তারা যা চায় তা মানুষকে অনুভূত করাতে পারে।
আরও পড়ুন: কলোরাডোর মনোনয়ন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুললেন ট্রাম্প
ফেসবুক যদি সিদ্ধান্ত নেয় যে, ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট হওয়া ঠেকানোর এবং ট্রাম্পের সমর্থনে পোস্ট ও মিডিয়াগুলোকে নিউজ ফিড সরিয়ে দিতে তাহলে তা প্রকাশ্যে ঘোষণা করারও কোনও প্রয়োজন নেই। যুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্ট অ্যামেন্ডমেন্ট আইনই তাদের রক্ষা করবে।
তবে ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট হওয়া ঠেকানো ফেসবুকের জন্য কতটা নৈতিক- এ প্রশ্নটা সামনে আসছে। ইউনিভার্সিটি অব উইসকনসি-ম্যাডিসনের জার্নালিজম এথিকসের অধ্যাপক রবার্ট ড্রেকসেল জানান, প্রতিষ্ঠিত মিডিয়া কোম্পানির মতোই ফেসবুকের দায়িত্বশীলতা রয়েছে। এখানে কোনও আইনি বাধ্যবাধকতা নেই। তবে তিনি মনে করেন, ফেসবুকের উচিত, সুষ্ঠু, সঠিক ও সম্পূর্ণ কাভারেজ দেওয়া।
বিশেষজ্ঞরা জানান ফেসবুক একমাত্র তখনি আইনি জটিলতায় পড়তে পারে যদি তাদের কোম্পানির কোনও প্রার্থী থাকে। ভলখের মতে, ফেসবুক যদি স্যান্ডার্স ও হিলারি ক্লিনটনের প্রচারণায় সক্রিয়ভাবে সমন্বয় করে এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের খবরগুলোকে চেপে যায়। তাহলে তারা ফার্স্ট অ্যামেন্ডমেন্টের দোহাই দিয়ে রক্ষা পাবে না। তিনি বলেন, কিন্তু তারা যদি মনে করে আমাদের সাইটে ট্রাম্প সংশ্লিষ্ট বিষয় দেখতে চাই না তাহলে এ অধিকার তাদের রয়েছে। এটা করার সব অধিকার তাদের রয়েছে।
তবে এ বিষয়ে ফেসবুকের সঙ্গে যোগাযোগ করেও কোনও মন্তব্য পাওয়া যায়নি। সূত্র: হাফিংটন পোস্ট।
/এএ/