কী, কেন, কীভাবে

কংগ্রেস হারানোর পর ট্রাম্পের দলে কি শুরু হচ্ছে ক্ষমতার লড়াই?

আমেরিকায় অনুষ্ঠিত ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বিশাল ধাক্কা খেয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার দ্বিতীয় মেয়াদের ক্ষমতায় এটিই সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বিপর্যয়। নির্বাচনে এক বিশাল ‘ব্লু ওয়েভ’ বা ডেমোক্র্যাটিকদের জয়ের জোয়ার ওয়াশিংটনের ক্ষমতার ভারসাম্য নতুন করে বদলে দিয়েছে। টেক্সাস, কানসাস, সাউথ ক্যারোলাইনা, আইওয়া, নর্থ ক্যারোলাইনা এবং ওহাইওর মতো রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটিগুলোতে জয় ছিনিয়ে নিয়ে প্রতিনিধি পরিষদ বা হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস ও সিনেট- উভয় কক্ষেরই নিয়ন্ত্রণ নিজেদের দখলে নিয়েছে ডেমোক্র্যাটরা।

এই পরাজয়ের মধ্য দিয়ে রিপাবলিকান পার্টি এখন দ্বিমুখী সংকটের মুখোমুখি। একদিকে কংগ্রেসে সংখ্যালঘু দলে পরিণত হওয়া, অন্যদিকে নিজেদের দলীয় সারিতেই ক্ষমতার বিকল্প কেন্দ্র গড়ে ওঠা। দলটির একাধিক নেতা ও উপদল ট্রাম্প-পরবর্তী আমেরিকার নেতৃত্বের জন্য নিজ নিজ অবস্থান শক্ত করতে শুরু করেছেন।

ভোটারদের এই রায় ট্রাম্পের নেতৃত্বের পাশাপাশি অর্থনীতি, ইরান যুদ্ধ এবং সরকার পরিচালনার ওপর অসন্তোষেরই বহিঃপ্রকাশ। ট্রাম্প যাকে নিজের জন্য ব্যক্তিগত ‘রেফারেন্ডাম’ বা গণভোট হিসেবে রূপ দিতে চেয়েছিলেন, তা শেষ পর্যন্ত তার প্রেসিডেন্সির প্রতিই এক বিশাল অনাস্থায় রূপ নিয়েছে।

এমনকি নিজের দল ‘গ্র্যান্ড ওল্ড পার্টি’র (জিডব্লিউপি) ভেতরেও ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং সিনেটর টেড ক্রুজের মতো প্রভাবশালী নেতারাও তার বিরুদ্ধে সুর চড়াতে শুরু করেছেন।

তবে এখনই বিদায় নিচ্ছেন না ট্রাম্প। ২০২৯ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত তিনি হোয়াইট হাউজে বহাল থাকবেন এবং সাংবিধানিকভাবে তৃতীয় মেয়াদের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার কোনও সুযোগ তার নেই। তবে এই মধ্যবর্তী নির্বাচনের রায় রিপাবলিকান পার্টির ওপর তার একক ও অনিয়ন্ত্রিত প্রভাবের অবসানের সূচনা বলেই মনে করা হচ্ছে।

কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের ফলে ট্রাম্পের আইন প্রণয়নের এজেন্ডা ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক নিয়োগগুলো চরম বাধার মুখে পড়বে। অন্যদিকে রিপাবলিকানদের সামলাতে হবে ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে অভ্যন্তরীণ বিভাজন। ট্রাম্প-পরবর্তী নেতৃত্বের সেই লড়াই কার্যত শুরু হয়ে গেছে।

রিপাবলিকানে কোন্দনের সুর

এই হার কেবল সংখ্যালঘু হওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এতে দলের ভেতরের কোন্দল ও বিকল্প নেতৃত্ব তৈরির স্পষ্ট চিত্র ফুটে উঠেছে, যা এক দশক ধরে ট্রাম্পের একক প্রভাবে চাপা পড়েছিল। দলটির অন্যতম উত্তরসূরি হিসেবে বিবেচিত ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স নির্বাচনী প্রচারণায় বেশ সক্রিয় ছিলেন। কিন্তু একটি অজনপ্রিয় প্রশাসন ও দলের ঐতিহাসিক পরাজয়ের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় তার অবস্থান এখন জটিল হয়ে পড়েছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও তুলনামূলক প্রথাগত ইমেজের বিকল্প প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছেন। অন্যদিকে ফ্লোরিডার রন ডেসান্টিস এবং টেক্সাসের সিনেটর টেড ক্রুজ ইতোমধ্যেই ট্রাম্প-পরবর্তী প্রেক্ষাপটে আলোচনায় উঠে এসেছেন।

টেক্সাসের সিনেটর টেড ক্রুজ এই পরাজয়কে ‘ব্লু সুনামি’ এবং ‘ওয়াটারগেট ধাঁচের প্রত্যাখ্যান’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এক দীর্ঘ বক্তব্যে তিনি বলেন, সমর্থকরা ভোট না দেওয়ায় তারা হারেননি, বরং আগের সমর্থকরা ডেমোক্র্যাটদের দিকে ঝুঁকেছেন। জীবনযাত্রার ব্যয়, দুর্নীতি, ইরান যুদ্ধ এবং শুল্কের মতো বিষয়গুলো এর পেছনে কাজ করেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। ক্রুজ সতর্ক করে বলেন, ডেমোক্র্যাটরা তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ব্যবহার করে ট্রাম্প ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে তদন্ত, তলব ও অভিশংসন প্রক্রিয়া চালাবে। 

তবে রিপাবলিকানদের হারে ট্রাম্পের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কোনও প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর কাছ থেকে নাও আসতে পারে, বরং আসতে পারে তার আন্দোলনের রাজনৈতিক অবকাঠামো থেকে। যেমন- কনজারভেটিভ কৌশলবিদ ক্রিস বাসকার্ক প্রতিষ্ঠিত ‘রকব্রিজ নেটওয়ার্ক’। এই সংস্থাটি ধনী দাতা, কৌশলবিদ ও রুট লেভেলের কর্মীদের এক ছাতার নিচে আনছে। ২০২৪ সালে তাদের অর্থায়নকারী দল ‘টার্নআউট ফর আমেরিকা’ মাঠপর্যায়ে ৩৪.৫ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছিল। উদ্দেশ্য- ট্রাম্প না থাকলেও যেন ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ আন্দোলন টিকে থাকে।

এই ফলাফল ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দৌড়কে ত্বরান্বিত করেছে। ডেমোক্র্যাটরা সরকার পরিচালনার সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে মূল্যস্ফীতি হ্রাস ও নজরদারির এজেন্ডা তৈরি করবে। অন্যদিকে রিপাবলিকানদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে- তারা ট্রাম্পের পপুলিস্ট জাতীয়তাবাদে অটল থাকবে নাকি জয়ের জন্য কৌশলে বদল আনবে।

তবুও ডোনাল্ড ট্রাম্প অত সহজে হেরে যাওয়ার পাত্র নন। ট্রাম্পের এখনও প্রেসিডেন্ট হিসেবে কথা বলার প্ল্যাটফর্ম, প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষমতা এবং অনুগত সমর্থকগোষ্ঠী রয়েছে। তবে ২০২৬ সালের ‘ব্লু ওয়েভ’ ট্রাম্পের অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতার অধ্যায় এবং রিপাবলিকান পার্টিকে নিজের ইচ্ছেমতো চালনার যুগের ইতি টেনেছে। মেয়াদের বাকি সময় হোয়াইট হাউজে ট্রাম্পের কাটাতে হলেও, তিনি ক্রমশ এক প্রভাবহীন প্রেসিডেন্টে পরিণত হবেন।

সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে