স্বাস্থ্য অধিদফতরের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বিশেষজ্ঞ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সারা পৃথিবীতে এখন আর কেউ অ্যান্টিবডি টেস্ট করে না। যারা শুরু করেছিল তারাও সেখান থেকে সরে এসেছে। ভারত, সুইডেন, ফ্রান্স সবাই শুরু করলেও তারা বন্ধ করে দিয়েছে। করোনা পরীক্ষায় অ্যান্টিবডি কোনও ‘ডায়াগনস্টিক টুল’ না মন্তব্য করে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যখন কোনও দেশে পিক হয়ে যায় তখন সেসব দেশে এই টেস্ট করা হয়। তাও অনেকে এখন করছে কেবলমাত্র হেলথ কেয়ার ওয়ার্কের। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও বারবার পিসিআর টেস্টের কথা বলছে। তাদের এ যুক্তির পেছনে কারণ হচ্ছে, কেউ করোনাতে আক্রান্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পিসিআর টেস্ট করলে তার সঠিক ফলাফল পাওয়া যাবে। কিন্তু অ্যান্টিবডি পরীক্ষা করালে সাতদিনের মধ্যে তার রেজাল্ট নেগেটিভ আসবে, তাই এর কোনও গুরুত্ব নেই। কিন্তু এর ভালো দিক হচ্ছে, এর মাধ্যমে বেরিয়ে আসবে কত মানুষ করোনাতে আক্রান্ত হয়ে ইতোমধ্যেই সুস্থ হয়ে গেছেন অথবা সুস্থ হওয়ার পথে।
অ্যান্টিবডি টেস্ট নিয়ে কথা বলেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল ভাইরোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সী। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি, মার্চেই অনেকে লক্ষণহীনভাবে ঘোরাফেরা করেছেন। তাদের পরীক্ষা করা হয়নি বলে শনাক্ত করা যায়নি। যার কারণে এখন যদি পরীক্ষা করা হয়, ১০ থেকে ৪০ শতাংশ মানুষের ‘হয়তো’ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়ে গেছে বলে আমি মনে করছি। তিনি বলেন, এটা হতেই পারে যে, শতকরা ১০ থেকে ৪০ শতাংশ মানুষের শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে, তবে এটা পরীক্ষা না করালে বলা যাবে না। যাদের অ্যান্টিবডি ইতোমধ্যেই তৈরি হয়ে গেছে, তাদের বের করা দরকার মন্তব্য করে তিনি বলেন, তাহলে বোঝা যাবে, দেশে অ্যান্টিবডি পজিটিভ কতজন রয়েছেন। তবে এজন্য ভালো মানের অ্যান্টিবডি টেস্ট আনা দরকার, আর এটা করা হলে আমরা একটা কৌশল নির্ধারণ করা যাবে যে, কোথায় আমাদের বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
যদিও করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের পর থেকেই অ্যান্টিবডি টেস্টে ‘ফলস রেজাল্ট’ আসে বলে জানানো হয়েছিল জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) থেকে। সংস্থাটির প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. এ এস এম আলমগীর বলেন, আমরা যে পরীক্ষার মাধ্যমে করোনা শনাক্ত করছি সেটা শতভাগ নিশ্চিত পরীক্ষা, একে গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড পরীক্ষা বলা হয় এবং এটা হচ্ছে আরটি পিসিআর ( রিভার্স ট্রান্সক্রিপটেজ পলিমেরেজ রিঅ্যাকশন) পদ্ধতি। কিন্তু অন্যসব যেগুলো হচ্ছে রেপিড টেস্ট, যেটা কয়েকবছর আগে ডেঙ্গু জ্বরের সময় করা হয়েছে। এটা দিয়ে পাঁচ থেকে সাতদিনের দিন পরীক্ষা শুরু করতে হয় এবং তখন সেটা পজিটিভ আসে। তবে এতে ভয়ের বিষয় হচ্ছে, পাঁচদিনের পর যে অ্যান্টিবডি পরীক্ষা হবে তাতে অধিকাংশই ফলস নেগেটিভ আসবে। আর ফলস নেগেটিভ পাওয়ার পর কোনও ব্যক্তি যদি কমিউনিটিতে ঘুরে বেড়ায় তাহলে সে কিন্তু তখন এটা ছড়িয়ে দেবে।
প্রিভেন্টিভ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘হার্ড ইমিউনিটি’র জন্য অ্যান্টিবডি হওয়া দরকার, তবে এটা এই মুহূর্তে এত দ্রুত বলা যাবে না। তার জন্য সারাদেশে মানুষের যে হারে পরীক্ষা করার কথা ছিল সেটা হয়নি। তারচেয়ে বরং, সামাজিক দূরত্ব এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার দিকেই আরও জোর দেওয়া উচিত।
জানতে চাইলে কোভিড-১৯ জাতীয় প্রতিরোধ কমিটি ও জাতীয় টেকনিক্যাল কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডা. ইকবাল আর্সলান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এর সময় এখনও হয়নি। আমরা এখনও রোগী ডায়াগনোসিস, আইসোলেশনের মধ্যে রয়েছি। অ্যান্টিবডি টেস্ট করে একটা ফলস ইম্প্রেশন আসতে পারে মন্তব্য করে তিনি বলেন, কারণ এখানে ‘ফলস নেগেটিভ’ অনেক বেশি হয়। কোভিড সংক্রান্ত জরিপের ক্ষেত্রে হয়তো এটা কাজে লাগতে পারে কিন্তু রোগী শনাক্তের ক্ষেত্রে সুফল দেবে না।
একই কথা বলেছেন মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ব্লাডের মাধ্যমে করা এ টেস্টে ‘ফলস পজিটিভ’ বেশি হয়। যার কারণে ‘শতভাগ’ কিছু বলা মুশকিল। বিশ্বের অনেক উন্নত দেশ এটা শুরু করেও বন্ধ করে দিয়েছে। তিনি বলেন, এই টেস্ট দিয়ে কারও শরীরে সে ভাইরাসের বিরুদ্ধে ‘প্রতিরোধ ক্ষমতা’ তৈরি হয়েছে কিনা সেটি বোঝা যাবে কিন্তু শরীরে ভাইরাস রয়েছে কিনা, সেটি বোঝার কোনও স্কোপ নেই। তবে এটা করলে ক্ষতি নেই মন্তব্য করে তিনি বলেন, অ্যান্টিবডি আছে কিনা সেটা দেখা যেতে পারে, কিন্তু রোগের ডায়াগনস্টিক ভ্যালু তেমন বোঝা যাবে না।