দেশে মানসিক স্বাস্থ্য চিকিৎসা অপ্রতুল

দেশে মানসিক সমস্যায় ভুগছেন এমন রোগীদের মাত্র ২৪ শতাংশ চিকিৎসা পান সরকারি হাসপাতালে। বাকিরা বেসরকারিভাবে চিকিৎসা নিয়ে থাকেন। জেলা- উপজেলায় এই রোগীদের জন্য চিকিৎসা ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। মানসিক চিকিৎসায় সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাপকহারে বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে কর্মপরিকল্পনা নিশ্চিত না করা গেলে, বড় অংশই চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত থেকে যাবে। কেননা, বেসরকারিভাবে এই চিকিসার খরচ বহন করা সাধারণের নাগালের বাইরে।

‘জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য সমীক্ষা ২০১৮-১৯’ এর তথ্যমতে, দেশের প্রায় ১৭ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক এবং ১৪ শতাংশ শিশুর কোনও না কোনও ধরনের মানসিক ব্যাধি রয়েছে। জরিপ অনুসারে, মানসিক রোগে আক্রান্ত ২৪.২ শতাংশ মানুষ চিকিৎসা পান সরকারি হাসপাতালে, ৫.৫ শতাংশ প্রাইভেট প্র্যাকটিশনার সাইকিয়াট্রিস্টদের কাছ থেকে, ৩৩ শতাংশ অন্যান্য ডাক্তারের কাছ থেকে এবং ২.২ শতাংশ হোমিওপ্যাথি এবং ইউনানি ডাক্তারদের কাছ থেকে চিকিৎসা নিয়ে থাকেন।

গবেষণা বলছে, কোভিড-১৯ মহামারির পর সারাবিশ্বের মতো বাংলাদেশেও মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা বেড়েছে। তবে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ব্যবস্থার অভাবে দেশে এখনও অবহেলিত মানসিক স্বাস্থ্যসেবা।  দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন।

করোনার পর বয়স অনুসারে বিভিন্ন ধরনের মানসিক সমস্যা বেড়েছে উল্লেখ করে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মেখলা সরকার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মহামারি সামাল দিতে যে মানসিক চাপ যায়, সেখান থেকে হুট করে বেরিয়ে আসতে পারে না অনেকে। এখন বিচিত্র ধরনের রোগী আমরা পাচ্ছি, যা আগে পাইনি। তবে শিশুদের মধ্যে নানা ধরনের অসঙ্গতিও বেড়েছে। আমাদের সমাজ কাঠামোতে যে পরিবর্তনগুলো নিয়মিত হয়, সে অনুযায়ী রোগীর ধরন বদলায়।’

দেশে মানসিক স্বাস্থ্যের চিকিৎসকের সংখ্যা অপ্রতুল উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সংখ্যাগত দিক থেকে চিকিৎসক অপ্রতুল, তার ওপর মানসিক স্বাস্থ্য চিকিৎসায় ভুক্তভোগীকে অনেক বেশি সময় দিতে হয়। একেকটি সেশনে একজন চিকিৎসকের যে সময় যায়, তাতে করে চাইলেও রোগী দেখার সংখ্যা বাড়ানো সম্ভব না।’

যেসব জায়গায় নিয়মিত চিকিৎসা পাওয়া যায়

রাজধানীর জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে আউটডোর ও ইনডোর সেবা দেওয়া হয়। এ হাসপাতালের বেড সংখ্যা এখন ৪০০। সরেজমিনে দেখা যায়, সকাল থেকে এখানে ১০ টাকায় টিকিট করে চিকিৎসাসেবা নিতে আসেন শয়ে শয়ে রোগী। প্রতিদিন ৫ শতাধিক রোগী এখানে চিকিৎসা নেন। এদের মধ্যে হাতে গোনা কয়েকজন চিকিৎসকের অধীনে দেওয়া হয়। তারা প্রাথমিক অ্যাসেসমেন্ট শেষে ভর্তির রোগী হলে আলাদা করে দেন। বাকিদের ওষুধ দিয়ে বাড়ি পাঠানো হয়। এছাড়া, ৫০০ বেডের মাত্র একটি মানসিক হাসপাতাল রয়েছে পাবনায়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় ও কয়েকটি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে মানসিক রোগের চিকিৎসা দেওয়া হয়।

সেবা কেন সবাই পায় না

একমাত্র ইনস্টিটিউট জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের তথ্য বলছে, দেশে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার তুলনায় মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সংখ্যা খুবই কম। বাংলাদেশে প্রতি এক লাখ মানুষের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য কর্মীর সংখ্যা রয়েছে মাত্র ১.১৭ জন। এরমধ্যে ০.১৩ জন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, ০.০১ জন অন্যান্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, ০.৮৭ জন মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক সেবিকা এবং ০.১২ জন মনোবিজ্ঞানী ও অন্যান্য পেশাদার মানসিক স্বাস্থ্যকর্মী।

মাঠে যারা কাজ করেন, তাদের মধ্যে অন্যতম ঢাকা আহছানিয়া মিশনের স্বাস্থ্য সেক্টরের সিনিয়র সাইকোলজিস্ট রাখী গাঙ্গুলী। মানসিক রোগের চিকিৎসক বা স্বাস্থকর্মী উভয়ই অপ্রতুল হওয়ায়— কী ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ‘আমরা যখন কোনও প্রতিষ্ঠানকে ধরে সচেতনতা কার্যকম পরিচালনা করতে যাই, তখন তারা যেভাবে চায়, বা তাদের যে সহযোগিতা দরকার, সেটা দিতে পারি না। ফলে কোনও একটি সেশন করে আমরা ফেরত চলে আসি। ধারাবাহিকতা রাখা যায় না। যদি তাদের ওখানে কাউকে নিয়োগ দেওয়া যেতো, তবে এটা সমাধান হতো। আবার যখন কোনও অফিসের সহকর্মীদের আন্তঃব্যক্তিক যোগাযোগ নিয়ে কাজ করছি, তখনও ওই সেশনের পরে আর ফলোআপ থাকে না। বা তারা বিষয়গুলো জেনে আগ্রহ নিয়ে ফের আর আমাদের কাছে আসছে, এমন না।’

রোগী অনুযায়ী চিকিৎসক, মানসিক স্বাস্থ্যকর্মী অপ্রতুল হওয়ায় সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না উল্লেখ করে রাখী গাঙ্গুলী আরও বলেন, ‘আমরা যারা মাঠে আছি, তাদের প্রত্যেকের দৃষ্টিভঙ্গি বদল করে সম্মিলিতভাবে কাজ করা উচিত। কীভাবে দ্রুত এই অপ্রতুলতা দূর করা যায়, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালামনাই এবং শিক্ষার্থী পরামর্শ কেন্দ্র যৌথভাবে কিছু উদ্যোগ  নিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে যারা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হচ্ছে, আমরা তাদের টেলিকাউন্সিল থেকে শুরু করে ইন পারসন কাউন্সিলিংয়ে যুক্ত করছি। তাদের উদ্বুদ্ধ করছি কাজটিতে সম্পৃক্ত হতে।’