রাজধানীর আদ-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনার পরে হাসপাতালটির লাইসেন্স বাতিল করে স্বাস্থ্য অধিদফতর। এছাড়া ভর্তি থাকা রোগীদের অন্য হাসপাতালে স্থানান্তরের নির্দেশ দিয়েছে সরকারি এই প্রতিষ্ঠানটি। এরই প্রেক্ষিতে নতুন কোনও রোগী ভর্তি নিচ্ছে না হাসপাতালটি। তবে ভর্তি হয়ে থাকা ক্রিটিক্যাল রোগীদের এখনও চিকিৎসা দিচ্ছে আদ-দ্বীন হাসপাতাল।
সোমবার (১৫ জুন) রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ-দ্বীন মেডিক্যাল হাসপাতালে এমন চিত্র দেখা গেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, আদ-দ্বীন হাসপাতালে আগের মতো আর রোগীদের ভিড় নেই। নতুন রোগীদের ভর্তি কার্যক্রম বন্ধ থাকায় চিকিৎসা নিতে এসে অনেককেই ফিরে যেতে দেখা গেছে। তবে আগে থেকে ভর্তি থাকা গুরুতর ও সংকটাপন্ন কিছু রোগীর চিকিৎসা এখনও চলমান রয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী ভর্তি থাকা রোগীদের অন্য হাসপাতালে চলে যেতে বলেছে বলেও জানা গেছে। তেমন কোনও কাজ না থাকায় হাসপাতালের কর্মচারীদের অলস সময় কাটাতে দেখা গেছে। কেউ বসে আছেন, কেউবা পায়চারী করছেন। হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্সগুলোও বাইরে দাঁড়িয়ে আছে সারিবদ্ধভাবে।
৩৪ দিন ধরে বাচ্চাদের নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি আছেন গাজীপুর থেকে শামীম হোসেন। যমজ সন্তান হয়েছে তার। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমরা এসেছি গাজীপুর থেকে। আমার যমজ সন্তান হয়েছে এক ছেলে আর এক মেয়ে। ওরা আট মাসে জন্ম নেয়, তাই ওদের এনআইসিইউ-তে রাখা হয়। আজকে ৩৪ দিন ধরে এই হাসপাতালে আছি। শুনেছি চিকিৎসা ভালো, তাই এখানে আসা। এখন সত্যি কথা বলতে গেলে আমি ডাক্তারদের কথায় আশ্বস্ত হয়ে আছি। আমার সন্তানরা ভালো আছে।
হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে, তাহলে তারা কী ধরনের সেবা দিচ্ছে, জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি শুনেছি এখন আর রোগী নতুন করে ভর্তি নিচ্ছে না। কিন্তু আমার মতো যাদের অবস্থা তাদের কী করবে? এই মানুষগুলো কই যাবে?
চট্টগ্রামের অক্সিজেন এলাকার বাসিন্দা মো. রাব্বি জানান, তার আট মাস বয়সী সন্তান দীর্ঘদিন ধরে গুরুতর অসুস্থ। চার মাস বয়স থেকে শিশুটির চিকিৎসা চলছে। তিনি বলেন, চার মাস ধরে চট্টগ্রামে চিকিৎসা করিয়েছি। পরে চিকিৎসকরা জানিয়ে দেন, সেখানে আর চিকিৎসা সম্ভব নয়। তারা আমাকে ঢাকায় এই হাসপাতালের এক স্যারের অধীনে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দেন। এরপর আমি শিশুকে নিয়ে আদ-দ্বীন হাসপাতালে ভর্তি করি।
তিনি জানান, গত মাসের ২ তারিখ হাসপাতালে আসার পর শিশুর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকরা পিআইসিইউ প্রয়োজন বলে জানান। কিন্তু হাসপাতালে সে সুবিধা না থাকায় তাকে অন্য হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে ২০ দিন চিকিৎসার পর আবার আদ-দ্বীন হাসপাতালে ফিরে আসেন। বর্তমানে টানা ১২-১৩ দিন ধরে এখানে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
রাব্বি বলেন, আজ কিছু রিপোর্টের ফলাফল আসার কথা। চিকিৎসকরা বলেছেন, রিপোর্টের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হবে হাসপাতাল ছাড়ার বিষয়ে। এখন যদি হাসপাতাল থেকে বের করে দেওয়া হয়, তাহলে আমি কোথায় যাবো?
এসময় চিকিৎসা ব্যয়ের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, আমি চট্টগ্রামে দেড় থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত বিল দিয়েছি, কিন্তু তেমন কোনও উন্নতি হয়নি। এখানে ১২-১৩ দিনের চিকিৎসায় বিল এসেছে মাত্র ২৩ হাজার টাকা। সেই কারণে এখানে চিকিৎসা চালিয়ে গেলে আমার জন্য উপকার হয়।
রাজধানীর লালবাগ থেকে চিকিৎসা নিতে আসা মো. হাবীবুর রহমান বলেন, জরুরি বিভাগে ডাক্তার দেখাতে এসেছিলাম। এসে দেখি সবকিছু বন্ধ। পরে হাসপাতালের একজন কর্মচারী বললো— হাসপাতালের চিকিৎসা বন্ধ রয়েছে। জরুরি বিভাগও বন্ধ। হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল হয়েছে সেটা জানি।
এদিকে আজকে বিকালে এক সংবাদ সম্মেলনে আদ-দ্বীন ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক ডা. শেখ মহিউদ্দিন বলেন, আমরা রোগীদের বলেছি, আপনারা দ্রুত এখান থেকে অন্যত্র চলে যান। আমরা নতুন কোনও রোগীও ভর্তি করিনি। তবে কিছু রোগী আছে, বিশেষ করে আমাদের এনআইসিইউতে, যারা অত্যন্ত সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছে। তাদের স্থানান্তর করতে গেলে শিশুর মৃত্যুঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এই কারণেই আমরা জোর করে তাদের সরিয়ে দিইনি। রোগীদের নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনা করেই আমরা ধীরে ধীরে স্থানান্তরের প্রক্রিয়া পরিচালনা করছি।
উল্লেখ্য, ছয় নবজাতকের মৃত্যুর পরে রাজধানীর আদ-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করে স্বাস্থ্য অধিদফতর। হাসপাতালটিতে ভর্তি থাকা রোগীদের জরুরি ভিত্তিতে ঢাকার ৬টি সরকারি হাসপাতালগুলোতে রেফার করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। রেফারকৃত রোগীদের জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতর।
যে হাসপাতালগুলোতে রেফার করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে সেগুলো হলো—ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল এবং বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট।