হামে মৃত্যু থামছেই না, উচ্চ ঝুঁকিতে বাংলাদেশ

বাংলাদেশে চলমান হামের প্রাদুর্ভাবে মৃতের সংখ্যা ৮০০ ছাড়িয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বলছে, চলতি বছরে বিশ্বের সবচেয়ে বড় হামের প্রাদুর্ভাবগুলোর একটি এখন বাংলাদেশে। দেশজুড়ে টিকাদান কর্মসূচি চালানো হলেও সংক্রমণ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের (ডিজিএইচএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত মোট মৃত্যু বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮০৫ জনে। এর মধ্যে ৭১০ জন হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন এবং পরীক্ষাগারে ৯৫ জনের সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্যমতে, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে ১ লাখ ২১ হাজার ২০০ জনের। এ সময় হাম শনাক্ত হয়েছে ১৫ হাজার ৭ জনের। অর্থাৎ মোট আক্রান্ত হয়েছে ১ লাখ ৩৬ হাজার ২০৭ জন।

তবে স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলছেন, সব রোগীর পরীক্ষা না হওয়ায় প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে।

সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে ঢাকা বিভাগে—৩০৭ জন। এরপর সিলেটে ১০৬, রাজশাহীতে ৯০, ময়মনসিংহে ৬৭, চট্টগ্রামে ৫৬, বরিশালে ৪৩, খুলনায় ৩১ এবং রংপুর বিভাগে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে।

ডব্লিউএইচও বলছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রাদুর্ভাবগুলোর একটি

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত বাংলাদেশে ৪২ হাজার ১৭৪টি হামের ঘটনা শনাক্ত হয়েছে, যা ওই সময়ে বিশ্বের যেকোনও দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ।

সংস্থাটি বাংলাদেশের জাতীয় জনস্বাস্থ্য ঝুঁকিকে উচ্চ এবং আঞ্চলিক ঝুঁকিকে মাঝারি হিসেবে মূল্যায়ন করেছে। ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮ জেলায় সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া, নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির আওতা কমে যাওয়া এবং শিশুদের মধ্যে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার ঘাটতিকে এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে ডব্লিউএইচও।

কয়েক বছরের সাফল্য থেকে বড় ধাক্কা

কয়েক বছর আগেও দক্ষিণ এশিয়ায় টিকাদান কর্মসূচির সাফল্যের উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হতো বাংলাদেশ। ২০২৪ সালে নিশ্চিত হামের রোগী ছিল ২৪৭ জন এবং ২০২৫ সালে ১৩২ জন। দীর্ঘদিনের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) ফলে হামজনিত মৃত্যু খুবই কমে এসেছিল।

তবে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটায় পরিস্থিতির অবনতি ঘটে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর ফলেই কয়েক মাসের মধ্যে দেশে এক লাখ ২০ হাজারের বেশি সন্দেহভাজন রোগী এবং ৮০০-র বেশি মৃত্যুর ঘটনা ঘটে, যা সাম্প্রতিক দশকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রাদুর্ভাব।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিয়মিত টিকাদানের আওতা কমে যাওয়ায় বিপুলসংখ্যক শিশু সংক্রমণের ঝুঁকিতে পড়ে।

কোটি কোটি শিশু এখনও ঝুঁকিতে

সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার পর ২০২৬ সালের এপ্রিলে সরকার হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে। প্রথমে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় এবং পরে সারা দেশে এ কর্মসূচি চালানো হয়। এতে ছয় মাস থেকে পাঁচ বছরের কম বয়সী এক কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। সরকারের দাবি, নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার বেশি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে।

তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, লক্ষ্যমাত্রাই প্রকৃত শিশুসংখ্যার তুলনায় কম ছিল।

জুনে জাতীয় ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইনে একই বয়সী প্রায় দুই কোটি ২৬ লাখ শিশু অংশ নেয়। সে হিসাবে প্রায় ৪৬ লাখ শিশু হামের টিকাদান কর্মসূচির বাইরে থেকে যেতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রোগপ্রতিরোধ ঘাটতির কারণেই জাতীয় পর্যায়ে টিকাদান কর্মসূচি চালানোর পরও সংক্রমণ পুরোপুরি থামেনি।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুরা

প্রাদুর্ভাবে মোট মৃত্যুর প্রায় ৮০ শতাংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু।

বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের এক গবেষণায় দেখা গেছে, হাম নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া প্রায় ৮০ শতাংশ শিশুই আগে হামের টিকা পায়নি।

আবার আইসিডিডিআর,বি এবং বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালের ১৯ গবেষকের আরেকটি বিশ্লেষণে দেখা যায়, এপ্রিল-মে মাসে চিকিৎসা পাওয়া ৩৪১ শিশুর মধ্যে যারা মারা গেছে, তাদের ৫২ শতাংশের বয়স ছিল নয় মাসের কম। অর্থাৎ নিয়মিত টিকাদানের পূর্ণ সময়সূচি শেষ করার আগেই তারা আক্রান্ত হয়েছিল।

ডব্লিউএইচওর তথ্যেও দেখা গেছে, চলমান প্রাদুর্ভাবে প্রতি পাঁচজন আক্রান্তের চারজনই পাঁচ বছরের কম বয়সী।

চিকিৎসকদের মতে, টিকা না পাওয়া ও অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের ক্ষেত্রে নিউমোনিয়াই হামজনিত মৃত্যুর প্রধান কারণ।

টিকা সংগ্রহ প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকা সংগ্রহে জটিলতা এবং নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির দুর্বলতা পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করেছে।

এ বছর সায়েন্স সাময়িকীতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে টিকা কেনার নতুন পদ্ধতি চালুর পর সরবরাহে বিলম্ব হয় এবং সেটি হামের পুনরুত্থানে ভূমিকা রাখে।

২০২৫ সাল পর্যন্ত ইউনিসেফ, গ্যাভি এবং বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে দেশের টিকা সংগ্রহ করত। তবে ওই বছরের সেপ্টেম্বরে সরকার উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি চালু করলে ইউনিসেফ এ নিয়ে আপত্তি জানায় এবং এতে টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কার কথা একাধিকবার সরকারকে জানায়।

গত ২০ মে এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশে ইউনিসেফের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স বলেন, ২০২৪ সাল থেকে অন্তত ১০ বার সরকারকে সতর্ক করা হয়েছিল এবং এ বিষয়ে একাধিক আনুষ্ঠানিক চিঠিও দেওয়া হয়।

বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ রিয়াজ মোবারক বলেন, টিকাদান কর্মসূচির দুর্বলতাই বর্তমান সংকটের অন্যতম কারণ। তিনি জানান, অনেক মা নিজেও হামের টিকা না পাওয়ায় তাদের নবজাতক প্রয়োজনীয় মাতৃ-অ্যান্টিবডি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

তিনি নিয়মিত টিকাদানের আওতা দ্রুত বাড়ানো, রোগ নজরদারি জোরদার, গবেষণা সম্প্রসারণ এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত উদ্যোগে রোগপ্রতিরোধ ঘাটতি দূর করার আহ্বান জানান। তার মতে, তা না হলে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলা করা কঠিন হবে।