কমছে না হাম-ডেঙ্গুর প্রকোপ, ভোগান্তিতে স্বজনরা

হাম ও ডেঙ্গু আক্রান্ত শিশুদের চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে রাজধানীর শ্যামলীতে অবস্থিত বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট। প্রতিদিন এসব রোগে আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে হাসপাতালে আসছেন স্বজনরা। অনেককে বেডের জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে। কেউ কেউ এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ঘুরেও ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন না। এর মধ্যে ডেঙ্গু ওয়ার্ডে মশা নিয়ন্ত্রণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকার অভিযোগও করেছেন রোগীর স্বজনরা। এতে চিকিৎসা নিতে এসে ভোগান্তির পাশাপাশি সুস্থ হওয়ার পরও শিশুদের নতুন করে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা।

মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে সরেজমিনে এমন চিত্র দেখা গেছে।

হামে আক্রান্ত আট মাস ২৩ দিন বয়সী সন্তানকে নিয়ে তিন দিন ধরে হাসপাতালে আছেন বাবা তুষার ইমরান। তার মেয়ে আইসিইউতে ভর্তি। সাধারণ বেডে দেওয়া হবে কিনা, সেই অপেক্ষায় আছেন তারা। বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা করিয়েও সুস্থ না হওয়ায় পরে শ্যামলীর শিশু হাসপাতালে নিয়ে আসেন মেয়েকে।

তুষার বলেন, “গত মাসের ৩১ তারিখের পর মেয়েকে গ্রামের বাড়ি চাঁদপুরে পাঠিয়েছিলাম। সেখানে দুই দিন থাকার পর রোটাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে তার ডায়রিয়া হয়। পরে চাঁদপুর সদরের একটি প্রাইভেট হাসপাতালে ভর্তি করাই। সেখান থেকে ডায়রিয়ার জন্য আইসিডিডিআর,বি হাসপাতালে ভর্তি করাই। সেখানে এক দিন থাকার পর স্যালাইন ও ওষুধ দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়।”

তিনি বলেন, “ডায়রিয়া ভালো হয়ে যাওয়ার পর ঠান্ডা, কাশি ও জ্বর শুরু হয়। স্থানীয় চিকিৎসকদের দেখালে অ্যান্টিবায়োটিক জাতীয় ওষুধ দেন। পরে মতলব থেকে মেয়েকে গাজীপুরে নিয়ে যাই। পরীক্ষা করার পর নিউমোনিয়া ধরা পড়ে। অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়ার পর কিছুটা ভালো হলেও আবার ঠান্ডা, জ্বর ও বমি শুরু হয়। একপর্যায়ে তাকে উত্তরা আধুনিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।”

তুষার আরও বলেন, “সেখানে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়ার পর মেয়ের মাথায় সাদা সাদা র‍্যাশ দেখা দেয়। চিকিৎসকরা জানান, এটি ঘামাচি নয়। পরে পরীক্ষা করালে রক্তে হামের পজিটিভ ফল আসে। দুটি পরীক্ষা করা হয়েছে। তবে হামটি হাসপাতালে যাওয়ার পর হয়েছে, নাকি বাড়ি থেকেই উপসর্গ ছিল—তা নিশ্চিত নই। এরপর এই শিশু হাসপাতালে নিয়ে আসি। আসার পর থেকেই আইসিইউতে আছে। আজ বেডে দেওয়ার কথা।”

সাত মাস তিন দিন বয়সী সন্তানকে নিয়ে ছয় দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি আছেন নিশাত মনি লিজা। তিনি বলেন, “ওর প্রায় ১০ দিন ধরে জ্বর ছিল, আর ঠান্ডা ছিল সাত-আট দিন। প্রথমে কল্যাণপুরের ইবনে সিনায় ডাক্তার দেখিয়েছিলাম। সেখানে জ্বরের ওষুধ ও অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হলেও জ্বর কমেনি। এভাবে কয়েক দিন চলার পর এখানে ভর্তি করাই।”

তিনি বলেন, “হাম ধরা পড়েছে প্রায় ১০ দিন হলো। আমার ছেলের বয়স সাত মাস তিন দিন। সে হাম টিকা পায়নি। নয় মাস বয়স হলে টিকা পাওয়ার কথা। এখন চিকিৎসা চলছে। অবস্থা মোটামুটি ভালো। ডাক্তাররা আজ এসে বলেছেন, সব ঠিকঠাক থাকলে আগামীকাল তাকে রিলিজ দিতে পারেন।”

ছেলের বউ ও নাতিকে নিয়ে ছয় দিন ধরে হাসপাতালে আছেন কনিকা আক্তার। তিনি বলেন, “আমার নাতি আজ নয় দিন হলো হাম হয়েছে। আমরা চাঁদপুরে ছিলাম। ওখানে ডাক্তার দেখানোর পরে এখানে এসেছি। হাম হওয়ার আগে বাচ্চার জ্বর ও ঠান্ডা ছিল। পরে নিউমোনিয়াও ধরা পড়ে। সেখান থেকে আমাকে এখানে রেফার করে দেওয়া হয়।”

তিনি বলেন, “প্রথম দিনই ডাক্তার আমাকে আইসিইউতে নেওয়ার কথা বলেছিলেন। কিন্তু আমার পক্ষে আইসিইউর খরচ চালানো সম্ভব ছিল না। আমরা অনুরোধ করেছিলাম, যাতে ওয়ার্ডের বেডে রেখেই আইসিইউর চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে এখানেই যতটা পেরেছে আইসিইউর চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। নাতির অক্সিজেন লাগানো ছিল। আজকে অক্সিজেন খুলে দেওয়া হয়েছে। আলহামদুলিল্লাহ, এখন বাচ্চা সুস্থ আছে। ডাক্তাররা বলেছেন, কালকে আমরা চলে যেতে পারি।”

মাতুয়াইল থেকে সন্তানকে নিয়ে এসেছেন মোহাম্মদ জাহিদ ভূঁইয়া। ইমার্জেন্সি বিভাগে ডাক্তার দেখানোর অপেক্ষায় ছিলেন তিনি।

জাহিদ বলেন, “বাচ্চার প্রচণ্ড ঠান্ডা ও অতিরিক্ত কাশি হয়েছে। মাতুয়াইল মাতৃসদন হাসপাতালে দেখিয়েছি। পরীক্ষা ও এক্স-রে করানোর পর চিকিৎসক ওষুধ দেন এবং গ্যাস (নেবুলাইজার) দিতে বলেন। প্রায় এক সপ্তাহ ধরে বাচ্চার এই অবস্থা। গত দুই দিন ধরে দিনে তিনবার গ্যাস দিচ্ছি। কিন্তু কোনও উন্নতি হয়নি, বরং অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে। তাই নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিয়ে বাচ্চাকে এখানে নিয়ে এসেছি।”

তিনি বলেন, “এখানে এখনও কোনও সিট পাইনি, এমনকি ডাক্তারও দেখাতে পারিনি। ডাক্তার দেখানোর জন্য লাইনে আছি। দেখা যাক কী হয়।”

এক পরিবারের দুই শিশুই ডেঙ্গু আক্রান্ত

একই পরিবারের দুই বোন রোসাইবা ও সিদরাতুল ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে শ্যামলীর শিশু হাসপাতালে ভর্তি। রোসাইবার বয়স চার মাস ২১ দিন এবং সিদরাতুলের চার বছর সাত মাস। কথা হয় তাদের মামা তুষার ইমরানের সঙ্গে।

তুষার বলেন, “আমার বোনের দুই মেয়েকে এই মাসের ২৩ তারিখে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। রোসাইবাকে নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়ার কারণে ভর্তি করানো হয়। হাসপাতালে আসার পর ডেঙ্গুর পরীক্ষা করা হলে পজিটিভ আসে। পরে জানতে পারি, ডেঙ্গু আগে থেকেই হয়েছিল। কিন্তু আগে পরীক্ষা করানো হয়নি বলে বুঝিনি। এখন ডাক্তার বলেছেন, রোগীর অবস্থা ভালো না। তবে এই মুহূর্তেই আইসিইউতে নিতে হবে, এমনও না।”

তিনি বলেন, “সিদরাতুলেরও ডেঙ্গু। ওদের দুইজনকেই এর আগে একটি প্রাইভেট হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। কিন্তু সেখানে অনেক খরচ হওয়ায় পরে ডাক্তাররা সহযোগিতা করেছেন। এরপর এখানে নিয়ে এসেছি। এখন কবে ছাড়বে, সেটা জানা যায়নি।”

ডেঙ্গু আক্রান্ত মেয়েকে নিয়ে তিন দিন ধরে হাসপাতালে আছেন মোসাম্মাৎ আরিফা খাতুন। ১০৪ ডিগ্রির মতো জ্বর ও শরীর ব্যথা থাকায় মেয়েকে হাসপাতালে ভর্তি করান তিনি।

আরিফা বলেন, “শুক্রবার রাতে ওর অনেক জ্বর আসে। শনিবার সকালে নিয়মিত ডাক্তারকে দেখাই। এরপর তিনি পরীক্ষা দেন। পরদিন রিপোর্ট নিয়ে গেলে জানান, ডেঙ্গু পজিটিভ এসেছে এবং হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে। তখনই হাসপাতালে ভর্তি করি।”

তিনি বলেন, “জ্বর ১০৪ ডিগ্রি বা তারও বেশি উঠেছিল মনে হচ্ছিল। শরীরেও ব্যথা ছিল। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর এখন আগের চেয়ে অনেকটাই ভালো আছে। ডেঙ্গু ছাড়া অন্য কোনও সমস্যা নেই।”

‘ডেঙ্গু ওয়ার্ডে মশা নিয়ন্ত্রণের যথেষ্ট ব্যবস্থা নেই’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডেঙ্গু আক্রান্ত এক শিশুর মা বলেন, “আমরা মিরপুরের কাজীপাড়া থেকে এসেছি। ডেঙ্গু পজিটিভ আসার পর বাচ্চাকে নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হই। ডেঙ্গু হয়েছে সাত দিন। প্লাটিলেট কমে যাওয়ায় হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছি।”

হাসপাতালে বেড পেতে ভোগান্তির কথা জানিয়ে তিনি বলেন, “আমাদের প্রথমে সোহরাওয়ার্দীতে পাঠানো হয়েছিল। দুই-তিন দিন সোহরাওয়ার্দীতে দৌড়াদৌড়ি করেছি, কিন্তু সিট পাইনি। পরে এখানে আসি। এখানে ভর্তি করতেও অনেক ফাইট করতে হয়। দুপুর দুইটা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত দাঁড়িয়েই ছিলাম।”

তিনি বলেন, “টেস্টের রিপোর্টে দেখি, প্লাটিলেট ১ লাখ ৭০ হাজার থেকে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ১ লাখ ১০ হাজারে চলে এসেছে। জ্বর ১০৩ ডিগ্রি পর্যন্ত উঠেছিল। পরে নিয়মিত চিকিৎসকের মাধ্যমে অনুরোধ করে এখানে বেড পেয়েছি। আমার মনে হয়েছে, সাধারণ মানুষের জন্য এখানে বেড পাওয়া খুব কঠিন।”

হাসপাতালের মশা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনা নিয়েও অভিযোগ করে তিনি বলেন, “ডেঙ্গুর ওয়ার্ড এটা, কিন্তু হাসপাতালে মশা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাও যথেষ্ট নয়। অনেক জানালা সারাক্ষণ খোলা থাকে। আমরা নিজেরাই মশারি কিনে এনেছি। হাসপাতাল থেকে রোগীদের মশারি দেওয়া হয়নি। নিয়মিত স্প্রে বা অ্যারোসল ব্যবহার এবং জানালায় নেট দেওয়ার ব্যবস্থা করা উচিত।”

হাসপাতালে কর্মকর্তারা যা বলছেন

হাসপাতালের এক কর্মকর্তা বলেন, “ডেঙ্গু যেহেতু মশার মাধ্যমে ছড়ায়, তাই শিশুদের ক্ষেত্রে মশারি ব্যবহারে বাবা-মায়ের সচেতনতা গুরুত্বপূর্ণ। বড়রা অনেক সময় কয়েলের ধোঁয়া সহ্য করতে পারেন, কিন্তু শিশুদের ক্ষেত্রে তাদের সুরক্ষার দায়িত্ব বাবা-মায়ের।”

তিনি আরও বলেন, “আমাদের হাসপাতালে প্রচুর রোগী আসে। অনেক সময় আমরা বেড দিতে পারি না। একজন অসুস্থ রোগীকে ছুটি না দিয়ে নতুন রোগীর জন্য বেড দেওয়া সম্ভব নয়। তাই অনেক সময় জরুরি বিভাগে রেখেও রোগীদের চিকিৎসা দিতে হয়।”

এই কর্মকর্তা বলেন, “হাম ও ডেঙ্গু দুই ধরনের রোগীই আমাদের এখানে আসে। যখন যে রোগের প্রকোপ বেশি থাকে, তখন সেই রোগীর সংখ্যাও বেশি হয়। গত বছর প্রচুর ডেঙ্গু রোগী হওয়ায় আমরা আলাদা ডেঙ্গু সেল পর্যন্ত করেছিলাম। এবার মিজেলসের রোগী বেশি হওয়ায় মিজেলসের জন্য আইসিইউ পর্যন্ত প্রস্তুত রাখা হয়েছে, যাতে রোগীর সংখ্যা বাড়লে দ্রুত চিকিৎসা দেওয়া যায়।”

তিনি বলেন, “এখন ডেঙ্গুর প্রকোপ কিছুটা কম। তবে সাত দিনের মধ্যে পরিস্থিতি আবার পরিবর্তন হতে পারে। তাই পরিস্থিতি সব সময় পরিবর্তনশীল।”

হাসপাতালের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দায়িত্বরত একজন জানান, বর্তমানে হাসপাতালে হামে আক্রান্ত ৯৯ জন ভর্তি রয়েছে। এছাড়া ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ভর্তি রয়েছে ৩৯ জন।