হাসপাতালে বাড়ছে ডেঙ্গু রোগী, উত্তরাঞ্চলে শঙ্কা

দুলাল আবদুল্লাহ, রাজশাহী
২৩ আগস্ট ২০২৬, ১০:০১আপডেট : ২৩ আগস্ট ২০২৬, ১৩:২৮

রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে বাড়ছে ডেঙ্গু রোগী। এর মধ্যে রাজশাহী নগরীতে মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে এডিস মশার প্রজনন ঘনত্ব বেড়েছে দ্বিগুণ। একই সময়ে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে বাড়ছে ডেঙ্গু রোগীর চাপ। অন্যদিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালেও প্রতিদিনই ভর্তি হচ্ছেন নতুন ডেঙ্গু রোগী। ফলে দুই জেলাতেই ডেঙ্গুর ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

কোনও এলাকায় এডিস মশার প্রজনন ঘনত্ব বোঝার একটি কীটতাত্ত্বিক সূচকের নাম ব্রেটো সূচক। স্বাস্থ্য অধিদফতরের সর্বশেষ কীটতাত্ত্বিক জরিপে রাজশাহী নগরীর পাঁচটি এলাকায় এই সূচক পাওয়া গেছে ৬১ দশমিক ৩৩। গত মে মাসে একই এলাকায় এ সূচক ছিল ৩০ দশমিক ৬৬। অর্থাৎ দুই মাসের ব্যবধানে এডিস মশার প্রজনন ঘনত্ব দ্বিগুণ হয়েছে।

গত ৩ থেকে ১০ আগস্ট রাজশাহী নগরীর কাজিহাটা, চণ্ডিপুর, উপরভদ্রা, নামোভদ্রা ও হাজরাপুকুর এলাকায় এ জরিপ চালানো হয়। এ সময় ৭৫টি বাড়ি পরিদর্শন করে ২৪টিতে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া যায়। একই সময়ে ৬৮টি পানি ধারণকারী পাত্র পরীক্ষা করে ৪৬টিতেই এডিসের লার্ভার উপস্থিতি পাওয়া গেছে।

জরিপে বিভিন্ন প্রজননস্থল থেকে ৬৮৫টি মশার লার্ভা সংগ্রহ করা হয়। এর মধ্যে ৫০৫টি ছিল এডিস অ্যালবোপিকটাস এবং ৮৬টি এডিস ইজিপ্টি। বাকি ৯৪টি ছিল অন্য প্রজাতির মশার লার্ভা। ফুলদানি, প্লাস্টিক ও সিরামিকের টব, মাটি ও টিনের পাত্র, নারকেলের খোসা, সিমেন্টের টব, ড্রাম, জলমগ্ন মেঝে, রঙের বালতি ও প্লাস্টিকের বালতিতে এসব লার্ভা পাওয়া গেছে।

এডিস মশার প্রজননের উচ্চ ঘনত্ব বিষয়ে রাজশাহী বিভাগের বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. হাবিবুর রহমান জানান, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিকা অনুযায়ী কোনও এলাকায় ব্রেটো সূচক ২০-এর বেশি হলে সেটিকে ডেঙ্গুর উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সর্বশেষ জরিপে রাজশাহীর সূচক ৬১ দশমিক ৩৩ হওয়ায় পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। এ অবস্থায় ডেঙ্গু প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসককে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

শুধু মশার প্রজনন নয়, রাজশাহীর হাসপাতালগুলোতেও বাড়ছে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা। রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত ১৩ জুন হাসপাতালে একজন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন ছিলেন। ৩০ জুলাই এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় নয় জনে।

আগস্টে রোগীর সংখ্যা আরও বেড়েছে। ৬ আগস্ট হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগী ছিলেন ১৩ জন। ৮ আগস্ট ২৩ জন, ৯ আগস্ট ২৬ জন এবং ১০ আগস্ট রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩০ জনে। গত ১৫ আগস্ট সর্বোচ্চ ৩৩ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন ছিলেন। এরপর ১৬ আগস্ট ২৭ জন, ১৭ আগস্ট ২৫ জন এবং ১৮ আগস্ট ৩২ জন রোগী ছিলেন। ১৯ আগস্ট হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগী ছিলেন ২৮ জন। ২০ আগস্টও হাসপাতালে ২৭ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি ছিলেন।

রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শেখ শামীম আহমেদ বলেন, ‘গত ১১ আগস্ট হাসপাতালে একজন ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হয়েছে। বর্তমানে রোগীর চাপ কিছুটা বাড়ছে। তবে ডেঙ্গু রোগীদের সুচিকিৎসা দিতে হাসপাতালের প্রস্তুতি রয়েছে।’

রাজশাহী নগরীর কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, ‘মশার উৎপাত বেড়েছে। কিন্তু সিটি করপোরেশনের তেমন জোরালো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। নাগরিকদের সচেতনতার পাশাপাশি ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষকেও বড় ভূমিকা পালন করতে হবে।’

এ বিষয়ে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা শেখ মো. মামুন ডলার বলেন, ‘ডেঙ্গু পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয়। তবে এর বিস্তার ঠেকাতে প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম চলছে। প্রতিটি ওয়ার্ডে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানোর পাশাপাশি বাসিন্দাদের সচেতন করা হচ্ছে।’

চাঁপাইনবাবগঞ্জেও বাড়ছে রোগী

এদিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জে বাড়তে শুরু করেছে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। জেলার ২৫০ শয্যার জেলা হাসপাতালে প্রতিদিনই বাড়ছে ডেঙ্গু রোগী ভর্তি। চিকিৎসকদের আশঙ্কা, এখনও ডেঙ্গুর মূল ঢেউ শুরু হয়নি; বর্ষার বাকি সময়ে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতাল সূত্রে ২১ আগস্ট পাওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে হাসপাতালে মোট ৫২ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন। চিকিৎসাধীন রোগীদের মধ্যে ২৫ জন পুরুষ, ২০ জন নারী ও সাত জন শিশু। শিশুদের মধ্যে ছয় জন ছেলে ও একজন মেয়ে।

২০ আগস্ট পর্যন্ত হাসপাতালে ডেঙ্গু নিয়ে ভর্তি ছিলেন ৫০ জন রোগী। এরপর ডেঙ্গুর লক্ষণ নিয়ে নতুন করে আরও ৩৯ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে ১৭ জন হাসপাতালের বহির্বিভাগে শনাক্ত হয়েছেন। নতুন ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে ২৩ জন পুরুষ, ১৩ জন নারী ও ৩ জন শিশু। শিশুদের মধ্যে একজন ছেলে ও দুজন মেয়ে।

২১ আগস্ট চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৩৬ জন রোগী। ছাড়পত্র পাওয়া এসব রোগীর মধ্যে ১৪ জন পুরুষ, ১৮ জন নারী ও চার জন শিশু। শিশুদের মধ্যে একজন ছেলে ও তিন জন মেয়ে। এ ছাড়া উন্নত চিকিৎসার জন্য একজন নারী রোগীকে রাজশাহীতে রেফার করা হয়েছে। 

২৫০ শয্যার চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালের আরএমও ডা. মো. মাহবুব হাসান বলেন, ‘বৃষ্টিপাতের কারণে ডেঙ্গু রোগীর চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় হাসপাতালের ডেঙ্গু কর্নার প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও অন্যান্য উপকরণ মজুত রাখা হয়েছে। চিকিৎসক সংকটের মধ্যেও রোগীদের যথাযথ চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে।’

২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে শুক্রবার (২১ আগস্ট) পর্যন্ত চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালে সর্বমোট ৪৯২ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। পাশাপাশি হাসপাতালের বহির্বিভাগেও নিয়মিত ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হচ্ছে। বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত বহির্বিভাগে শনাক্ত হওয়া রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩১৬ জনে। তবে চলতি বছর এখন পর্যন্ত এই হাসপাতালে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে কারও মৃত্যু হয়নি।

এর আগে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ৩০ জুলাই পর্যন্ত হাসপাতালে মোট ১৩০ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছিলেন। এর মধ্যে গত দুই সপ্তাহেই ভর্তি হয়েছিলেন প্রায় শতাধিক রোগী। ৩০ জুলাই নতুন করে ১২ জন ভর্তি হয়েছিলেন। একই দিনে সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছিলেন ১৩ জন এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য একজনকে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছিল। তখন হাসপাতালে ২০ জন রোগী চিকিৎসাধীন ছিলেন।

ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালের পুরুষ ও মহিলা ওয়ার্ডে পৃথক দুটি ডেঙ্গু কর্নার চালু রয়েছে। মোট ২০টি শয্যার ব্যবস্থা থাকায় তখন পর্যন্ত কোনও রোগীকে মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দিতে হয়নি। তবে রোগীর চাপ আরও বাড়লে অতিরিক্ত ওয়ার্ড চালুর প্রস্তুতি রয়েছে বলে জানিয়েছিল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১০ শয্যার ওয়ার্ডের প্রতিটি বেডেই রোগী ভর্তি রয়েছে। প্রতিটি শয্যায় মশারি টাঙানো হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে।

পুরুষ ওয়ার্ডের দায়িত্বে থাকা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্টাফ নার্স জানান, ওয়ার্ডে ১০টি বেড রয়েছে এবং সবগুলোতেই বর্তমানে রোগী ভর্তি। অন্য রোগীদের ক্ষেত্রে অনেক সময় বেড সংকট দেখা দিলেও ডেঙ্গু রোগীদের এখন পর্যন্ত ফ্লোরে রেখে চিকিৎসা দেওয়ার প্রয়োজন হয়নি।

তবে সামনের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘এখনও ডেঙ্গুর বড় ঢেউ শুরু হয়নি। সামনে রোগীর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। তবে চিকিৎসা সামগ্রী, ওষুধ বা প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের কোনও সংকট নেই। ডেঙ্গু রোগীদের প্রয়োজনীয় সব ধরনের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা হচ্ছে।’

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনের মহাসচিব মনিরুজ্জামান মনির বলেন, ‘ডেঙ্গু মূলত এডিস মশাবাহিত রোগ। শহর পরিষ্কার করার দায়িত্ব পৌরসভার, তবে পৌরসভার যে কার্যক্রম, সেটা একেবারেই নগণ্য মানের। এছাড়া পৌরসভার নাগরিকদের সচেতনতা জরুরি। আগে মশা মারার ফগার মেশিনের আওয়াজ শোনা গেলেও দীর্ঘদিন ধরে তা চোখে পড়ে না। অনতিবিলম্বে ফগার মেশিন দিয়ে মশা নিধন করা উচিত।’

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর আসনের এমপি নুরুল ইসলাম বুলবুল এবং সাবেক এমপি ও জেলা পরিষদ প্রশাসক হারুনুর রশিদ হারুন জানান, পৌরসভা পরিষ্কার করার দায়িত্ব পৌরসভা কর্তৃপক্ষের। পৌরসভায় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি না থাকায় এসব সমস্যা সামনে আসছে। এরপরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

/এএম/ 
সম্পর্কিত
ডেঙ্গুতে ঝরলো আরও ৫ প্রাণ
হাম উপসর্গে ২৪ ঘণ্টায় ৩ জনের মৃত্যু
রাতে ‘বেগুন ভর্তা’ খাওয়ার পর ৩ বোনের রহস্যজনক মৃত্যু
সর্বশেষ খবর
সব ধর্মের মানুষের কথা বলার অধিকার নিশ্চিত করতে চাই: প্রতিমন্ত্রী
সব ধর্মের মানুষের কথা বলার অধিকার নিশ্চিত করতে চাই: প্রতিমন্ত্রী
বাংলা কিউআরে লেনদেন ১১০ কোটি টাকা ছাড়ালো
বাংলা কিউআরে লেনদেন ১১০ কোটি টাকা ছাড়ালো
পাকিস্তানে ২০২৭ সালে এসএ গেমস
পাকিস্তানে ২০২৭ সালে এসএ গেমস
মেট্রোরেলের নিচের সিসি ক্যামেরা আছে কিনা, জানতে চান হাইকোর্ট
মেট্রোরেলের নিচের সিসি ক্যামেরা আছে কিনা, জানতে চান হাইকোর্ট
সর্বাধিক পঠিত
নতুন দায়িত্বে চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন 
নতুন দায়িত্বে চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন 
খেজুর-শসার সূত্র ধরে চার খুনে জড়িতদের যেভাবে ধরলো পুলিশ
খেজুর-শসার সূত্র ধরে চার খুনে জড়িতদের যেভাবে ধরলো পুলিশ
১০ কোটি টাকা নিয়ে উধাও ব্যাংক কর্মকর্তারা, প্রতিবাদ জানাতে এসে অজ্ঞান ব্যবসায়ী
১০ কোটি টাকা নিয়ে উধাও ব্যাংক কর্মকর্তারা, প্রতিবাদ জানাতে এসে অজ্ঞান ব্যবসায়ী
রংপুরে শিক্ষক পরিবারের ৪ জনকে হত্যার রহস্য উদঘাটন, যা জানালো পুলিশ
রংপুরে শিক্ষক পরিবারের ৪ জনকে হত্যার রহস্য উদঘাটন, যা জানালো পুলিশ
ব্যক্তিগত যানবাহনে সিএনজি সরবরাহ বন্ধ রাখার দাবি 
ব্যক্তিগত যানবাহনে সিএনজি সরবরাহ বন্ধ রাখার দাবি