রাজধানীর ফার্মেসিতে স্যালাইনের আকাল 

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার ফার্মেসিতে পাওয়া যাচ্ছে না প্রয়োজনীয় আইভি স্যালাইন। কোথাও ১০০ মিলিলিটার বা ২৫০ মিলিলিটারের স্যালাইন থাকলেও ৫০০ মিলিলিটার ও এক লিটারের স্যালাইন মিলছে না। আবার কোনও কোনও ফার্মেসিতে সব ধরনের স্যালাইন নেই। বিক্রেতাদের অভিযোগ, কোম্পানিগুলো চাহিদা অনুযায়ী স্যালাইন সরবরাহ করছে না। কোথাও ১০ কার্টন অর্ডার দিলে পাওয়া যাচ্ছে এক কার্টন, আবার ১০টি চাইলে দেওয়া হচ্ছে পাঁচটি। অন্যদিকে, রোগীর স্বজনরা স্যালাইনের এই সংকট নিয়ে পড়েন চরম ভোগান্তিতে।  

শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) রাজধানীর মিরপুর ২, মিরপুর ১০ ও ফার্মগেট এলাকার কয়েকটি ফার্মেসি ঘুরে এমন চিত্র পাওয়া গেছে। বিক্রেতাদের কেউ কেউ জানিয়েছেন, ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় স্যালাইনের চাহিদা বেড়েছে। হাসপাতালগুলোতে সরবরাহের চাপ থাকায় খুচরা ফার্মেসিতে স্যালাইন কম পাওয়া যাচ্ছে বলে তাদের ধারণা।

সাভার থানা রোডের বাসিন্দা হাসনাত পিয়াস। এক সপ্তাহ আগে তার চাচি ডেঙ্গু আক্রান্ত হন। নিয়ে যান পাশের এক হাসপাতালে চিকিৎসকের কাছে। চিকিৎসক ডেঙ্গু নিশ্চিত করে হাসপাতালে ভর্তির পরামর্শ দেন। কিন্তু সিট খালি নেই। তাই আপাতত বাসায় থেকে স্যালাইন দেওয়ার পরামর্শ দেন। পরে তারা বাসায় নিয়ে স্যালাইন কিনতে যান ফার্মেসিতে। তখনই পড়েন ভোগান্তিতে। কোথাও খুঁজে পাচ্ছিলেন না শিরায় দেওয়ার স্যালাইন। দুই ঘণ্টা ঘুরে পান ১ লিটারের এক ব্যাগ।

হাসনাত পিয়াস বলেন, দুই ঘণ্টা ঘুরে আসেপাশের সব ফার্মেসি ঘুরে একটা স্যালাইনও পাইনি। কিন্তু আমার তখন অনেক জরুরি ছিল। কই পাবো বুঝতেও পারছিলাম না। পরে এলাকার পরিচিত ফার্মেসির লোক দিয়ে কোম্পানির লোককে ফোন দিয়ে এক লিটারের একটি জোগাড় করতে পেরেছি। পরের দিন হাসপাতালে সিট খালি হলে সেখানে ভর্তি করি। কিন্তু আমার কথা হচ্ছে দেশের এমন জরুরি মুহূর্তে এরকম প্রয়োজনীয় একটা জিনিস পাবো না! এটা কীভাবে হতে পারে? মাঝে মাঝে বুঝতে পারি না আমরা কেমন দেশে থাকছি। সংকটময় সময়ে এমন জরুরি একটি জিনিস থাকবে না কেন?  

তিনি আরও বলেন, ফার্মেসিতে গিয়ে জানতে পেরেছি স্যালাইনের নাকি সংকট আছে। কিন্তু এটাতো হওয়ার কথা ছিল না। সরকারের উচিত জরুরি ভিত্তিতে এ দিকে নজর দেওয়া।

কেবল পিয়াস না, এমন অসংখ্য রোগীর স্বজনরা ভোগান্তিতে পড়েছেন বলে খবর পাওয়া যায়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে খোঁজ নেওয়া হয় বিভিন্ন ফার্মেসিতে।  

মিরপুর ২ নম্বরের নওরীন মেডিসিন কর্নারের বিক্রেতা বলেন, ‘আমাদের এলাকার দোকানে স্যালাইন দেয় না। আমাদের ফার্মেসিতেও নেই। ডেঙ্গু রোগী বেড়ে যাওয়ায় নাকি সংকট হয়েছে, তাই আমরা পাই না। শুধু হাসপাতালগুলোতে দেয়।’

একই এলাকার হাসান ড্রাগ হাউজে ১০০ মিলিলিটারের স্যালাইন পাওয়া গেলেও ৫০০ মিলিলিটার ও এক লিটারের স্যালাইন ছিল না। বিক্রেতা জানান, ডেঙ্গু রোগী বেড়ে যাওয়ার কারণে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে তারা শুনেছেন।

মিরপুর ১০ নম্বরের তামান্না ফার্মেসির বিক্রেতা জানান, তাদের কাছে শুধু ২৫০ মিলিলিটারের স্যালাইন রয়েছে। কোম্পানি সরবরাহ করছে না, তাদের নিজেদেরও সংকট রয়েছে বলে জানানো হয়েছে। কিছু হাসপাতালে খোঁজ নিলে স্যালাইন পাওয়া যেতে পারে বলে তিনি জানান।

একই এলাকার এইচ আর ফার্মার বিক্রেতার ভাষ্য, ‘আমরা ১০টা অর্ডার দিলে দেয় পাঁচটা। এভাবে হলে কীভাবে হবে? শুনেছি, হাসপাতালগুলোতে দেয়।’

মিরপুর ১০ নম্বরের আলোক হাসপাতালের ফার্মেসিতে অবশ্য স্যালাইন পাওয়া গেছে। তবে সেখানকার বিক্রেতা জানান, জরুরি রোগীদের প্রয়োজনেই স্যালাইন দেওয়া হচ্ছে। কোম্পানি থেকে পর্যাপ্ত সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না। সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল এলাকা কিংবা শাহবাগে খোঁজ নিতে পরামর্শ দেন তিনি।

শাফিয়া ফার্মা অ্যান্ড ডেইলি মার্টের বিক্রেতা জানান, তাদের কাছে এক লিটার ও ১০০ মিলিলিটারের কয়েকটি স্যালাইন রয়েছে। তারা বলেন, ‘আমরা ১০ কার্টন অর্ডার করলে এক কার্টন পাই। কোম্পানি দিচ্ছে না। তারা নাকি হাসপাতালগুলোতে দিয়েই কভার করতে পারছে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমার কাছে যা আছে সেটা আমি একজনকে দুইটার বেশি দিতে পারবো না এই মুহূর্তে।’

ফার্মেসিতে দাম নিয়েও সমস্যা

ফার্মগেট এলাকায় স্যালাইনের সরবরাহ ও দাম নিয়ে ভিন্ন চিত্র পাওয়া গেছে। মা মেডিসিন অ্যান্ড ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের বিক্রেতা মো. রবিউল জানান, তাদের কাছে সব সাইজের স্যালাইন রয়েছে। সংকট আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, সব সময় অল্পবিস্তর ঘাটতি থাকে, তবে তাদের দোকানে সব সাইজের স্যালাইন পাওয়া যাচ্ছে।

অন্যদিকে, ফার্মগেটের এমএসডি মেডিক্যাল হলের বিক্রেতা গৌতম চন্দ্র রায় জানান, তার পছন্দের ব্র্যান্ড বেক্সিমকোর স্যালাইন ছয় মাস ধরে পাচ্ছেন না। অন্য কোম্পানির স্যালাইনও সহজে পাওয়া যাচ্ছে না বলেও দাবি করেন তিনি।

গৌতম চন্দ্র রায় বলেন, ‘বেক্সিমকোর ওপর আমার আস্থা বেশি। কিন্তু বেক্সিমকোরটা তো নেই। অন্য কোম্পানিরটাও পাওয়া যায় না। এখন সংকট আছে। অন্য কোম্পানিরটা বাজারে বেশি দামে কিনতে হয়।’

তার দাবি, ৫০০ মিলিলিটারের স্যালাইন স্বাভাবিকভাবে ৬৫ থেকে ৭০ টাকায় কেনা গেলেও সংকটের সময় তা কিনতে ৮০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে। বেশি দামে কিনে বিক্রি করতে গেলে ক্রেতাদের সঙ্গে বিরোধ তৈরি হয় বলে তিনি জানান।

গৌতম চন্দ্র রায় বলেন, ‘কাস্টমারের কাছে এই দাম চাইলে কাস্টমার আমাকে উল্টাপাল্টা কথা বলে। এই জন্য রাখতেছি না। শুধু শুধু কাস্টমারের সঙ্গে ঝগড়া করার দরকার নেই। তার চেয়ে ভালো রাখবো না, বেচবো না এইটাই ভালো। যার প্রয়োজন, সে খুঁজে নেবে।’

ফার্মগেটের লাজ ফার্মার বিক্রেতা শ্যামল চন্দ্র শীল জানান, প্রায় এক মাস ধরে তারা কোনও কোম্পানির স্যালাইনই পাচ্ছেন না। তিনি বলেন, ‘কোম্পানি সাপ্লাই না দিলে আমরা কথা থেকে পাবো।’

উৎপাদন ব্যয় বাড়ায় কমছে সরবরাহ

স্যালাইনের সংকটের পেছনে উৎপাদন ব্যয় ও সরকার-নির্ধারিত মূল্যের ব্যবধানকে দায়ী করছেন উৎপাদনকারীরা। তাদের দাবি, ২০১৫ সালের পর থেকে তরল স্যালাইনের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য বাড়ানো হয়নি। অথচ আমদানি করা কাঁচামাল, প্যাকেজিং ও অন্যান্য উপকরণের ব্যয় বেড়েছে। সরকার-নির্ধারিত ৮৭ টাকার বিপরীতে বর্তমানে প্রতি ব্যাগ স্যালাইন উৎপাদনে খরচ হচ্ছে প্রায় ১২০ টাকা।

উৎপাদনকারীদের হিসাবে, ডেঙ্গুর প্রকোপে স্যালাইনের মাসিক চাহিদা ৪০ থেকে ৪৫ লাখ ব্যাগ থেকে বেড়ে ৮০ থেকে ৯০ লাখ ব্যাগে দাঁড়িয়েছে। তবে বর্তমান সরবরাহ দিয়ে চাহিদার এক-তৃতীয়াংশের মতো মেটানো যাচ্ছে বলে তাদের দাবি। হামের প্রাদুর্ভাবের কারণে শিশুদের চিকিৎসায় ব্যবহৃত তরলের চাহিদাও বেড়েছে।

লোকসানের কারণে কয়েকটি প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি উৎপাদন বন্ধ বা কমিয়ে দিয়েছে। একসময় দেশের বড় স্যালাইন প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান লিব্রা ইনফিউশনস তাদের কারখানা বন্ধ করেছে। স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস উৎপাদন স্থগিত রেখেছে এবং বেক্সিমকোও কিছু উৎপাদন বন্ধ করেছিল। অপসোনিন, ওএসএল ফার্মা, এসেনশিয়াল ড্রাগস ও পপুলার ফার্মা উৎপাদন কমিয়েছে বলে খাতসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। ইনসেপ্টা, হেলথকেয়ার, একমি ও এসিআইয়ের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোও এ বাজারে উৎপাদন বাড়াতে আগ্রহী নয় বলে তাদের দাবি।

এদিকে, স্যালাইনের মূল্য পুনর্নির্ধারণের প্রস্তাব প্রায় তিন মাস ধরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে আটকে রয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর (ডিজিডিএ) জানিয়েছে, পর্যালোচনার পর প্রস্তাবটি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। অধিদফতরের পরিচালক ও মুখপাত্র ড. মো. আক্তার হোসেন বলেন, মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কমিটি বিষয়টি পর্যালোচনা করছে। কমিটির বৈঠকের পর পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

উৎপাদনকারীদের মতে, উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দাম সমন্বয় না হলে সরবরাহ স্বাভাবিক করা কঠিন হবে। অন্যদিকে, সরেজমিনে ফার্মেসিগুলোতে স্যালাইনের ঘাটতির কারণে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে রোগীর স্বজনদের। কোথাও কিছু স্যালাইন পাওয়া গেলেও প্রয়োজনীয় সাইজ বা পছন্দের ব্র্যান্ড মিলছে না। আবার কোথাও গেলে পাওয়া যাচ্ছে না নিজের চাহিদা অনুযায়ী।