সিভিতে লিখছেন ‘দলগতভাবে কাজ করতে পারি’, সত্যিই কি পারেন?

চাকরির সিভিতে ‘দলগতভাবে কাজ করার সক্ষমতা’—বাক্যটি খুবই পরিচিত। প্রায় সব সিভিতেই কোনো না কোনোভাবে এই দক্ষতার উল্লেখ থাকে। কিন্তু একই দলে কাজ করা আর সত্যিকার অর্থে ভালো দলীয় সদস্য হওয়া এক বিষয় নয়।

গবেষণা বলছে, কার্যকর দল শুধু দক্ষ মানুষ দিয়ে তৈরি হয় না। সদস্যরা কীভাবে কথা বলেন, অন্যের কথা শোনেন, দায়িত্ব ভাগ করেন, মতবিরোধ সামলান এবং ভুলের পর কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানান—এসব বিষয়ও দলের সাফল্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

অর্থাৎ, আপনি যদি সিভিতে লেখেন ‘দলগতভাবে কাজ করতে পারি’, তার আসল পরীক্ষা হয় তখনই, যখন কোনো সহকর্মী আপনার পরিকল্পনার বিরোধিতা করেন, আপনার কাজের সমালোচনা করেন কিংবা এমন কোনো দায়িত্ব নিতে হয়, যা আপনার পছন্দ নয়।

শুধু কথা বলতে পারলেই ভালো দলের সদস্য হওয়া যায় না

দলে কাজ করার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা হলো মনোযোগ দিয়ে শোনা।

মিটিংয়ে কে সবচেয়ে বেশি কথা বললেন, সেটিই দলের কার্যকারিতার সবচেয়ে ভালো সূচক নয়। বরং দলের সদস্যরা একে অন্যকে কথা বলার সুযোগ দিচ্ছেন কি না, প্রশ্ন করছেন কিনা এবং অন্যের বক্তব্য বুঝে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন কি না—এসব বিষয় বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

একজন ভালো দলীয় সদস্য তাই শুধু নিজের মতামত তুলে ধরেন না; অন্যের মতামতের যুক্তি বোঝার চেষ্টাও করেন।

আপনি যদি প্রতিটি আলোচনায় নিজের কথাকেই শেষ কথা মনে করেন, তাহলে সিভিতে ‘দলগতভাবে কাজ করতে পারি’ লেখা থাকলেও বাস্তবে তার প্রমাণ পাওয়া কঠিন।

মতের অমিল মানেই খারাপ দল নয়

অনেকের ধারণা, ভালো দল মানে যেখানে সবাই একমত। বাস্তবে বিষয়টি এত সরল নয়।

দলের মধ্যে মতবিরোধ থাকতেই পারে। বরং ভিন্ন মত অনেক সময় সিদ্ধান্তকে আরও ভালো করতে পারে। সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন মতের অমিল ব্যক্তিগত আক্রমণ, দোষারোপ কিংবা সম্পর্কের সংঘাতে পরিণত হয়।

একজন কার্যকর সহকর্মী বলতে পারেন, ‘আমি আপনার সঙ্গে একমত নই’—কিন্তু একই সঙ্গে ব্যাখ্যা করতে পারেন, কেন একমত নন।

অর্থাৎ মানুষকে আক্রমণ না করে ধারণা বা সিদ্ধান্তকে প্রশ্ন করা—দলগত কাজের গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা।

নিজের কাজ শেষ করলেই দায়িত্ব শেষ নয়

দলের সদস্য হিসেবে নিজের দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করা অবশ্যই জরুরি। কিন্তু শুধু নিজের অংশ শেষ করলেই ভালো দলীয় কর্মী হওয়া যায় না।

একটি প্রকল্পে একজনের কাজ প্রায়ই অন্যজনের কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকে। ফলে নিজের কাজ কোথায় গিয়ে সহকর্মীর কাজকে প্রভাবিত করছে, সেটিও বোঝা প্রয়োজন।

ধরা যাক, আপনি সময়মতো নিজের দায়িত্ব শেষ করলেন। কিন্তু আপনার কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সহকর্মীকে জানালেন না। ফলে তার কাজ আটকে গেল।

আপনার কাজ হয়তো ‘সময়মতো শেষ’ হয়েছে, কিন্তু দল হিসেবে কাজটি সফল হয়নি।

সাহায্য করা আর সব দায়িত্ব নিজের কাঁধে নেওয়া এক নয়

ভালো দলীয় সদস্য প্রয়োজন হলে সহকর্মীকে সাহায্য করেন। তবে তার অর্থ এই নয় যে অন্যের সব কাজ নিজের কাঁধে তুলে নিতে হবে।

দলের মধ্যে দায়িত্ব পরিষ্কার থাকা গুরুত্বপূর্ণ। কে কী করবেন, কখন করবেন এবং কোথায় সহযোগিতা প্রয়োজন—এসব বিষয়ে স্পষ্ট যোগাযোগ কাজের চাপ ও ভুল বোঝাবুঝি কমাতে পারে।

একইভাবে, প্রয়োজনের সময় ‘আমি এটা এখন করতে পারছি না’ বলাও দলগত দক্ষতার অংশ।

কারণ সবকিছুতে ‘হ্যাঁ’ বলা শেষ পর্যন্ত নিজের কাজ এবং পুরো দলের কাজ—দুটোকেই ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

ভুল হলে কী করেন, সেটাও বড় পরীক্ষা

কর্মক্ষেত্রে ভুল হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু ভুলের পর আপনার আচরণ অনেক কিছু বলে দেয়।

ভালো দলীয় সদস্য সাধারণত ভুল লুকানোর বদলে দ্রুত তা জানান, সমস্যার প্রভাব বোঝার চেষ্টা করেন এবং সমাধানে এগিয়ে আসেন।

অপরদিকে, ভুলের দায় অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়া, তথ্য গোপন করা কিংবা সমস্যা ধরা পড়ার আগ পর্যন্ত চুপ থাকা দলের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

তাই ‘আমি দায়িত্বশীল’ বলার চেয়ে ভুল হলে কীভাবে দায়িত্ব নেন, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

সমালোচনা শুনতে পারেন?

এটিও একটি বড় পরীক্ষা।

সহকর্মী আপনার কাজের সমালোচনা করলে আপনি কি সঙ্গে সঙ্গে আত্মপক্ষ সমর্থন শুরু করেন? নাকি আগে বোঝার চেষ্টা করেন—সমালোচনার মধ্যে কার্যকর কোনো তথ্য আছে কি না?

সব সমালোচনা সঠিক হবে, এমন নয়। কিন্তু সমালোচনা শুনতে পারা এবং প্রয়োজন হলে নিজের অবস্থান পরিবর্তন করতে পারা পেশাগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা।

একজন ভালো দলীয় সদস্য নিজের মত বদলানোকে পরাজয় মনে করেন না। ভালো সিদ্ধান্তের জন্য প্রয়োজন হলে নিজের ধারণা সংশোধন করতে পারেন।

‘আমি’ নয়, কখন ‘আমরা’ বলতে হয়

দলগত কাজের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কৃতিত্ব ভাগ করে নেওয়া।

কোনও প্রকল্প সফল হলে শুধু নিজের অবদান সামনে না এনে সহকর্মীদের অবদান স্বীকার করা দলের মধ্যে আস্থা তৈরি করতে পারে। একইভাবে, সমস্যা হলে শুধু অন্যকে দায়ী না করে নিজের অংশের দায়িত্ব নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।

তবে দলের কৃতিত্ব ভাগ করা মানে নিজের অবদান লুকিয়ে ফেলা নয়। বরং নিজের কাজ স্পষ্টভাবে তুলে ধরার পাশাপাশি অন্যদের অবদানও স্বীকার করা।

সত্যিই দলগতভাবে কাজ করতে পারেন তো?

নিজেকে কয়েকটি প্রশ্ন করতে পারেন—

অন্যের মতামত শেষ পর্যন্ত শুনি, নাকি মাঝপথেই নিজের উত্তর তৈরি করি?

আমার মতের বিরোধিতা হলে সেটিকে ব্যক্তিগতভাবে নিই?

নিজের কাজ অন্যের ওপর কী প্রভাব ফেলছে, তা বিবেচনা করি?

প্রয়োজন হলে সহকর্মীকে সাহায্য করি?

আবার প্রয়োজন হলে নিজের সীমাও স্পষ্ট করতে পারি?

ভুল হলে দ্রুত স্বীকার করি?

সমালোচনা থেকে প্রয়োজনীয় শিক্ষা নিতে পারি?

ভালো ফল এলে অন্যদের অবদান স্বীকার করি?

মতবিরোধ হলে মানুষকে নয়, সমস্যাকে কেন্দ্র করে আলোচনা করতে পারি?

এসব প্রশ্নের বেশির ভাগের উত্তর যদি ‘হ্যাঁ’ হয়, তাহলে সিভিতে লেখা কথাটির পেছনে বাস্তব দক্ষতাও থাকার সম্ভাবনা বেশি।

শেষ কথা

‘দলগতভাবে কাজ করতে পারি’—সিভির সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত দক্ষতাগুলোর একটি। কিন্তু এর অর্থ শুধু সহকর্মীদের সঙ্গে একই জায়গায় বসে কাজ করা নয়।

সত্যিকারের দলগত দক্ষতার মধ্যে আছে মনোযোগ দিয়ে শোনা, পরিষ্কারভাবে যোগাযোগ করা, মতবিরোধ সামলানো, দায়িত্ব নেওয়া, প্রয়োজনমতো সহযোগিতা করা, সমালোচনা গ্রহণ করা এবং নিজের পাশাপাশি দলের ফলাফলকে গুরুত্ব দেওয়া।

তাই পরেরবার সিভিতে ‘দলগতভাবে কাজ করতে পারি’ লেখার আগে নিজেকেই প্রশ্ন করুন— আমি কি সত্যিই দলগতভাবে কাজ করতে পারি, নাকি শুধু সিভিতে এই কথাটা লিখতে শিখেছি?