বর্তমান চাকরির বাজারে শুধু একটি নির্দিষ্ট দক্ষতায় ভালো হওয়াই অনেক ক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়। নিজের মূল দক্ষতার সঙ্গে সম্পর্কিত আরও কয়েকটি দক্ষতা আয়ত্ত করতে পারলে একজন কর্মী একই সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের কাজ সামলানোর সক্ষমতা অর্জন করতে পারেন। ক্যারিয়ারে এই বহুমুখী দক্ষতার সমন্বয়কে বলা হয় স্কিল স্ট্যাকিং
সহজভাবে বললে, স্কিল স্ট্যাকিং হলো একটি মূল দক্ষতাকে কেন্দ্র করে এমন কিছু অতিরিক্ত দক্ষতা তৈরি করা, যেগুলো পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং বাস্তব কাজে একে অন্যকে আরও কার্যকর করে তোলে।
যেমন, একজন কনটেন্ট লেখক শুধু লেখালেখিতে দক্ষ হওয়ার পাশাপাশি ক্যানভায় ভিজ্যুয়াল ডিজাইন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবস্থাপনা এবং মৌলিক এসইও শিখলে তার কাজের পরিধি বেড়ে যায়। তখন তিনি শুধু লেখা তৈরি নয়, সেই কনটেন্টের উপস্থাপন ও প্রচারের কাজেও ভূমিকা রাখতে পারেন।
একসঙ্গে অনেক কিছু নয়, প্রয়োজন সঠিক সমন্বয়
স্কিল স্ট্যাকিংয়ের অর্থ একসঙ্গে অনেক বিষয়ে দক্ষ হয়ে ওঠা নয়। বরং নিজের মূল দক্ষতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত এবং বাস্তব কাজে ব্যবহার করা যায়, এমন কয়েকটি দক্ষতা বেছে নেওয়াই এর মূল উদ্দেশ্য।
ধরা যাক, একজন সাংবাদিকের মূল দক্ষতা সংবাদ লেখা ও তথ্য সংগ্রহ। এর সঙ্গে ছবি ও ভিডিও সম্পাদনা, ক্যানভায় সংবাদ কার্ড তৈরি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবস্থাপনা এবং এক্সেলে তথ্য বিশ্লেষণের দক্ষতা যুক্ত হলে তার কাজের পরিধি অনেকটাই বাড়তে পারে। তিনি তখন শুধু প্রতিবেদক হিসেবে নয়, ডিজিটাল কনটেন্ট ও মাল্টিমিডিয়া কাজেও নিজেকে যুক্ত করার সুযোগ পাবেন।
একইভাবে একজন মার্কেটিং পেশাজীবী ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের পাশাপাশি তথ্য বিশ্লেষণ, কনটেন্ট তৈরি এবং গ্রাহকের আচরণ বিশ্লেষণের দক্ষতা অর্জন করলে তার কাজের ক্ষেত্রও বিস্তৃত হতে পারে।
চাকরির বাজারে কেন গুরুত্বপূর্ণ?
বর্তমানে অনেক প্রতিষ্ঠান এমন কর্মীকে গুরুত্ব দেয়, যিনি নিজের মূল দায়িত্বের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট আরও কিছু কাজ সামলাতে পারেন। এতে প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন কাজের মধ্যে সমন্বয় সহজ হয় এবং একই কর্মীর মাধ্যমে একাধিক ধরনের কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হয়।
তবে এর অর্থ এই নয় যে একজন কর্মীকে সব বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হতে হবে। বরং একটি শক্তিশালী মূল দক্ষতার সঙ্গে এমন কয়েকটি পরিপূরক দক্ষতা যুক্ত করা দরকার, যেগুলো বাস্তব কাজে ব্যবহার করা যায়।
এ ধরনের দক্ষতার সমন্বয় একজন কর্মীকে নতুন দায়িত্ব নেওয়ার জন্য প্রস্তুত করতে পারে। একই প্রতিষ্ঠানে ভিন্ন ধরনের কাজের সুযোগ তৈরি হওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে ভিন্ন পদে আবেদন বা ফ্রিল্যান্স কাজের ক্ষেত্রেও এটি কাজে আসতে পারে।
কীভাবে শুরু করবেন?
স্কিল স্ট্যাকিং শুরু করার প্রথম ধাপ হলো নিজের মূল দক্ষতা চিহ্নিত করা। আপনি যদি লেখালেখিতে ভালো হন, তাহলে এর সঙ্গে গ্রাফিকস ডিজাইন, ভিডিও সম্পাদনা, এসইও বা তথ্য বিশ্লেষণের মতো দক্ষতা যুক্ত করতে পারেন।
আবার গ্রাফিক ডিজাইনে দক্ষ কেউ ভিডিও সম্পাদনা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবস্থাপনা কিংবা ব্র্যান্ডিং সম্পর্কে শিখতে পারেন।
তবে একসঙ্গে অনেক দক্ষতা শেখার চেষ্টা না করে ধাপে ধাপে এগোনো ভালো। প্রথমে একটি প্রাসঙ্গিক দক্ষতা বেছে নিয়ে অনলাইন কোর্স, হাতে-কলমে অনুশীলন এবং ছোট প্রকল্পের মাধ্যমে সেটি আয়ত্ত করা যেতে পারে। একটি দক্ষতায় ভালো ভিত্তি তৈরি হওয়ার পর পরবর্তী দক্ষতা শেখা শুরু করা যায়।
শুধু সনদ নয়, দক্ষতার প্রমাণও জরুরি
নতুন কোনো দক্ষতা শেখার পর শুধু কোর্সের সনদ সংগ্রহ করলেই হবে না। সেই দক্ষতা বাস্তবে কীভাবে কাজে লাগানো যায়, সেটি দেখানোও গুরুত্বপূর্ণ।
ধরা যাক, আপনি লেখালেখির পাশাপাশি ক্যানভা শিখেছেন। সে ক্ষেত্রে শুধু ‘ক্যানভা জানি’ উল্লেখ করার পরিবর্তে নিজের তৈরি সংবাদ কার্ড, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট বা প্রচারণার নকশা পোর্টফোলিওতে রাখতে পারেন।
একইভাবে এক্সেল বা এসপিএসএস শেখার পর কোনো ছোট জরিপের তথ্য বিশ্লেষণ করে সেটি পোর্টফোলিওতে যুক্ত করা যেতে পারে। এতে নিয়োগদাতা শুধু আপনার দাবির ওপর নির্ভর করবেন না, বরং আপনি বাস্তবে কী করতে পারেন, সেটিও দেখতে পারবেন।
দক্ষতার সমন্বয় কীভাবে করবেন?
নিজের মূল দক্ষতার সঙ্গে কোন অতিরিক্ত দক্ষতা যুক্ত করবেন, তা নির্ভর করবে পেশা ও ক্যারিয়ার লক্ষ্যের ওপর। যেমন, একজন লেখালেখিতে দক্ষ ব্যক্তি ক্যানভায় নকশা তৈরি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবস্থাপনা শিখলে কনটেন্ট ও ডিজিটাল মিডিয়ায় কাজের সুযোগ বাড়াতে পারেন। সাংবাদিকতার সঙ্গে তথ্য বিশ্লেষণ ও এসপিএসএসের মতো দক্ষতা যুক্ত করলে ডেটা সাংবাদিকতা ও গবেষণার ক্ষেত্রে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
একইভাবে, মার্কেটিংয়ের সঙ্গে এক্সেল ও তথ্য বিশ্লেষণের দক্ষতা যুক্ত হলে ডেটাভিত্তিক মার্কেটিংয়ে কাজ করা সহজ হতে পারে। যারা ভিডিও সম্পাদনা জানেন, তারা ক্যামেরা পরিচালনা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবস্থাপনার দক্ষতা যোগ করে নিজেদের মাল্টিমিডিয়া কনটেন্ট তৈরির সক্ষমতা বাড়াতে পারেন। আবার গ্রাফিক ডিজাইনের সঙ্গে ভিডিও সম্পাদনা ও ব্র্যান্ডিংয়ের জ্ঞান যুক্ত করলে ক্রিয়েটিভ কনটেন্ট তৈরির ক্ষেত্রে আরও বিস্তৃতভাবে কাজ করার সুযোগ তৈরি হয়।
অর্থাৎ, নতুন দক্ষতা বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে মূল বিষয় হওয়া উচিত, কোন দক্ষতাটি আপনার বর্তমান কাজকে আরও কার্যকর করবে এবং ভবিষ্যতে নতুন ধরনের কাজের সুযোগ তৈরি করবে।
ক্যারিয়ারে কতটা কাজে আসে?
স্কিল স্ট্যাকিংয়ের বড় সুবিধা হলো একজন পেশাজীবীর কাজের সক্ষমতার পরিধি বাড়ানো। নতুন দায়িত্ব নেওয়া, একই প্রতিষ্ঠানে ভিন্ন ধরনের কাজের সুযোগ পাওয়া কিংবা ভবিষ্যতে ভিন্ন পদে আবেদন করার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত দক্ষতা কাজে লাগতে পারে।
বিশেষ করে ক্যারিয়ারের শুরুতে থাকা শিক্ষার্থী ও তরুণদের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শুরু থেকেই নিজের মূল দক্ষতার সঙ্গে প্রাসঙ্গিক কিছু দক্ষতা যোগ করতে পারলে ভবিষ্যতের কাজের ধরন অনুযায়ী নিজেকে প্রস্তুত করা সহজ হয়।