ভ্রমণের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বজুড়ে দ্রুত বাড়ছে পর্যটন ও হসপিটালিটি খাত। তবে পর্যটকের সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি পরিবেশের ওপর পর্যটনের প্রভাব নিয়েও তৈরি হচ্ছে উদ্বেগ। অতিরিক্ত বর্জ্য, পানি ও বিদ্যুতের ব্যবহার, কার্বন নিঃসরণ এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর চাপ এসব বিষয় এখন পর্যটন ব্যবসার গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার অংশ।
ফলে আধুনিক পর্যটন খাতে শুধু ভালো সেবা দেওয়াই যথেষ্ট নয়; পরিবেশের ক্ষতি কমিয়ে কীভাবে ব্যবসা পরিচালনা করা যায়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে তৈরি হচ্ছে গ্রিন হসপিটালিটি বা সাসটেইনেবল ও ইকো-ট্যুরিজম ব্যবস্থাপনা ঘিরে নতুন ক্যারিয়ারের সুযোগ।
কী এই গ্রিন হসপিটালিটি?
সহজভাবে বললে, পরিবেশের ক্ষতি কমিয়ে হোটেল, রিসোর্ট ও পর্যটন ব্যবসা পরিচালনার পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনাই গ্রিন হসপিটালিটির মূল ধারণা।
একটি বড় রিসোর্টে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ পানি ও বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হয় এবং তৈরি হয় নানা ধরনের বর্জ্য। একজন সাসটেইনেবিলিটি বিশেষজ্ঞের কাজ হতে পারে এসব ব্যবহার কমানোর পরিকল্পনা তৈরি করা। সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, বর্জ্য আলাদা করে পুনর্ব্যবহার, একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক কমানো কিংবা বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী ব্যবস্থা চালুর মতো উদ্যোগ এর অংশ হতে পারে।
তবে গ্রিন হসপিটালিটির লক্ষ্য শুধু পরিবেশ রক্ষা নয়। স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করে পর্যটন ব্যবসাকে টেকসই ও লাভজনক করাও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
কেন বাড়ছে গুরুত্ব?
পর্যটন শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করতে গেলে এখন পরিবেশ ও টেকসই ব্যবস্থাপনার বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। পর্যটন প্রতিষ্ঠানগুলোও তাদের পরিবেশগত প্রভাব কমানোর দিকে নজর দিচ্ছে। একই সঙ্গে অনেক পর্যটক ভ্রমণের সময় পরিবেশবান্ধব সেবা ও দায়িত্বশীল পর্যটন ব্যবস্থাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন।
এ কারণে হোটেল ও রিসোর্টের জন্য পরিবেশবান্ধব নীতি তৈরি, সম্পদের সঠিক ব্যবহার এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করার দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
একজন দক্ষ সাসটেইনেবিলিটি পেশাজীবী একটি প্রতিষ্ঠানের খরচ কমানোর পাশাপাশি তার পরিবেশবান্ধব ভাবমূর্তি তৈরিতেও ভূমিকা রাখতে পারেন। ফলে এটি শুধু পরিবেশ রক্ষার বিষয় নয়, ব্যবসায়িক পরিকল্পনারও অংশ হয়ে উঠছে।
কোথায় কাজের সুযোগ?
ট্যুরিজম ও হসপিটালিটি বিষয়ে পড়াশোনা করে এই খাতে বিভিন্ন ধরনের ক্যারিয়ার তৈরি করা সম্ভব। যেমন, সাসটেইনেবিলিটি ম্যানেজার: হোটেল বা রিসোর্টের পরিবেশবান্ধব নীতি তৈরি ও বাস্তবায়নে কাজ করেন।
ইকো-রিসোর্ট ম্যানেজার: প্রাকৃতিক ও পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল এলাকায় পরিচালিত রিসোর্টের ব্যবস্থাপনায় যুক্ত থাকেন।
সাসটেইনেবল ট্যুরিজম প্ল্যানার: পরিবেশ ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে পর্যটন পরিকল্পনা তৈরি করেন।
কমিউনিটি-বেইজড ট্যুরিজম বিশেষজ্ঞ: স্থানীয় মানুষকে পর্যটন কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত করে তাদের অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরিতে কাজ করেন।
এ ছাড়া সরকারি প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি পর্যটন সংস্থা, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ও পরিবেশ নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের দক্ষতার প্রয়োজন হতে পারে।
কী কী দক্ষতা প্রয়োজন?
এই পেশায় শুধু হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট জানলেই হবে না। পরিবেশ ও টেকসই উন্নয়ন সম্পর্কে ধারণা থাকাও জরুরি। প্রয়োজন হতে পারে, পরিবেশ ও টেকসই উন্নয়ন সম্পর্কে জ্ঞান; বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সম্পদ ব্যবহারের ধারণা; কার্বন নিঃসরণ কমানোর পদ্ধতি সম্পর্কে ধারণা; ব্যবসায়িক পরিকল্পনা ও আর্থিক বিশ্লেষণের দক্ষতা; স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগের সক্ষমতা; প্রকল্প ব্যবস্থাপনা ও নেতৃত্বের দক্ষতা ও পর্যটন শিল্পের বাজার ও প্রবণতা বোঝার ক্ষমতা।
কীভাবে শুরু করবেন?
ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্টের পাশাপাশি পরিবেশ, টেকসই উন্নয়ন ও ব্যবসায়িক ব্যবস্থাপনা বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করা যেতে পারে। বিভিন্ন পরিবেশবান্ধব হোটেল ও রিসোর্টের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ, সংশ্লিষ্ট প্রশিক্ষণ নেওয়া এবং বাস্তব প্রকল্পে কাজের অভিজ্ঞতা অর্জনও কাজে আসবে।
যারা ভ্রমণ ও প্রকৃতির প্রতি আগ্রহী, পাশাপাশি ব্যবসা ও ব্যবস্থাপনায় ক্যারিয়ার গড়তে চান, তাদের জন্য গ্রিন হসপিটালিটি হতে পারে সম্ভাবনাময় একটি ক্ষেত্র।