পার্কে ও অরণ্যে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখতে গিয়ে কিংবা সাগরে-সৈকতে সমুদ্রবিলাসের সময় পর্যটকদের অনেকে খেয়ালখুশিমাফিক ময়লা-আবর্জনা ফেলে দেন। এভাবে ধীরে ধীরে তৈরি হয়ে যায় আবর্জনার স্তূপ। এ কারণে প্রকৃতির সৌন্দর্য হয়ে যায় ম্লান।
কক্সবাজারের কথাই ধরা যাক। বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘ এই সমুদ্র সৈকত এক অপার সৌন্দর্য। সাগরপাড় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখলে বিদেশি পর্যটকদেরও আকর্ষণ করে। কিন্তু সেখানকার পরিবেশ নিয়ে হতাশা ঝরে অনেকের মুখে।
পর্যটক মাসুদ সরকার রানা কিছুদিন আগে ঘুরতে গিয়েছিলেন বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত কক্সবাজারে। কিন্তু ঘুরে বেড়ানোর পর সৈকত থেকে হোটেলে ফেরার পথে তার চোখে পড়েছে, পথে পথে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য আবর্জনা। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বললেন, ‘যত্রতত্র পড়ে আছে পানির বোতল, চিপসের প্যাকেট, ডাবের খোসা, কোল্ড ড্রিংকসের বোতল। অথচ সৈকতে অনেক ডাস্টবিন দেওয়া আছে। সামান্য একটু কষ্ট করলেই ডাস্টবিনে ময়লা ফেলতে পারি আমরা।’
হতাশা নিয়ে এই ভ্রমণপ্রেমী আরও বলেন, ‘দূর-দূরান্ত থেকে একটু আরামের জন্য কক্সবাজার যান আমার মতো অসংখ্য মানুষ। কিন্তু সেখানে গিয়ে যদি দেখি বিচ ভর্তি ময়লা-আবর্জনা, তাহলে তো কোনও লাভই হলো না। বড় আকারের ঢেউ দেখে পাওয়া আনন্দ যেন নিমিষেই হয়ে যায় বিস্বাদ। সবার কাছে অনুরোধ— কক্সবাজার সৈকতে যত্রতত্র নির্দিষ্ট স্থানে (বিন) ময়লা ফেলুন।’
প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন ও ছেঁড়া দ্বীপের অবস্থা হয়ে যায় আরও বেহাল। সেখানে গেলেই দেখা যায়, এদিক-ওদিক পড়ে আছে নারিকেলের খোসা। যত্রতত্র চিপস ও বিস্কুটের প্যাকেট আর প্লাস্টিকের খালি বোতলও চোখ এড়ায় না।
পর্যটক নিয়াজ মোরশেদ বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, প্রতি বছরই তারা কয়েকজন মিলে পর্যটন স্পটগুলোতে ময়লা পরিষ্কার করেন। ছেঁড়া দ্বীপে ভাটার সময় কয়েক গ্রুপে ভাগ হয়ে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালান তারা। তার কথায়, ‘পরবর্তী প্রজন্মও যেন আমাদের দেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারে, সেজন্য সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।’
প্রকৃতিপ্রেমীরা মনে করেন, পর্যটন স্পটগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা রাখার ক্ষেত্রে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশাপাশি ব্যক্তি সচেতনতাও জরুরি।
এর মধ্যে কয়েকটি এমন- ‘ভ্রমণে গিয়ে সেই স্থানে শুধু পায়ের ছাপ রেখে আসুন, উচ্ছিষ্ট নয়’, ‘দেশটা আমাদের, আমরাই যদি নষ্ট করি তাহলে রক্ষা করবে কে’, ‘অপচনশীল কোনও কিছু ফেলে প্রকৃতির কাছে নিজেকে অপরাধী করবেন না’, ‘পুরাকীর্তি আমাদের সম্পদ, পুরাকীর্তির গায়ে আঘাত করবেন না’।
ভ্রমণপিপাসুদের আহ্বান, ‘ঘুরতে গিয়ে যেখানে সেখানে পানির বোতল, প্লাস্টিক ও পলিথিন ফেলে পরিবেশ নষ্ট করবেন না। পাহাড়ে ঘুরতে গিয়ে কোথাও অপচনশীল কিছু রেখে আসবেন না। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত জায়গাগুলো আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদ। এগুলোতে ময়লা-আবর্জনা ফেলে নষ্ট করবেন না। পরিবেশের যাতে কোনও ক্ষতি না হয় সেদিকে খেয়াল রাখবেন। পরিবেশ পরিষ্কার রাখার দায়িত্ব আমাদের সকলের।’
পৃথিবী জুড়ে পর্যটন শিল্পই এখন বৃহত্তম শিল্প হিসেবে স্বীকৃত। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি বাংলাদেশে স্বাভাবিকভাবে পর্যটন শিল্প উন্নয়নের সম্ভাবনা অপরিসীম। কিন্তু ‘বিউটিফুল বাংলাদেশ’-এর পথে অন্যতম অন্তরায় ময়লা-আবর্জনা।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাওয়া হয় বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী একেএম শাহজাহান কামালের কাছে। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার জন্য উদ্যোগ নেওয়া হয়। পর্যটন স্পটগুলো যেন সুন্দর থাকে সেজন্য আমরা সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসনকে সক্রিয় থাকতে বলি। তবে আমাদের নিজেদেরকেও সচেতন হতে হবে। দেশটা আমাদের ঘরের মতো। নিজের ঘরটাকে পরিচ্ছন্ন রাখার দায়িত্ব আমাদেরই। আমরা যেখানেই যাই না কেন, দেশটাকে সুন্দর রাখার দায়িত্ব আমাদের সবার। আমরা একটু সচেতন হলেই ভ্রমণ হবে সুন্দর ও আনন্দময়।’