ট্রাভেলগ

টাঙ্গুয়ার হাওরের বিশালতায়

হাজারও পরিযায়ী পাখিস্বপ্নটা সত্যি হতে যাচ্ছে তাহলে। স্বপ্ন নয় তো কী! পাহাড়-অরণ্যের পাট চুকিয়ে পর্বতেও আনাগোনা শুরু করেছি। অথচ এতদিনে হাওরটাই দেখা হলো না। শেষ পর্যন্ত অনেক কথা চালাচালির পর টাঙ্গুয়ার হাওরের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত স্থির হয়েছে। এবার বাসে নয়। এক কাছের বড় ভাইয়ের মাইক্রোবাসে হইচই করে রওনা দিলাম।

নরসিংদীতে মাঝরাতে খোলা পাওয়া গেলো নাশতার দোকান। গরম-গরম পরাটা, ডিম ভাজি আর সবজি-ডাল ইচ্ছেমতো খেয়ে নিলাম সবাই। তারপর আবার চলা। আধো ঘুমের পর একসময় ভোরের আলো এলো জানালা গলে। সুনামগঞ্জে এর আগে কখনও আসা হয়নি।

হাইওয়ের দু’পাশে প্রকৃতির বিশালতাকে জানান দিচ্ছে ধুধু প্রান্তর। এ জেলায় হাওর-বাওর আর তার মাঝে বয়ে চলা নদী-খাল যেন জালের মতো বিছানো। এখনও জীবন জাগেনি ঠিকভাবে। আমরা তখনই ঢুকে পড়লাম সুনামগঞ্জ শহরে। হাছন রাজার শহর, জল জোৎস্না আর ভালোবাসার শহর এটি। শুনেছিলাম, জোৎস্না উপভোগ করতে নাকি পুরো শহরের বাতি একবার নিভিয়ে দেওয়া হয়েছিল। হাওরের বুকে ভেসে বাউল গানের সুর রোমাঞ্চ জাগায়। অবশ্য এবার আমরা সেই রোমাঞ্চের স্বাদ পাবো না। কিন্তু সামনে যা অপেক্ষা করছে তা ভেবেই ভেতরে ভেতরে দারুণ উত্তেজিত আমি।

তাহিরপুর থেকে যাত্রা শুরুনাফিজা আপার অফিসের জেলা প্রতিনিধি জাকির ভাইয়ের বাসায় উঠলাম আমরা। তিনিই এবারের ট্রিপে আমাদের পথপ্রদর্শক। হাত-মুখ ধুয়ে চা-বিস্কুট সেরে নেওয়া হলো। তারপর দলবলে আমাদের যাত্রা তাহিরপুরের দিকে। সুনামগঞ্জ শহর থেকে তাহিরপুরের দূরত্ব অনেক। বর্ষার দিনে অবশ্য শহরের ঘাট থেকেই নৌকায় যাওয়া যায়। শুকনো মৌসুমে ভরসা মোটরসাইকেলসহ অন্যান্য যান মিলবে।

শহরের সীমানা ছাড়াতেই আবারও সেই দিগন্তজোড়া অবারিত প্রকৃতির হাতছানি। রাস্তার অবস্থা বিশেষ সুবিধার নয়। কিছুদূর ভালো তো আবার ভাঙা। অবশ্য চারপাশের আবহ এই ক্ষণিকের অসুবিধার কথা ভুলিয়ে দেবে। এই পথে বিভিন্ন পাখ-পাখালির দেখা পাওয়া খুব স্বাভাবিক।

অবারিত মুগ্ধতাটাঙ্গুয়ার হাওড়কে জীববৈচিত্র্যে রামসার সাইড ঘোষণা করেছে ইউনেস্কো। রাস্তার পাশেই চোখ পড়লো বিরাটাকার মৎসভূক ঈগলের। এর মধ্যে জাকির ভাই বড় বড় বেশ কয়েকটি টিফিন ক্যারিয়ার তুলে নিলেন গাড়িতে। আমাদের উৎসুক চাহনির সামনে নীরব রইলেন তিনি। আমরা অবশেষে পৌঁছালাম তাহিরপুর উপজেলা সদরে। সেখান থেকে ঘাট কয়েক মিনিটের পথ। জানা গেলো, আমাদের জন্য নৌকা আগে থেকেই ঠিক করে রাখা আছে। বাজার থেকে প্রয়োজনীয় কেনাকাটা সেরে নেওয়া হলো। মুড়ি, চানাচুরসহ হালকা খাবার-দাবার আর কি!

সরু খালের মতো জায়গায় মূল ঘাটটি অবস্থিত। নৌকা এখান থেকেই ছাড়ে। কিছুদূর যেতেই হাওড়ের বিস্তৃতি শুরু হলো। মূল হাওরটি এখান থেকে বেশ খানিকটা দূরে। হাওর মূলত অনেক বিল ও মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীর সমষ্টি। তার মাঝে উচুঁ পাড়ের বাড়িগুলো জেগে আছে। দূরে হয়তো হিজল করচের বন। মাথার ওপরে সুনীল আকাশ। আর দিগন্তে মেঘালয়ের পাহাড় সারি। এ নিয়েই টাঙ্গুয়ার হাওর। আমরা ধীরে ধীরে এর বিশালতা উপলব্ধি করতে লাগলাম। এ পথে এটাই আমার প্রথম যাত্রা। ফলে দু’চোখ ভরে দেখলেই শুধু চলছে না, হৃদয়ের গভীর তন্ত্রীতে বাঁধনহারা বীণার সুরও বেঁধে নিতে হচ্ছে।

নৌকা নির্ভর হাওরের জীবনহাওরের বুক চিরে ফিতের মতো নদী ধরে আমাদের ইঞ্জিন বোট চলেছে ওয়াচ টাওয়ারের দিকে। ইতিউতি তাকাচ্ছি এই অঞ্চলের মূল বাসিন্দাদের খোঁজে। পানকৌড়ির অভাব নেই। কিন্তু আমার চোখ খুঁজে বেড়াচ্ছে পালাসী কুড়া ঈগলের মতো দুর্লভ পক্ষীকূলকে। জাকির ভাই জানালেন, ওয়াচ টাওয়ারের দিকে নাকি হাজার হাজার পাখির দেখা পাওয়া যাবে।

বেলা বাড়ার সঙ্গে রোদের তাপও চড়চড়িয়ে বাড়ছে। বোটের ছাদে বসে থাকাটা দায় হয়ে পড়লো। তারপরও চারপাশের ভুবনভোলানো সৌন্দর্য আমাকে আটকে রাখলো তাতানো টিনের ছাদেই। টাঙ্গুয়ার হাওর যেন তার সব রূপ-গন্ধ নিয়ে হাজির হয়েছে আমাদের সামনে। কোথাও কোথাও পানি এতই স্বচ্ছ যে, নিচের তলভাগ পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। এর মধ্যে মুড়ি-চানাচুর মাখানো হলো। সকালে বিশেষ কিছু খাওয়া হয়নি। তাই গোগ্রাসে গিলতে লাগলাম!

ওপারে মেঘালয়ওয়াচ টাওয়ার এলাকাটি হিজল করচের গাছঘেরা ছায়া সুনিবিড়। নৌকা থেকে নেমে পায়ে হেঁটে আমরা চললাম পরিযায়ী পাখি দর্শনে। দূরের বিলে অলস সময় কাটাচ্ছে হাজারও পাখির ঝাঁক। কাছে যাওয়ার জো নেই। একটু কাছে যাওয়ার চেষ্টা করতেই একঝাঁক উড়ে গেলো। মনে হচ্ছে সমগ্র আকাশটাই যেন তাদের দখলে। আমরা মুগ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম খানিকক্ষণ। প্রকৃতির কাছে গেলে কেন যে সবাইকে ছবি তোলার রোগে পেয়ে বসে! এখানেও সেই একই দৃশ্য। শেষ পর্যন্ত সবাইকে তাড়া দিয়ে নৌকার কাছে নিয়ে আসতে হলো।

দুর্গম হাওরে মুখে লেগে থাকা ভোজসূর্য মাথার অনেকখানি ওপরে উঠেও গেছে। ফেরার পথ ধরতে হবে। ক্ষিদেটাও আবার বেশ ধরে বসেছে। এতক্ষণে জানা গেলো, জাকির ভাইয়ের টিফিন ক্যারিয়ারের রহস্য। আমাদের দুপুরে ভুরিভোজের ব্যবস্থা করেছেন তিনি। সেই টিফিন ক্যারিয়ারের খাবারগুলো যেন অমৃত! সুগন্ধি চালের ভাতের সঙ্গে হাওরের টাটকা বোয়াল মাছ, ডিম ভুনা, হাঁসের মাংস আর ডাল। ক্ষিদের মুখে এই জনহীন প্রান্তরে বসে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ভোজটি যেন সারলাম। সেই বোয়াল মাছের স্বাদ এখনও মুখে লেগে আছে। কয়েক টুকরো খেয়েও স্বাদ মেটেনি।

বিকালের দিকে আমরা ফিরে এলাম তাহিরপুর ঘাটে। আয়োজন তখনও ফুরোয়নি। রাতে সুনামগঞ্জ শহরে এসে তা বুঝলাম। সেখানকার ঐতিহ্যবাহী নাচ-গান উপভোগের মাধ্যমে সুনামগঞ্জ ভ্রমণের ষোলকলা পূর্ণ হলো।

ছবি: লেখক