ট্রাভেলগ

২৫০০ টাকায় রাতারগুল ও বিছনাকান্দিতে বেড়ানো

ওয়াচ টাওয়ার থেকে দূরে দেখা যায় পাহাড়ের সারিকমবেশি সবারই ঘুরতে মন চায়। টাকা আর সময়ের অভাবে ইচ্ছে থাকলেও অনেকের পক্ষে শেষ পর্যন্ত বেড়াতে যাওয়া হয় না। ব্যস্ত জীবনে একদিনের বেশি সময় বের করা আবার অনেকের জন্য কঠিন। সেই একটি দিনের সর্বোচ্চ ব্যবহার করে কম বাজেটে ঘুরে আসার সুযোগ মিলে গেলে তো কথাই নেই। কম সময়ে অল্প খরচে কীভাবে সিলেটের দুই নয়নাভিরাম স্থান রাতারগুল ও বিছনাকান্দি ঘুরে এলাম সেই গল্প বলি। সঙ্গে জানাচ্ছি ভ্রমণের অভিজ্ঞতা।

আগে থেকে পরিকল্পনা করে নিলে খরচটা কমিয়ে আনা যায়। আমরা তিন বন্ধু গত জুলাইয়ে সিলেটে ঘুরতে গিয়েছিলাম। একদিনের ভ্রমণে দেখেছি রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট, পাংতুমাই ঝরনা, সারি সারি চা বাগান, বিছনাকান্দি ও শাহজালালের (র.) মাজার। ঢাকায় ফিরে আসার আগে সিলেটের সুপরিচিত পানসি রেস্তোরাঁয় খেয়েছি রাতের খাবার।
রাতে যেকোনও বাসেই যাওয়া যায় সিলেটে। জনপ্রতি ভাড়া ৪৫০-৫০০ টাকা। ঢাকার মহাখালী থেকে আমাদের বাস ছেড়েছে। ভোর ৫টার মধ্যেই সিলেটে পৌঁছেছি। ঘুরতে যাওয়ার আগে সম্ভব হলে বাসের রিটার্ন টিকিট কিনে রাখা যেতে পারে। তাহলে আর ফেরা নিয়ে আলাদাভাবে চিন্তা থাকবে না। চাইলে একদিনের জন্য হোটেলে রুম নিতে পারেন। তবে রাতে না থেকে ফিরে এলে বেশি টাকা খরচ না করাই ভালো।

রাতারগুল মিঠাপানির বনাঞ্চল, এ জায়গা অসাধারণ আলোছায়ার খেলাসিলেট শহরে অসংখ্য হোটেল। বিশ্রাম ও সারাদিনের ভ্রমণ শেষে গোসলের জন্য আমরা হোটেল রুম বুক করেছিলাম। সেখানে হোটেল ভাড়া বিভিন্ন রকমের। আমরা ৫০০ টাকায় একটি রুম ভাড়া নিয়েছিলাম। সকালে নাস্তা সেরেই সারাদিনের জন্য ১৫০০ টাকায় সিএনজি ঠিক করে ফেললাম। ফলে আর ঘুরতে গাড়ি পাওয়া নিয়ে কোনও চিন্তা রইলো না।

প্রথমে গেলাম রাতারগুলের পথে। সিএনজি থেকে দেখা যায়, দু’পাশে সারি সারি চা বাগান। এই সৌন্দর্য অনন্য। মাঝে মধ্যে সিএনজি থামিয়ে চা বাগানে কিছু সময় কাটিয়ে আবার চলা শুরু করি। এভাবে রাতারগুল ঘাটে পৌঁছাতে ৪০ মিনিটের মতো লাগলো। ঘাটে ডিঙি নৌকা ভাড়া করে উঠে পড়লাম। সরকার নির্ধারিত নৌকা ভাড়া ৭৫০ টাকা হলেও একটু বেশি নেয় মাঝিরা। আমরা নৌকা ভাড়া করেছিলাম ১০০০ টাকায়। মাঝির গলায় গান আর পানির কলকল শব্দ দারুণ অনুভূতি এনে দেয় মনে। বর্ষা মৌসুমে আসায় পানির পরিমাণ একটু বেশি ছিল। এতে সৌন্দর্য বরং বেড়েছে।

40424399_487297648415917_1674072058914406400_nপ্রকৃতি যেন তার সবটুকু দিয়ে রাতারগুলকে সাজিয়েছে। সবুজ পানির ওপর নীল আকাশ, তার ওপরে দাঁড়িয়ে আছে করচ গাছ। এ এক অপূর্ব দৃশ্য। ছবি দেখে সেই সৌন্দর্যের সিঁকিও বোঝা যায় না। বনের মাঝে একটা নৌকায় ভাসমান দোকান আছে। সেখানে চায়ে চুমুক দিয়ে চলে গেলাম ওয়াচ টাওয়ারে। সেখান থেকে মেঘালয়ের পাহাড়গুলো আরও চমৎকার দেখায়।

পাংতুমাই। ওই যে কালো গরু বাধা তার ওপারে ভারতীয় সীমান্তরাতারগুল থেকে সিএনজি চলবে বিছনাকান্দি যাওয়ার নৌকার ঘাট পর্যন্ত। তার আগে আমরা রাতারগুলে দুপুরের খাবার সেরে নিলাম। বিছনাকান্দিতে গিয়ে নৌকা ভাড়া করতে হলো। দলে সদস্য সংখ্যা কম থাকলে পুরো নৌকা ভাড়া না করে খরচ কমাতে পারেন। সেক্ষেত্রে অন্যদের সঙ্গে একসঙ্গে নৌকা ঠিক করলে খরচ কমবে। বিছনাকান্দিতে সরকার নির্ধারিত নৌকা ভাড়া ১৫৫০ টাকা। যদি পাংতুমাই পর্যন্ত যেতে চান তাহলে নেবে ২২৫০ টাকা। একটি নৌকায় ১০-১২ জন অনায়াসে বসা যায়।

নৌকায় পাংতুমাই যেতে লেগে যায় প্রায় দেড় ঘণ্টা। যদিও ফিরতে সময় লাগে কম। সেখানে ঝরনা বেশ দূরে, কাছে যাওয়া যায় না। পাংতুমাই থেকে এবার বিছনাকান্দি চলে গেলাম একই নৌকায়। বিছনাকান্দিতে প্রতি চার দিন পরপর ভারতীয় পণ্যের হাট বসে। এছাড়া কিছু অস্থায়ী দোকান আছে, সেখানেও বিভিন্ন জিনিস পাওয়া যায়।

বিছনাকান্দিতে জলকেলি করা অনেকের ইচ্ছেবিছনাকান্দিতে ঝরনার পানিতে গোসল করা ছিল চমৎকার অনুভূতি। স্বচ্ছ কাচের মতো দেখতে হিমশীতল পানি। অসংখ্য ছবি তোলা আর পাথরের সঙ্গে জলকেলিতে সময় কাটলো। তবে বিকাল ৫টায় সবাইকে বিছনাকান্দি থেকে ফিরতে হয়। এরপর সিএনজিতে চড়ে সিলেট শহর।

আমরা ছিলাম মাজার গেটের একটি হোটেলে। তাই কাপড় বদলে মাজারে চলে গেলাম জিয়ারতের উদ্দেশে। মাজারের জালালি কবুতর আর বিভিন্ন রকমের মানুষের সমাগমে অন্যরকম পরিবেশ। একইসঙ্গে মুক্তিযোদ্ধা কর্নেল এমএজি ওসমানী ও চিত্রনায়ক সালমান শাহের কবরে শ্রদ্ধা জানালাম। রাতের খাবারের জন্য বেছে নিলাম পানসি রেস্টুরেন্ট। শুনেছিলাম পানসির খাবার চমৎকার। সেখানে না খেলে সত্যিই মিস করতাম! নৈশভোজ শেষ করেই ঢাকায় ফেরার জন্য বাসে উঠলাম।

রাতারগুলে লেখকআমরা তিন জনের টিমে ঘুরেছিলাম। তবে পাঁচজনের টিম হলেও ২৫০০ টাকায় রাতারগুল আর বিছনাকান্দি ঘুরে আসা যায়। তবে হাতে আরেকদিন সময় থাকলে লালাখাল ও জাফলং দেখা যেতো। সেক্ষেত্রে খরচটা কিছুটা বাড়তো।

আমরা এভাবে প্রায়ই প্রাকৃতিক পরিবেশে সময় কাটানোর জন্য ঘুরতে যাই। তাই আমাদের পরিবেশের সুরক্ষায় সচেতন থাকা দরকার। বেড়াতে গেলে খাবারের উচ্ছিষ্ট ব্যাগে ভরে এনে ডাস্টবিনে বা যথাস্থানে ফেলবেন। পানির বোতল ও পলিথিনসহ অপচনশীল বস্তু যত্রতত্র ফেলবেন না।