ট্রাভেলগ

বিনোদিয়া যশোরে ‘শুদ্ধ’ সবজির স্বাদ

সবজি ক্ষেতবাইরে চরম গরম! রোদ্দুরের একচ্ছত্র আধিপত্যে বোঝা যায় কেমন তাপমাত্রা বিরাজ করছে। নভোএয়ারের বিমানের ভেতরে অবশ্য তা গায়ে লাগছে না। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত আসনে বসে জানালায় চোখ মেলে আছি। জানতাম সাদা ভেলার পাহাড়, নদী-নালা, খাল-বিল দেখা যাবে। ওপর থেকে নিচে তাকালে বরাবরই কেমন যেন একটা মুগ্ধতা কাজ করে। মাটি থেকে হাজার হাজার ফুট ওপরে উড়ছি! যেদিকে তাকাই শুধু সবুজ আর সবুজ। এটাই তো হওয়ার কথা। সবুজ শুদ্ধ সবজি বাগান দেখতেই যশোর যাচ্ছি।

বাটার মেখে দেওয়া স্যান্ডউইচ, কেক, প্যাকেট জুস, পানি ও চকোলেট খাওয়া শেষ হতে না হতেই পৌঁছে গেলাম। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে যশোর বিমানবন্দরের রানওয়ে স্পর্শ করতে লাগলো আধঘণ্টার মতো। রানওয়ে থেকে মিনিট দুয়েক হেঁটে বিমানবন্দরের বাইরে বেরোনো গেলো। যশোর সেনানিবাসের পাশে বিমানবন্দরটি অবস্থিত। ঢাকা-যশোর-ঢাকায় এখন প্রতিদিন ১১টি ফ্লাইট চলছে। শুনলাম, তবুও নাকি যাত্রীদের চাপ!

হেডফোন ফটকমাইক্রোবাসে চড়ে শহরের কেশবলাল সড়কে হোটেল হাসান ইন্টারন্যাশনালে গেলাম। সেখানে কিছুক্ষণ বিশ্রাম না নিলে হচ্ছে না। গরমে অস্থির! ঘণ্টাখানেক শুয়েবসে কাটানোরা পর ফের মাইক্রোবাসে চড়লাম। গন্তব্য শাহবাজপুর গ্রাম। যাওয়ার পথে শহরের খয়েরতলা মোড়ে দেখলাম বিজয়ের উদ্দেশে নির্মিত ভাস্কর্য ‘বিজয়-৭১’। কিছুদূর যেতেই যশোর সেনানিবাসের ২ নম্বর ফটকের সামনে একটি স্থাপনা নজর কাড়লো। গান শোনার হেডফোন আকৃতির ফটক এটি।

যশোর সদর উপজেলার শাহবাজপুর গ্রামে পৌঁছাতেই কণ্ঠশিল্পী মাহাদীর সঙ্গে দেখা। সুপারস্টোর চেইন স্বপ্ন’র মূল প্রতিষ্ঠান এসিআই লিমিটেডে কর্মরত আছেন এই গায়ক। তিনি জানালেন, ইউএসএআইডি’র এভিসি প্রকল্পের সহায়তায় দক্ষিণ ডেল্টা অঞ্চলে ২০০ কৃষককে সবজি ও ফসল ফলনে স্থানীয় জি.এ.পি (গুড এগ্রিকালচারাল প্র্যাকটিসেস) স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণ করে চাষে প্রশিক্ষণ দিয়ে যাচ্ছে স্বপ্ন। এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে কৃষকদের উৎপাদিত ফল ও সবজি তাদের রিটেল শপে ‘শুদ্ধ’ নামে বিক্রি হচ্ছে।

20180920_155842শাহবাজপুর গ্রামে দেখলাম বিষমুক্ত সবজি উৎপাদন প্রক্রিয়া। কৃষকেরা ঝুড়িতে সাজিয়ে রেখেছেন সবজি। এর মধ্যে আছে পটল, টমেটো, সিম, কাচা মরিচসহ অনেক কিছু। জানা গেলো, শুদ্ধ ব্র্যান্ডের ফসল ও সবজির চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে অর্থনৈতিক অবস্থার ইতিবাচক পরিবর্তন হয়েছে। তাদের কথা শুনতে শুনতে চারপাশের গ্রামীণ আবহ উপভোগ করছিলাম। নাগরিক কোলাহল ছেড়ে গাছগাছালিতে ঘেরা এমন প্রকৃতিতে কয়েকটা দিন কাটিয়ে দিতে পারলে মন্দ হতো না!

ইউএসএআইডি ও এসিআই লজিস্টিকস লিমিটেডের (স্বপ্ন) কর্মকর্তারাআমাদের পাশাপাশি ইউএসএআইডি’র মিশন পরিচালক ডেররিক ব্রাউনের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল শাহবাজপুরে শুদ্ধ প্রকল্প পরিদর্শন করেন। এ সময় আরও ছিলেন এসিআই লজিস্টিকস লিমিটেডের (স্বপ্ন) নির্বাহী পরিচালক সাব্বির হাসান নাসির ও প্রতিষ্ঠানটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। তাদের সঙ্গে বিস্তীর্ণ সবজি ক্ষেত ঘুরে দেখলাম। 

গরমে ততক্ষণে টপটপ করে ঘামছি। মাহাদী এসে দিলেন স্বস্তির খবর। মধ্যাহ্নভোজের সুব্যবস্থা রয়েছে গ্রামেই। সাদা ভাত, শুদ্ধ সবজি, দেশি মুরগি ভুনা, গলদা চিংড়ি ভুনা, গরুর রেজালা, মসুরের ডাল, কোনটা রেখে কোনটা খাই! সবই অমৃত লাগলো। খাওয়া-দাওয়া মেষে মাহাদী গেয়ে শোনালেন তার জনপ্রিয় গান ‘তুমি বরুণা হলে হবো আমি সুনীল’। তার কণ্ঠে বাংলা গান শুনে মুগ্ধতা প্রকাশ করলেন ইউএসএআইডি’র মিশন পরিচালক ডেররিক ব্রাউন।

শুদ্ধ সবজিখাওয়ার পর স্থানীয়দের কাছে জানা গেলো, যশোরের সাতমাইল পাইকারি সবজি মোকামে প্রতি হাটে এক থেকে দেড় কোটি টাকার বেচাকেনা হয়। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ব্যবসায়ীরা এসে সেখান থেকে সবজি কিনে ঢাকা, চট্টগ্রাম, বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করেন। এছাড়া তারা উল্লেখ করলেন গদখালীর ফুলের বাগানের কথা। যশোর শহরের চাচড়া থেকে বাসে চড়ে ঝিকরগাছা উপজেলার গদখালীতে নামলেই ফুল বেচাকেনা চোখে পড়ে।

biNodia park (2)শাহবাজপুর গ্রামের আতিথেয়তা পেয়ে ফেরার পথে দেখলাম বিনোদিয়া ফ্যামিলি পার্ক। যশোর শহর থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে শানতলায় এই পার্কে আছে মনোরম পরিবেশ। ১৯৯৮ সালে লে. কর্নেল ফয়েজ আহমেদের উদ্যোগে এটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। আগে জায়গাটি ছিল মূলত উন্মুক্ত ময়দান। পরে পার্ক হিসেবে গড়ে তোলা হয়। বিনোদনের জন্য এখানে আছে মিনি চিড়িয়াখানা, শিশুদের জন্য পার্ক, ছোট্ট নদী, রবিনহুডের ঘর, কৃত্রিম ঝরনা, দুটি খাবার স্টল। বিনোদিয়া ফ্যামিলি পার্কে যেতে যশোর শহরের যেকোনও স্থান থেকে রিকশা অথবা ইজি বাইকে চড়ে পালবাড়ি মোড়ে আসতে হয়। সেখান থেকে কিছু ইজিবাইক ৪-৫ জন যাত্রী নিয়ে চুরামনকাঠির দিকে যায়। এই ইজিবাইকে চেপে মাত্র ৫-৭ মিনিটের পথ পেরোলেই বিনোদিয়া ফ্যামিলি পার্ক। ভাড়া ৫-১০ টাকা। রিকশায় যেতে ভাড়া পড়বে বেশি।

হৃদয় আকৃতির মিষ্টিযশোরের চুয়াডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ডে সাতক্ষীরা ঘোষ ডেয়ারিতে মালাই চপের স্বাদ এখনও মুখে লেগে আছে। সেখানকার হৃদয় আকৃতির মিষ্টিও সুস্বাদু। যশোর প্রেসক্লাবেও মালাই চপের স্বাদ উপহার দিলেন সাধারণ সম্পাদক তৌহিদুর রহমান। ততক্ষণে সন্ধ্যা নেমে এসেছে। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার ফ্লাইটে চড়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দিতে হবে। কিন্তু যশোরে বেড়াতে এসে মণিহার দর্শন না করলে চলে! তাই তাড়া থাকলেও আমরা গেলাম যশোরের অন্যতম আকর্ষণ মণিহার প্রেক্ষাগৃহের সামনে। শহরের জিরো পয়েন্ট দড়াটানা থেকে দেড় কিলোমিটার পূর্বে এটি অবস্থিত। প্রায় ১ একর জমির ওপর ১৯৮৩ সালের ৮ ডিসেম্বর গড়ে ওঠে চার তলার এই সিনেমা হল। প্রথম ছবি হিসেবে এখানে প্রদর্শিত হয় ‘জনি’। সিনেমা হলটির প্রতিষ্ঠাতা মরহুম সিরাজুল ইসলাম। আধুনিক নির্মাণশৈলীর সুবাদে সিনেমা হলটি সারাদেশে ব্যাপক পরিচিতি পায়। এতে আছে মোট ১ হাজার ৪৩০টি আসন। তার মধ্যে ৫৩৫টি আসন ডিসি। এছাড়া বিশেষ ব্যক্তিদের জন্য ১৮টি আসন সংরক্ষিত। প্রেক্ষাগৃহটি প্রতিষ্ঠার পর কী নাম রাখা যায় তা জানতে চেয়ে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছিল। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রায় একলাখ নাম আসে। সেখান থেকে বেছে নেওয়া হয় ‘মণিহার’।

মণিহার প্রেক্ষাগৃহযশোর নিয়ে কিছু তথ্য
১৭৮১ খ্রিস্টাব্দে যশোর পৃথক জেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এটাই বাংলাদেশের প্রথম জেলা। ১৮৬৪ সালে ঘোষিত হয় যশোর পৌরসভা। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রথম স্বাধীন হওয়া জেলা হলো যশোর। প্রশাসনিক কাঠামোর দিক থেকে যশোর দেশের ১৩তম বৃহত্তম জেলা। এর মোট আয়তন ২৫৯৪.৯৫ বর্গমাইল। এর মধ্যে ৬০ বর্গমাইল নদী এলাকা। খুলনা বিভাগের অধীন ৮টি উপজেলা নিয়ে এই জেলা গঠিত। এগুলো হলো— সদর উপজেলা, অভয়নগর, কেশবপুর, চৌগাছা, ঝিকরগাছা, বাঘারপাড়া, মনিরামপুর ও শার্শা।

দেখার মতো
ভাষাশহীদদের স্মরণে যশোরে সরকারি মাইকেল মধুসূদন (এমএম) কলেজে নির্মিত কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, বীরশ্রেষ্ঠ ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখের সমাধি, যশোর রেলস্টেশনের নিকটবর্তী প্রায় পাঁচ বিঘা জমির ওপর শ্রীরামকৃষ্ণ আশ্রম, যশোর বোট ক্লাব, দোহাকুলা ইউনিয়নে অবস্থিত কালুডাংগা মন্দির, শ্রীধরপুর জমিদার বাড়ি, ভৈরব নদ, কালেক্টরেট ভবন, ইনস্টিটিউট পাবলিক লাইব্রেরী, শঙ্করপুর বধ্যভূমি, চাঁচড়া রাজবাড়ী, চাঁচড়ার মৎস উৎপাদন কেন্দ্র।