ট্রাভেলগ

জোকের রাজ্যে একদিন

IMG-20180930-WA0114শ্রীমঙ্গলের হামহামের গল্প শুনেছি অনেক। অনেকেই সেটাকে জোকের রাজ্য বলে! যাবো যাবো করেও যাওয়া হচ্ছিল না সেখানে। একদিন বিস্তারিত পরিকল্পনা লিখে পোস্ট করলাম আমাদের ‘ছুটি দিগন্তে’ ট্রাভেলিং গ্রুপে। একে একে জুটে গেলো ১৬ জন। অতঃপর ঘুরে এলাম সেই জোকের রাজ্যে।

গত ২৭ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ১০টার দিকে বিমানবন্দর স্টেশন থেকে চেপে বসলাম সিলেটগামী উপবন এক্সপ্রেসে। চাঁদের আলোয় এগিয়ে চললো রেলগাড়ি। ঢাকা থেকে ঘণ্টাদেড়েক পথ যাওয়ার পরেই দেখি চারদিক ঢেকে আছে কুয়াশার চাদরে। শ্রীমঙ্গলের দিকে যতই এগোচ্ছিলাম, ততই বেড়েছে কুয়াশা আর ঠাণ্ডা হাওয়া।

IMG-20180930-WA0117রাত ৩টায় ট্রেন থামলো শ্রীমঙ্গল স্টেশনে। মানুষজন খুব একটা নেই বললেই চলে। স্টেশনের এখানে সেখানে জটলা পাকিয়ে বসে আছে কিছু মানুষ। আমরাও সবাই মিলে একজায়গায় বসে গল্প জুড়ে দিলাম। রাত সাড়ে ৪টা থেকে ৫টার মধ্যে শেষ করে ফেললাম আমাদের নাশতা পর্ব।

ফজর নামাজের পর চেপে বসলাম জিপে। সত্যি বলতে চারপাশ এতই সুন্দর যে, কেউই জিপে বসে থাকতে চাচ্ছিলো না। সবাই দাঁড়িয়ে উপভোগ করেছি পুরোটা পথ। কুয়াশায় ঢেকে আছে চারপাশ। দু’পাশে চা বাগান। মাঝখানে রাস্তা। কিছুক্ষণ পরেই দেখলাম দু’পাশে ঘন জঙ্গল। রাস্তায় আমরা ছাড়া আর তেমন কেউই নেই। বন থেকে ভেসে আসছে পাখির ডাক। আর কোনও শব্দ নেই। মুখ-চুল সব ভিজে যাচ্ছে শিশিরকনায়!

IMG-20180930-WA0018প্রায় ঘণ্টাদেড়েক পর শেষ হলো জিপযাত্রা। এবার অল্প হেঁটে চলে গেলাম কলাবন পাড়ায়। পথিমধ্যে শিশু-কিশোরদের কাছ থেকে কিনে নিলাম বাঁশের লাঠি। যাওয়ার পথেই খাবার অর্ডার দিয়ে গেলাম। কলাবন পাড়ায় আমরাই সেদিনের প্রথম টিম হিসেবে নাম নিবন্ধন করে ধরলাম সবুজের পথ। মোটামুটি গতি রেখেই সবাই হাঁটছি।
IMG_20180928_153646_HDRহঠাৎ টিমের একজন মেয়ের গগনবিদারী চিৎকারে ভয় পেয়ে যাই অনেক। দৌড়ে সামনে গিয়ে দেখি তাকে জোকে ধরেছে। তিনি লাফাচ্ছেন! তাকে কোনোরকম শান্ত করে টিমের একজন জোক ছুটিয়ে দিলো। ততক্ষণে শুরু হয়ে গেছে জোকের হামলা! একজনের পর একজন আক্রান্ত হচ্ছে। ভেজা রাস্তা। কুয়াশায় সব ভিজে গেছে। সরু পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ ধরে হেঁটে চলছি। গাছের পাতায় লেগে আছে শিশিরজল। এখানে সেখানে পাতার সঙ্গে লেগে আছে জোক।

IMG_20180928_080154_HDRএকমিনিট কোথাও দাঁড়ানোর জো নেই। এমনকি হাঁটার জন্য সুবিধা করতে সঙ্গে নেওয়া বাঁশের লাঠি বেয়েও ওপরে উঠে আসছে জোক। কিছুক্ষণ পরপর চিৎকার শুনলেই বুঝতে পারি কাউকে না কাউকে জোকে ধরেছে। জোক যাতে না ধরে সেজন্য সবাই বেশ জোরে হেঁটেছি। তাও খুব একটা উপকার হয়েছে তা বলা যাবে না। ইতোমধ্যে দেখলাম, একটা জোক আমার ভিুড়ি অবধি চলে এসেছে! কীভাবে আর কখন এলো টেরই পেলাম না।

হিসাব করে দেখলাম, ১৬ জনের মধ্যে মাত্র একজনকে জোকে ধরেনি। এছাড়া বাকি সবাই জোকের খপ্পরে পড়েছে। দু’একজনকে নাকি ৮-১০টা করেও জোকে ধরেছিল। নানান আকারের জোক।

IMG_20180928_092355_HDRপুরো পথই কষ্টমাখা হলেও বেশ উপভোগ্য ছিল। একটা সময় মাটির পথের পিচ্ছিল ঢাল বেয়ে নিচে নেমে পেয়ে গেলাম ঝিরিপথ। তখন মনে জন্ম নেয় অন্যরকম অনুভূতি। ঠাণ্ডা শীতল স্বচ্ছ পানিতে বসে বিশ্রাম নিলাম কিছুক্ষণ। মাথার ওপরে বিশাল বাঁশবন। ঝিরিপথের এখানে সেখানে পড়ে আছে বিভিন্ন আকারের পাথর। ঝিরিপথ জুড়ে শুধু আমাদের ছপছপ পায়ের শব্দ। কিছুদূর এগোতেই কানে বাজলো হামহামের শব্দ। হামহামের সামনে যেতেই গায়ে লাগলো পাগলা হাওয়া! বিন্দু বিন্দু জলকনা উড়ে এসে ঘেমে যাওয়া মুখে লাগছে। মনে হলো, কোনও রূপবতী বুলিয়ে দিচ্ছে শীতল পরশ!

IMG-20180929-WA0123প্রথমেই হামহামে নেমে গভীরতা পরখ করে নিলাম। সবাইকে সতর্ক করে জানানো হলো কোথায় কতটুকু পানি। এরপর ঝাঁপিয়ে পড়লাম হামহামে। শীতল জল দাঁতে দাঁতে কাঁপাকাপি লাগিয়ে দিলো অল্প সময়ের মধ্যে। হামহামে ইচ্ছেমতো সময় কাটিয়ে ফেরার পথ ধরলাম। ততক্ষণে রোদ উঠেছে বেশ। পথ শুকিয়েছে। পালিয়ে গেছে জোকের দল। একটা টিমকে দেখলাম সাউন্ডবক্সে উচ্চ ভলিউমে গান ছেড়ে উল্লাস করে এগোচ্ছে। আরেকদল প্যাকেট বিরিয়ানি (সম্ভবত) নিয়ে যাচ্ছে।

IMG-20180930-WA0087ফেরার পথে খুব একটা সময় লাগলো না। কলাবন পাড়ায় এসে সবাই গোসল করে ফ্রেশ হয়ে চা পাতার ভর্তা,আলুর ভর্তা ও মুরগি ভুনা দিয়ে লাঞ্চ করে গেলাম মাধবপুর লেকের উদ্দেশে। মাধবপুর লেকে ঘুরে রওনা দিলাম শ্রীমঙ্গল শহরের দিকে। দু’পাশে চা বাগানের মাঝখান দিয়ে চলছে আমাদের জিপ। পথিমধ্যে শহরের কাছাকাছি নিরিবিলি একজায়গায় বসে চায়ের স্বাদ নিলাম।

আমাদের ফেরার বাস ছিল সন্ধ্যা ৫টা ৪০ মিনিটে। বাস এলো সন্ধ্যা ৬টায়। সুন্দর একটি দিন কাটিয়ে হাসিমুখে সবাই পথ ধরলাম যান্ত্রিক শহরের দিকে।

IMG_20180928_052749_HHTযেভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে বাসে ট্রেনে দু’ভাবেই শ্রীমঙ্গল যাওয়া যায়। আমরা ট্রেনে গিয়েছিলাম। কমলাপুর থেকে রাত ৯টা ৫০ মিনিটে ট্রেন ছাড়ে। শ্রীমঙ্গল স্টেশনেই জিপগাড়ি ভাড়া পাওয়া যায়। বিভিন্ন জায়গায় বেড়ানোর জন্য ফেসবুকে আছে আমাদের প্ল্যাটফর্ম ‘ছুটি দিগন্তে’। চাইলে আপনিও এতে যোগ দিয়ে আমাদের সঙ্গে ঘুরতে যেতে পারেন।