ট্রাভেলগ

ঢাকা কেন্দ্র: যান্ত্রিক বিষণ্নতার শহরে নৈসর্গিক সৌন্দর্য

IMG_20181120_143821পুরান ঢাকার মোহিনী মোহন দাস লেনে রয়েছে একটি চৌকোনা বাড়ি। দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করার মতো। নজরকাড়া এই স্থাপনার নাম ‘ঢাকা কেন্দ্র’। ঢাকার ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে দুর্লভ সংগ্রহশালা এটি। তাই এই বাড়িকে বলা হয় ঢাকার ইতিহাস ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি চর্চা কেন্দ্র ।

১৯৯৭ সালে পুরান ঢাকার স্বনামধন্য ব্যক্তিত্ব প্রয়াত মাওলা বখশ সরদারের ছেলে আজিম বখশ নিজ উদ্যোগে গড়ে তোলেন মাওলাবখশ সরদার মেমোরিয়াল ট্রাস্ট। এর আওতায় রয়েছে পাঁচটি প্রকল্প। সেগুলোর একটি হলো— পুরান ঢাকার ইতিহাস ও ঐতিহ্যচর্চা। এরই ফসল ঢাকা কেন্দ্র।

IMG_20181120_144516বাড়িটির দোতলায় আছে ঢাকার ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংক্রান্ত সাত হাজার বই সমৃদ্ধ পাঠাগার। এছাড়া দেখা যায়— পুরান ঢাকাবাসীর ব্যবহার্য বিভিন্ন সামগ্রী, ছবি, ঐতিহাসিক দলিল, মানচিত্র, বুড়িগঙ্গার পাড়ে পত্তন হওয়া আদি নগরের বর্ণিল স্মৃতিচিহ্ন। বসবাসযোগ্যতার নিরিখে বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে অনুপযোগী শহর ঢাকায় এমন একটি বাড়ি আছে বোঝাই যায় না!

IMG_20181120_144158উদ্যানহীন শহরে ঢাকা কেন্দ্রে বই আর নানান নিদর্শনের সঙ্গে বৃক্ষশাখার দোলানো বাতাস পাওয়া যায়। দোতলায় অন্তত ১০০ প্রজাতির অর্কিডের বাগান যান্ত্রিকতার বিষণ্নতা থেকে খানিকটা হলেও মুক্তি দেয়। ইট-পাথরের নগরে এ যেন একখণ্ড সবুজ ঢাকা। কিছু মানুষের উদ্যোগ ও নিরন্তর শ্রম একটি প্রতিষ্ঠানকে কোন জায়গায় নিয়ে যেতে পারে তার উজ্জ্বল উদাহরণ এটি।

IMG_20181120_144615ঢাকা কেন্দ্রে রয়েছে অসংখ্য দুর্লভ সংগ্রহ। এখানে আছে একটি সুবিশাল পাঠাগার। এর পাশে ছোট জাদুঘরে পুরান ঢাকার বনেদি কয়েকটি পরিবারের ওপর আলাদা গ্যালারি। এখানে এসব পরিবারের দুর্লভ সব ছবি, পানের কৌটা থেকে শুরু করে রান্নার তৈজস, হুক্কা, শাড়ি-কাপড়, লবণদানি স্থান পেয়েছে। সংগ্রহশালায় রয়েছে ১৮৯৬ সালে তৈরি একটি জমির দলিল। এর ভাষার অভিনবত্ব আগ্রহী গবেষকদের জন্য আকর্ষণ। এছাড়া ঢাকায় প্রথম স্থাপিত মোটর সারাই কারখানার যন্ত্রাংশ, প্রাচীন মানচিত্র, পুরনো ভবনের ইট-নকশা চোখে পড়ে।

IMG_20181120_143733প্রায় দুই দশক ধরে পাঠাগারটি অজস্র পাঠক ও গবেষকের প্রয়োজন মিটিয়ে চলেছে। এই নগরের কোনও কিছু নিয়ে অনুসন্ধানী কাজ করতে গেলে ঢাকা কেন্দ্র ছাড়া অনেকটা অসম্ভব। অনেক সময় অতীত ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংক্রান্ত বই পাওয়া দুষ্কর হয়ে দাঁড়ায়। তখন অনেকেই এখানে এসে সেসব বইয়ের সন্ধান করেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মিলে যায় কাঙ্ক্ষিত বই।

IMG_20181120_144012ঢাকা কেন্দ্রে আবদুল করিমের ‘ঢাকাই মসলিন’, আবু যোহা নূর আহমদের ঊনিশ শতকের ‘ঢাকার সমাজজীবন’, কেদারনাথ মজুমদারের ‘ঢাকার বিবরণ ও ঢাকা ব্রাহ্ম সমাজের ইতিহাস’, নাজির হোসেনের ‘কিংবদন্তির ঢাকা’, নির্মল গুপ্তের ‘ঢাকার কথা’, যতীন্দ্রমোহন রায়ের ‘ঢাকার ইতিহাস’, রফিকুল ইসলামের ‘ঢাকার কথা’, সত্যেন সেনের ‘শহরের ইতিকথা’, হরিদাস বসুর ‘ঢাকার কথা’ বই রয়েছে।

IMG_20181120_143347অধ্যাপক মুনতাসীর মামুনের লেখা ঢাকার ওপর সব গ্রন্থ পাওয়া যায় ঢাকা কেন্দ্রে। নগর উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে প্যাট্রিক গেডেস ‘ঢাকা: অ্যা স্টাডি ইন আরবান হিস্ট্রি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’ বইটি লিখেছিলেন ১৯১৭ সালে। এর পাশাপাশি ইংরেজি ভাষায় লেখা ভারতীয় ও ব্রিটিশ লেখকদের আরও অনেক দুর্লভ বইয়ের বিরাট সংগ্রহশালা এটি। এই পাঠাগার বিকাল ৪টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত সবার জন্য উন্মুক্ত। তবে গবেষণার কাজে এলে অধিক সময় বসে কাজ করা যায়। বৃহস্পতিবার সাপ্তাহিক বন্ধ।

IMG_20181120_143847ঢাকা কেন্দ্রের তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়েছিলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের পাঁচ শিক্ষার্থী মিনার আল হাসান, চুমকি দেবনাথ, নার্জিয়া খানম, জে,এফ শাকিল ও নাজনীন নহার রিপা। তারা এই পাঠাগারের ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে গবেষণা করছেন। তাদের কথায়, ‘এমন শিক্ষার্থীবান্ধব পরিবেশ কোথাও দেখিনি। এখানে সব ধরনের তথ্য সহায়তা পেয়েছি। পড়াশোনার পরিবেশ থেকে শুরু করে অবসর সময় কাটানো, বই পড়া বা সবুজঘেরা বাগানবাড়িসহ সবকিছু নজরকাড়া।’

46506103_451277315277110_9031629522641879040_nঢাকা কেন্দ্রের চেয়ারম্যান আজিম বখশ থাকেন গুলশানে। আসা-যাওয়ায় তিন ঘণ্টার মতো লেগে যায়। তবুও পারিবারিক স্মৃতিবাহী এই কেন্দ্রের টানে প্রতিনিয়ত জ্যাম উপেক্ষা করে ছুটে আসেন তিনি। সার্বিক বিষয় দেখভাল করেন। পাঠাগারে আসা অনেকেই তাকে ঢাকার জীবন্ত ইতিহাস নামে অভিহিত করেন। দেশের যেকোনও প্রান্তে ঢাকাকেন্দ্রিক কিছু পেলে সংগ্রহ করে নিয়ে আসেন তিনি।

IMG_20181120_143431আজিম বখশ বলেন, ‘ঢাকার সবচেয়ে পুরনো এলাকা ফরাশগঞ্জ। তখনকার দিনে ঢাকার সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ছিল এখানে। লঞ্চঘাট, নাট্যমঞ্চ, গানের দল, পাঠাগার সব মিলিয়ে উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করতো। সেই দিন তো আর ফিরিয়ে আনা যাবে না। তবুও এই কেন্দ্র যদি কারও সামান্য উপকারে আসে, সেটাই আমার সার্থকতা।’

IMG_20181120_143950যেভাবে যাবেন
ঢাকার বাইরে থেকে বাস, ট্রেন, লঞ্চসহ যেকোনও বাহনে আসা যাবে। বাসে এলে মহাখালী থেকে আজমেরী পরিবহন ও স্কাই লাইন বাস জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত আসে। সেখান থেকে রিকশায় চড়ে যাওয়া যায়। গাবতলী থেকে ৭ নম্বর ও সাভার পরিবহন বাস আসে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত। তারপর রিকশায় চড়ে যেতে হবে। সায়দাবাদ থেকে বেছে নিতে পারেন রিকশা বা উবার। ট্রেনে এলে কমলাপুর থেকে উবার বা রিকশা করে যাওয়া যায়। লঞ্চে এলে সদরঘাট টার্মিনাল থেকে পাঁচ মিনিটের হাঁটা দূরত্বে ঢাকা কেন্দ্র।

IMG_20181120_145037যেখানে থাকবেন
পুরান ঢাকার অলিগলিতে বিভিন্ন মানের অসংখ্য হোটেল রয়েছে। এগুলোতে এসি ও নন-এসি সিঙ্গেল ও ডাবল উভয় ধরনের রুমে থাকা যায়। উন্নত হোটেলের কক্ষ পরিপাটি সাজ, টেবিল-চেয়ার, ইন্টারকম, টেলিফোন, টেলিভিশন আর বাথরুমে তোয়ালে, সাবান, শ্যাম্পু, গিজার, টুথব্রাশ ও পেস্ট প্রভৃতি থাকে। সাধারণ হোটেলের রুমে আছে বিছানা, চেয়ার-টেবিল, ফ্যান ও লাইট। এসব হোটেলে নগদ প্রদানের পাশাপাশি ক্রেডিট কার্ডে বিল পরিশোধের ব্যবস্থা রয়েছে।
46494555_1126763440819603_561769816667455488_nছবি: লেখক