দলটির একসঙ্গে যাত্রা মাত্র পনেরো দিনের। এটাই প্রথম শো। দুই সীমান্তের মাঝখানে ‘নো ম্যন্স ল্যান্ড’-এর ফটক বন্ধ হবে বিকাল ৫টায়। এর কমপক্ষে দেড় ঘণ্টা আগে পৌঁছাতে হবে ওখানে। রাস্তায় ভীষণ জ্যাম। সবার প্রিয় সংগীতশিল্পী আরশীনগর ব্যান্ডের ভোকাল বাবান দা (শুভদীপ) দোতারা ফেলে এসেছে ট্যাক্সিতে। অর্জুন কলকাতায় পরীক্ষা শেষ করে রওনা দেবে। অনেক ইনস্ট্রুমেন্ট তার কাছে। সব মিলিয়ে টালমাটাল অবস্থা। তবুও ‘বাংলা নাটকে’র শালীনি দি আর দেবদান দা ছাড়া বাকি কারও মধ্যে কোনও ভ্রুক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। সবাই প্রথম শো নিয়ে উচ্ছ্বসিত। শো আদৌ করতে পারবে কিনা এখনও ঠিকঠিকানা নেই, যেকোনও মুহূর্তে বিএসএফ থেকে ফোন আসতে পারে, ‘আপনাদের আর আসতে হবে না!’
মাইকেল ও জোয়ানার গল্প প্রয়োজন। যে গল্প দুই বাংলার মানুষের মনের বন্ধনের কথা বলবে, দেশত্যাগী মানুষদের ব্যাকুলতার কথা বলবে। আমার কাছে দেশভাগ মানে সাদাকালো ফুটেজে যশোর রোডে বস্তা আর ট্রাঙ্ক নিয়ে হাঁটতে থাকা নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধের ছবি। অথচ দলের আরেক সদস্য নীলাংশুকের কাছে ব্যাপারটা এমন– প্রতি বৃহস্পতিবার সকাল থেকে জানালায় তার দাদির আকুল হয়ে ‘মৈত্রী ট্রেন’-এর চলে যাওয়া দেখা। ওর দাদি নাকি ওই ট্রেনে তার রেখে আসা বাংলাদেশের গন্ধ পায়। পারমিতার গল্প এমন– ওর কাকা দুই দিনের জন্য বাংলাদেশে এসে ফিরে যাওয়ার পর পারমিতার দাদির আকুল হয়ে তার চাচার গায়ের গন্ধ নেওয়া। আর বারবার জিজ্ঞেস করা ‘কেমন আছে আমার দেশ, ওই পুকুর পাড়ের তালগাছটা?’ তালগাছ কি আর একইরকম থাকে দাদী? কত পাল্টেছে দেশ! কতটা ঘৃণা করতে শিখে গেছি আমরা একে অন্যকে!
কলকাতা থেকে ফিরেছি প্রায় ২০ দিন হলো। আমেরিকান অ্যালামনাইয়ের সদস্য হওয়ার সুবাদে আমন্ত্রণ পেয়েছি এই প্রকল্পের জন্য। ভাবলাম বছরের শেষ অফিসের কাজের চাপ গোছাতে পারলে চলে যাওয়া যাবে। চলে গেলাম। ফিরে এসে কাজের চাপে ত্রাহি অবস্থা! এতদিন পর লিখতে বসে মনে হচ্ছে, এত এত দমফাটা হাসি আর চাপা কান্নার গল্প জমে আছে যে, একটা বই-ই লিখে ফেলা যাবে!
সবার গল্প জমলো। সেগুলোকে জোড়া দেওয়া হলো। গান বাঁধা হলো। সংলাপ জুড়ে দেওয়া হলো। দুই সপ্তাহে দাঁড়িয়ে গেলো ছবির মতো একটা গল্প। আমার মতো জীবনে মঞ্চে অভিনয় না করা মানুষকে দিয়েও অভিনয় করানো হলো। সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৫টা অবধি লিংকন রুমে কর্মশালার পরও আমাদের আড্ডা চলতো। কখনও একসঙ্গে নাটক দেখা, কখনও সিনেমা দেখতে যাওয়া, কখনও উদ্দেশ্যহীনভাবে হাঁটা। আমি সিয়াটল, আমস্টারডাম কিংবা ব্রিসবেনে ঘুরে এত ছবি তুলিনি যতটা কলকাতার রাস্তায় তুলেছি। মনে হচ্ছিল কবির সুমনের গানে, শীর্ষেন্দুর উপন্যাসে ও সৃজিতের সিনেমায় হাঁটছি!
এভাবেই দুই বাংলার ভাষা, সুর, জেমস-নচিকেতা, ইলিশ, জামদানি, ভেলপুরি-ফুচকা, লালন আমাদের এক করে রেখেছে। রাখুক। রাজারা একদিন হয়তো বুঝতে পারবে– ধর্মের নামে, অর্থনীতির দোহাই দিয়ে পুঁতে রাখা রাজনৈতিক কাঁটাতার মানুষের আত্মার বন্ধনের চেয়ে দুর্বল।