এতক্ষণে একটা গাছ দেখা গেলো। একবার তাকিয়েই মুখ ফিরিয়ে নিলাম। এখনও বেশ দূরে। আরও অনেকটা ওপরে উঠতে হবে। বাকিদের কোনও খবর নেই। পা ঘষতে ঘষতে উঠছি এখন। স্বয়ং শেষ মহোদয়কেও একসময় শেষ হতে হয়। দুর্দমনীয় ইচ্ছের কাছে হার মানতে হলো তাকে!
নিজেকে আবিষ্কার করলাম বিরুপাক্ষের আঙিনায়। মন্দিরের ভেতর শিব লিঙ্গ আছে একটি। এর আগেও পূজো হতে দেখেছি। এতক্ষণের চিটচিটে গরম আর নেই। আশ্চর্য শীতল চারপাশ। মন্দিরের ছোট্ট চাতালে গা এলিয়ে দিলাম।
চকোলেট চিবুনো হলো। চারপাশে আচার-অর্চনার জিনিসপত্র ছড়ানো। পাশের গাছটির গায়ে নানান আকারের অনেক ফিতে বাঁধা। দেয়ালে স্পষ্ট করে লেখা— বেশিক্ষণ এখানে অবস্থান করা যাবে না। আবারও হাঁটা।
এবার কিছুটা নেমে যেতে হবে। কিন্তু স্বস্তির কোনও কারণ নেই। চন্দ্রনাথের মূল মন্দির আরও অনেকটা ওপরে। আমরা একটা বিশেষ লক্ষ্য নিয়ে এখানে এসেছি। সামনে হিমালয়ের একটা বড় ট্রেক। শারীরিক প্রস্তুতি ঝালিয়ে নিতে চন্দ্রনাথের চূড়ায় দুটো আলাদা পথ দিয়ে ওঠার ইচ্ছে।
চন্দ্রনাথের ইতিহাস নিয়ে নানান কথা শোনা যায়। মূল মন্দিরটি সবচেয়ে উচুঁ চূড়ায় অবস্থিত হলেও এর চারপাশের বিভিন্ন পাহাড়কে কেন্দ্র করে আছে আরও অনেক মন্দির। প্রতি বছর শিব চতুর্দশীতে এখানে বিশাল মেলা বসে। দেশ-বিদেশ থেকে পুণ্যের আশায় আসেন অনেক পরিব্রাজক।
যে পথে এসেছি সেই পথে আবারও কিছুদুর গিয়ে পাহাড়ি পথ ধরে নিচে নামতে শুরু করলাম। সে চুপচাপ তার সঙ্গে আসতে বললো। পাতালকালীতে বিভিন্ন কারণে বাইরের মানুষের যাতায়াত খুব বেশি নেই। রহস্য আর ভয় মেশানো পরিবেশের পাশাপাশি ডাকাতের একটা আতঙ্কের কথা শোনা যায়। মূলত পুজো করার জন্য দলবেঁধে অনেকে এলেই শুধু পাতালকালী মোটামুটি নিরাপদ। এমনই ধারণা পেয়েছিলাম। কিন্তু আমরা তো মোটে ছয় জন। উদ্দেশ্য নিছক কৌতূহল নিবৃত্তি।
মধ্যদুপুরের নির্জন পাহাড়ি এই উপত্যকায় নৈঃশব্দের বান ডেকেছে। পাখির ডাক ছাড়া আর কোনও প্রাণের অস্তিত্ব নেই। আশেপাশের গাছে দেবী কালীর প্রচুর স্থিরচিত্র ঝোলানো। লাল সিঁদুর রঙে পাথরগুলো রঞ্জিত। মনে হয় এখনই কোনও জীবের রক্তপানে পিপাসা নিবৃত্ত করবেন দেবী কালী। পুজোর সময় অবশ্য পাঠা বলি হয় এখানে। ঝিরির ঠিক মাঝখানে বিশাল একখানা পাথর। এর নিচ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে জলধারা। শিমুল বললো, একসময় এলাকাটি নাকি সাগরের অংশ ছিল। তার গায়ে খোদাই করা যেন একটা মুখচ্ছবি। গাছের আশ্রয়ে জায়গাটা আলো-আঁধারি। ভরদুপুরেও আলোর দাপট নেই। কালীর অবয়ব এখানে উল্টোভাবে আছে। তাই এখানটার নাম ‘উল্টো কালী’।
মনে রাখবেন
সীতাকুণ্ড সদর থেকে সরাসরি চন্দ্রনাথ মন্দির প্রাঙ্গণে যেতে হবে। সেখান থেকে উল্টো কালী খুব বেশি দূরের পথ নয়। তবে যথাযথ অনুমতি বা মন্দির সংশ্লিষ্ট কারও অগোচরে একা একা উল্টো কালীতে না যাওয়াই ভালো। গেলেও দলবেঁধে গেলে সুবিধা হয়। হৈচৈ করার কারণে পরিবেশের গাম্ভীর্য নষ্ট যেন না হয় সেদিকে সচেতন থাকা দরকার। এমন কিছু ফেলে আসা যাবে না যাতে পরিবেশের কোনও ক্ষতি হয়।