মস্কো এই সময়েরাশিয়ার রাজধানী মস্কোতে বরফ গলতে শুরু করেছে। বরফের আধিপত্য শেষের পথে। একইসঙ্গে বাতাসের রাজত্ব শুরু। এ যেন আরেক দস্যি! বরফে কিছুটা শীত কম লাগে। কিন্তু ঠাণ্ডা হাওয়া লাগলে হাড় হিম হয়ে যায়। অবশ্য এমন আবহাওয়া পেয়ে রুশরা বেজায় খুশি। হাড়কাঁপানো বসন্ত দারুণ উপভোগ করছেন তারা। ঠাণ্ডার মাঝে রোদ উঠছে প্রতিদিন। তাতেই তারা মহাখুশি।
আমার ডরমেটোরির এক রুশ বন্ধু গ্লেভ সেই খুশিতে কবিতা লেখা শুরু করেছে। ফুরফুরে মেজাজে শিষ বাজাতে বাজাতে পাস্তা আর স্যুপ রান্না করে সে। মাঝে মধ্যে আলু ভাজির সঙ্গে মাংস ভেজে খায়। তার নাকি এমন আবহাওয়ায় মনে দারুণ ফূর্তি। বেচারাদের জীবন শীতে জবুথবু থাকে বেশিরভাগ সময়, তাই একটু রোদ হাসলেই তাদের মন আলোকিত হয়ে ওঠে।
মস্কোতে শিশু-কিশোরদের আনন্দমস্কোতে এই আবহাওয়াকে কেন্দ্র করে ছুটির দিনগুলোতে নির্দিষ্ট কিছু পর্যটন স্পটে জমে উঠেছে মেলা। এসব স্থানে শিশু-কিশোরদের জন্য রয়েছে বিনোদনের ব্যবস্থা। পথে পথে ঘুরতে আসা বিভিন্ন বয়সী মানুষের সঙ্গে নানান সাজে মজা করে ছেলেমেয়েরা। রুশ উপকথার মাতৃওশকা পুতুলের সাজে সেজে ঐতিহ্যবাহী যন্ত্র বাজিয়ে নাচ-গান, মিকি মাউস সেজে শিশুদের স্বাগত জানানো, পায়ে লম্বা বাঁশ লাগিয়ে হেঁটে বেড়ানোসহ সবই চলছে।
মস্কোতে পথেঘাটে ছড়ায় সুরের মূর্ছনানানান স্বাদের মজাদার খাবারের পসরা নিয়ে বসেছেন দোকানিরা। এগুলোতে লোকজনের বেশ আনাগোনা। ঠাণ্ডা বাতাসে দমে যাননি কেউ। যতই তুষারপাত কিংবা ঠাণ্ডা বাতাস থাকুক, আবহাওয়া তাদের কখনোই কাবু করতে পারে না। রুশরা নিজেদের মতো করেই চলছে। প্রথম দিকে ধারণা ছিল তারা যন্ত্র! আদতে রুশরা শিল্প-সাহিত্যে ঋদ্ধ এক জাতি। তাদের রসবোধ প্রবল।
গ্রাম থেকে ঢাকায় আসা লোক যেমন হা হয়ে সব গিলে যায়, আমার অবস্থা হয়েছে সেইরকম। শুধু দেখি আর রুশ মেয়েদের দিকে হা হয়ে তাকিয়ে থাকি। এখানকার প্রত্যেক মেয়েই দারুণ সুন্দরী। তাদের আত্মমর্যাদা প্রবল।
মস্কোতে গলতে শুরু করেছে বরফআগেই বলেছি, পুরুষদের চেয়ে এখানে মেয়েরা সক্রিয়। তারা পুরুষদের সহায়তার আশায় বসে থাকে না। ঘরে-বাইরে দুটোই দারুণভাবে সামলে যান নারীরা। আর নারী দিবসের শুরুটাই মূলত রাশিয়ায়। তাই ৮ মার্চ নারী দিবস এখানে বেশ ঘটা করে পালিত হয়। এই দিনে মেয়েরা কোনও কাজ করে না। স্কুল-কলেজ ও অফিস-আদালতে মেয়েদের জন্য ছুটি থাকে সেদিন।
মস্কোতে শিশুকে নিয়ে বাবার হাঁটাহাঁটিশিশুদের প্রতি ভালোবাসা জগতজুড়েই। রুশ জাতিও ব্যতিক্রম নয়। তবে এখানকার মেয়েদের মধ্যে মা হওয়ার আকাঙ্ক্ষা বেশি। তারা ক্যারিয়ার নিয়ে যতটা যত্নশীল, সন্তান নেওয়ার ক্ষেত্রেও ততই আগ্রহ দেখা যায়। পথে-ঘাটে, পার্কে সবখানে প্যারম্বুলেটরে (শিশুবহনের ট্রলি) বাচ্চা নিয়ে ঘুরতে দেখা যায় এখানকার বাবা-মা ও দাদা-দাদীকে। শিশুগুলো যেন পুতুলের মতো দেখতে! ঠাণ্ডায় জমে শক্ত হয়ে বসে থাকে আর গাল দুটো লাল রঙের টমেটো রূপ ধারণ করে ওদের।
মস্কোতে বিভিন্ন বয়সীদের ঘুরে বেড়ানোরুশদের বিড়াল আর কুকুর প্রেমও চোখে পড়ার মতো। এখানকার কুকুরগুলোর ভাগ্য সুপ্রসন্ন বলা চলে। কুকুরগুলোকে রীতিমতো জামা-কাপড় পরিয়ে সকাল-বিকাল দু’বেলা হাঁটতে বের হন মনিব। এখানে এটি নিয়মিত চিত্র। ভোর চারটায়ও দেখেছি তুষারপাতের মধ্যেও কুকুর নিয়ে বেরিয়ে বাইরে হাঁটছেন অনেকে। কুকুরগুলোরও সেইরকম ভাব!
মস্কোর লেকে হাঁসএখানে পার্কের লেকে হাঁস দলবেঁধে নির্ভাবনায় সাঁতার কাটে। পথিকেরা ভালোবেসে তাদের জন্য রুটিসহ বিভিন্ন খাবার ছিটিয়ে দিয়ে যান।
পার্কের গাছগুলোতে পাখির বিশ্রামের জন্য গাছে গাছে ছোট্ট নীড় বাঁধা। সেখানে কৌটা বেঁধে পানি দেওয়া থাকে। কারণ বরফ এড়িয়ে পাখি এসে যেন এখানে বসে সময় কাটাতে পারে। এমন রূপকথার মতো আপ্যায়ন দেখে মনে হয় এলিসের ওয়ান্ডারল্যান্ডে চলে এসেছি! পশু-পাখির জন্য এমনটি আমরা ক’জনই ভাবতে পারি?
মস্কোর পার্কে পাখির বিশ্রামের জন্য ছোট্ট নীড়রুশদের সঙ্গে এখানকার রোদ আর ফুরফুরে মেজাজ আমিও উপভোগ করছি। তাদের মতো করেই গ্রীষ্মের আশায় দিন গুনছি। গ্রীষ্ম মানেই এখানে ছুটি। সমস্ত কাজ থেকে ছুটি নিয়ে যার যার পরিবারের সঙ্গে বনভোজন, ডাচা (গ্রীষ্মের উপযোগী বাড়ি), জঙ্গলে বারবিকিউ আর হৈহুল্লোড়ে মেতে থাকেন সবাই। মস্কোতে সামনের দিনগুলোতে আমার জন্য কেমন উপহার অপেক্ষা করছে দেখা যাক। আজকের মতো সবাইকে ‘দোব্রে নচিও’ অর্থাৎ ‘শুভ রাত্রি’।