খাগড়াছড়ি জেলা ও পুলিশ প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, গত ১৫ ডিসেম্বর থেকে পর্যটক সমাগম হচ্ছে। নতুন কিছু পর্যটন স্পট যুক্ত হওয়া এবং বিভিন্ন স্থাপনার উন্নয়নের সুবাদে এই সংখ্যা বেড়েছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। একইসঙ্গে হাজার হাজার লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। প্রায় এক লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পর্যটন শিল্পের ওপর নির্ভরশীল বলে মনে করে প্রশাসন।
হোটেল ব্যবসায়ী স্বপন চন্দ্র দেবনাথ বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, পুরনো পর্যটন স্পটগুলোর পাশাপাশি গত একদশকে নতুনভাবে ২০-২৫টিসহ প্রায় অর্ধশতাধিক স্থান যুক্ত হয়েছে জেলায়। দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্য প্রায় প্রতিটি উপজেলায় বিভিন্ন মনোরম স্থানকে আকর্ষণীয়ভাবে সাজানো হয়েছে।
জানা যায়, জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের পাশাপাশি ব্যক্তিগত উদ্যোগেও গড়ে উঠেছে বিভিন্ন পর্যটন স্পট। এসব স্থানকে কেন্দ্র করে খাগড়াছড়ি ও সাজেকে গড়ে উঠেছে দুই শতাধিক সরকারি-বেসরকারি হোটেল-মোটেল, গেস্টহাউস ও অতিথিশালা। এছাড়া চালু হয়েছে প্রায় ২০০-৩০০ ছোট-বড় রেস্তোরাঁ।
বেসরকারি হোটেল গাইরিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও হোটেল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অনন্ত বিকাশ ত্রিপুরা বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ডিসেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত খাগড়াছড়ি ও সাজেকে প্রচুর পর্যটক আসেন। এসব মাসের বেশিরভাগ দিন হোটেল পূর্ণ থাকে। পর্যটকদের জন্য তাদের হোটেলে স্থানীয় বিভিন্ন সুস্বাদু খাবার রাখা হয়। এছাড়া কেউ চাইলে নির্ধারিত ফি দিয়ে স্থানীয় শিল্পীদের ঐতিহ্যবাহী নাচ-গান উপভোগ করতে পারেন।
বিপুলসংখ্যক মানুষ বেড়াতে আসায় গাড়ি ব্যবসায়ী, রেস্তোরাঁ ও বিভিন্ন পণ্য-সামগ্রীর দোকানিরা লাভবান হচ্ছেন। রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী পেয়ার আহমেদের মন্তব্য, পর্যটক সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় তাদের মতো লাভবান হচ্ছেন কৃষকেরা। খাগড়াছড়িতে আগে অনেক কৃষিজ পণ্য, ফল-ফলাদি পঁচে যেতো উল্লেখ করে তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এখন কৃষকদের উৎপাদিত পণ্য আর নষ্ট হয় না। কারণ পর্যটকরা এসব কৃষিজ পণ্য ব্যবহার করায় কৃষকেরা ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন ও স্বাবলম্বী হচ্ছেন।’
বেসরকারি রেস্তোরাঁ স্বপ্নচূড়ার মালিক ও নারী উদ্যোক্তা নেইম্রা মারমা বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, তার হোটেলে এখন গড়ে দুই-তিনশ’ স্থানীয় ও বাইরের অতিথি আসেন। ফলে ব্যবসা ভালো যাচ্ছে উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন পর্যটন শিল্পের বিকাশে শত শত খাবারের হোটেল ও রেস্তোরাঁ গড়ে উঠেছে। পর্যটকদের নিরাপদ খাবার নিশ্চিতে হোটেল মালিকেরা সবসময় সজাগ আছেন।
খাগড়াছড়ি পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি মাহবুবুল আলম বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, ডিসেম্বরে খাগড়াছড়িতে গড়ে ৬০-৭০ হাজার পর্যটক এসেছেন। ফলে পর্যটন সংশ্লিষ্টরা লাভবান হচ্ছেন বলে মন্তব্য তার। পরিবহন খাতেও কর্মসংস্থান বেড়েছে। তিনি নিশ্চিত করেন, দেশি-বিদেশি পর্যটকদের বিভিন্ন স্পটে যাতায়াতের সুবিধার্থে পর্যাপ্ত যানবাহন রয়েছে। আরও কিছু অত্যাধুনিক যানবাহন আনার পরিকল্পনা আছে তাদের।
পর্যটকদের জন্য কয়েকশ’ অস্থায়ী দোকানপাট আছে খাগড়াছড়িতে। এগুলোতে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত কাপড়, শার্ট, পাঞ্জাবি, পিনন, পাহাড়ি পোশাক বিক্রি হয়। এছাড়া ডাব, পেঁপে, কলা, তেঁতুলসহ বিভিন্ন ফলের দোকানগুলোতে ভিড় দেখা যায় তাদের। অনেক পর্যটন স্পটে রয়েছে অস্থায়ী ফলের জুসের স্টল।
খাগড়াছড়ি মিনি সুপার মার্কেটের সাধারণ সম্পাদক নজির আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পর্যটকদের সুবাদে খাগড়াছড়িতে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটছে। তারা স্থানীয়ভাবে তৈরি কাপড় কেনেন। মেয়েদের মধ্যে পাহাড়ি নারীদের বানানো থামী, পিনন, ব্লাউজ, কাঠের তৈরি বিভিন্ন শো-পিসের ব্যাপক চাহিদা।’
জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এমএম সালাহ উদ্দিনের মন্তব্য, পাহাড়ের ছড়াছড়িতে খাগড়াছড়ির সর্বত্র সবুজাভ আবহ। সেই সঙ্গে পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে যাওয়া চেঙ্গী, মাইনি ও ফেনী নদী খাগড়াছড়িকে সাজিয়েছে অপরূপ সাজে। চারদিকে অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সবুজ পাহাড়, ঝরনা, প্রাকৃতিক লেক, কৃত্রিম লেক এবং ক্ষুদ্র-ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর বৈচিত্র্যময় জীবন-সংস্কৃতির জন্য পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় এই জেলা।
সদর উপজেলার হর্টিকালচার পার্ক, আলুটিলার প্রাকৃতিক গুহা, হেরিটেজ পার্ক, শতবর্ষী বিশ্বশান্তি রাজ মহামুনি বৌদ্ধ চৈত্য বিহার, আলুটিলা বৌদ্ধ বিহার, কৃষি গবেষণা কেন্দ্র, দশবল বৌদ্ধ বিহার, চেংগী নদীর তীরবর্তী বিভিন্ন স্থাপনা, মাটিরাঙার শতবর্ষী বটগাছ, উপজেলা প্রশাসন লেক জলপাহাড়, ভগবান টিলা, রিছাং ঝরনা, মহালছড়ির মনারটেক লেক, দেবতার পুকুর, মানিকছড়ির বনলতা অ্যাগ্রো প্রাইভেট, পুরনো রাজবাড়ি, পানছড়ির অরণ্য কুঠির, মায়াবিনী লেক, রাবার ড্যাম, রামগড়ের কৃত্রিম লেক, চা বাগান, কলসী মুখ, বিজিবি’র ভাস্কর্য, দীঘিনালার হাজাছড়া-তৈদুছড়া ঝরনাসহ শতাধিক মনোরম পর্যটন স্পট রয়েছে খাগড়াছড়িতে। দেশ-বিদেশের পর্যটকদের আকর্ষণ করতে নতুন সাজে সাজানো হয়েছে এগুলো। জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মনে করেন, ঝরনা, উঁচু-নিচু পাহাড়, অবারিত পাহাড়ের সবুজ উপত্যকা দেখে মন ভরে যায় ভ্রমণপ্রেমীদের।
জেলা প্রশাসক প্রতাপ চন্দ্র বিশ্বাসের মন্তব্য, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগের জন্য খাগড়াছড়ি চমৎকার জায়গা। তাই পর্যটকদের নিশ্চিন্তে ও নির্ভয়ে খাগড়াছড়িতে ভ্রমণের আমন্ত্রণ জানান তিনি। তার তথ্যানুযায়ী, জেলায় পর্যটন স্পট বৃদ্ধি ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের পরিকল্পনা আছে সরকারের। জেলা প্রশাসকের ভাষ্য, ‘জাতীয় বাজেটে জেলাভিত্তিক উন্নয়নের খাত হিসেবে পর্যটনকে নির্ধারণ করা হয়েছে। খাগড়াছড়িতে অসাধারণ কিছু পর্যটন স্পট আছে। এগুলোকে আরও আকর্ষণীয় করে সাজানো হবে।’
খাগড়াছড়ি ও সাজেকে সবকিছুতে সেবার দাম বেশি বলে মন্তব্য কয়েকজন পর্যটকের। তাদের অভিযোগ, ১৫ দিন আগে বুকিং দিতে চাইলেও হোটেল ফাঁকা পাওয়া যায় না। তাই জেলায় আরও হোটেল-মোটেল দরকার বলে মনে করেন তারা। একইসঙ্গে পর্যটন স্পট বৃদ্ধি ও নিরাপদ পরিবেশ বজায় রাখা প্রয়োজন বলে মন্তব্য তাদের।
বর্তমানে জেলার নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভালো বলে দাবি করেন খাগড়াছড়ির পুলিশ সুপার মো. আহমারউজ্জামান। প্রতিদিন খাগড়াছড়ির পর্যটন স্পটগুলোতে প্রচুর পর্যটক আসছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘পর্যটকদের সার্বিক নিরাপত্তায় পর্যটন পুলিশসহ ডিবি ও সাদা পোশাকে পুলিশ সার্বক্ষণিক নজর রাখছে। কেউ চাইলে তাকে ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য শর্তসাপেক্ষে ট্যুরিস্ট পুলিশ দেওয়া হবে।’
খাগড়াছড়িকে এখন পর্যটন নগরী মনে করেন জেলার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি ও খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কংজরী চৌধুরী। তার মন্তব্য, বিপুলসংখ্যক পর্যটকের সুবাদে সব ধরনের ব্যবসায়ীরা লাভবান হচ্ছেন। তিনি উল্লেখ করেন, প্রতিটি উপজেলায় নতুন নতুন পর্যটন স্পট গড়ে তোলা হচ্ছে। তার কথায়, ‘পর্যটন স্পটগুলোতে অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধা রাখার পাশাপাশি পর্যটকদের থাকার জন্য আবাসিক হোটেল-মোটেলের সংখ্যা বৃদ্ধি করা হবে। ফলে খাগড়াছড়িতে বসেই স্থানীয়, জাতীয় বা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ব্যবসা পরিচালনা করা যাবে।’