মরুভূমির বুকে দাঁড়িয়ে থাকা বিশালাকার পাথরের স্তূপ নয়, গিজার পিরামিড আসলে সময়কে পরাজিত করার এক অনন্য মানবিক প্রচেষ্টা। চার হাজার ছয়শ’ বছরেরও বেশি সময় ধরে সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত, ঝড়-বৃষ্টি, সাম্রাজ্যের উত্থান-পতন আর সভ্যতার পরিবর্তনের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এই স্থাপত্য। পৃথিবীর প্রাচীন সপ্তাশ্চর্যের মধ্যে একমাত্র টিকে থাকা এই বিস্ময়কে দেখে অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে—এটি কি চিরকাল এমনই থাকবে?
এর সহজ উত্তর হলো—না। তবে সেই পরিবর্তন এত ধীর যে মানুষের একটি জীবদ্দশায় তা প্রায় চোখেই পড়ে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পিরামিডের সবচেয়ে বড় শত্রু হলো সময়। মরুভূমির শুষ্ক বাতাস, বালুঝড়, দিন-রাতের তাপমাত্রার ওঠানামা এবং পাথরের স্বাভাবিক ক্ষয় প্রতিনিয়ত এর গায়ে অদৃশ্য ক্ষতের রেখা এঁকে যাচ্ছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সেই সামান্য ক্ষয়ই ধীরে ধীরে দৃশ্যমান রূপ নেয়।
একসময় গিজার মহাপিরামিডের উচ্চতা ছিল প্রায় ১৪৬ দশমিক ৬ মিটার। বর্তমানে সেটি নেমে এসেছে প্রায় ১৩৮ দশমিক ৮ মিটারে। এর প্রধান কারণ, বাইরের মসৃণ সাদা চুনাপাথরের আবরণ এবং শীর্ষের অংশ ক্যাপস্টোন বহু আগেই হারিয়ে গেছে। ইতিহাসবিদদের মতে, মধ্যযুগে কায়রোর বিভিন্ন মসজিদ, দুর্গ ও অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণে সেই মূল্যবান আবরণ-পাথরের বড় একটি অংশ পুনর্ব্যবহার করা হয়েছিল। ফলে আজ যে খাঁজকাটা পাথরের স্তর আমরা দেখি, সেটিই মূল কাঠামোর অভ্যন্তরীণ অংশ।
প্রকৃতিও পিরামিডকে ছাড় দেয়নি। হাজার বছরের ভূমিকম্প, প্রবল বাতাস, বালুঝড় এবং জলবায়ুর দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন ধীরে ধীরে এর স্থায়িত্বকে প্রভাবিত করেছে। তবু বিস্ময়কর বিষয় হলো, অসাধারণ প্রকৌশল দক্ষতায় নির্মিত এই স্থাপত্য এখনও দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে আছে। কীভাবে এত বিশাল পাথরের ব্লক এত নিখুঁতভাবে স্থাপন করা হয়েছিল, তা নিয়ে আজও গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন প্রকৌশলী ও প্রত্নতাত্ত্বিকরা।
তবে বর্তমানে প্রকৃতির পাশাপাশি মানুষের উপস্থিতিও নতুন এক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। প্রতি বছর লাখো পর্যটকের পদচারণা, যানবাহনের দূষণ, আশপাশের নগরায়ণের বিস্তার এবং অনিয়ন্ত্রিত স্পর্শ বা আরোহনের মতো কর্মকাণ্ড পিরামিডের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। এ কারণেই মিসর সরকার ও প্রত্নতত্ত্ববিদরা দীর্ঘদিন ধরে সংরক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। পর্যটকদের জন্য নির্দিষ্ট চলাচলের পথ, নিয়মিত কাঠামোগত পর্যবেক্ষণ এবং ক্ষয়রোধে আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির ব্যবহার এখন সংরক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তাহলে গিজার পিরামিড আর কতদিন টিকে থাকবে
এর সুনির্দিষ্ট উত্তর কারও জানা নেই। তবে প্রত্নতত্ত্ববিদদের ধারণা, যদি বড় কোনও ভূমিকম্প, চরম প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা মানবসৃষ্ট ধ্বংসযজ্ঞ না ঘটে, তাহলে গিজার পিরামিড আরও কয়েক হাজার বছর, এমনকি দশ হাজার বছর বা তারও বেশি সময় টিকে থাকতে পারে। তবে সেই পিরামিড আজকের মতো থাকবে না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্ষয় হবে, রং বদলাবে, কিছু পাথর আলগা হবে। কিন্তু সম্ভবত তার অস্তিত্ব টিকে থাকবে মানুষের মেধা, শ্রম ও স্থাপত্যকুশলতার এক অমর সাক্ষী হয়ে।