পানির ওপর ভাসছে ছোট ছোট নৌকা। এক নৌকা ভর্তি টাটকা পেয়ারা, আরেকটিতে আমড়া, কোথাও আবার কাঁচা কলা। চারপাশে সবুজে ঘেরা খাল, দুই ধারে সারি সারি পেয়ারা বাগান। এমন মনোমুগ্ধকর দৃশ্যের দেখা মিলবে বরিশাল বিভাগের ঝালকাঠির ভিমরুলির ভাসমান পেয়ারা বাজারে। প্রকৃতির সৌন্দর্য আর গ্রামীণ জীবনের অনন্য মেলবন্ধনের কারণে এটি দেশের অন্যতম জনপ্রিয় ভ্রমণ গন্তব্য।
এশিয়ার অন্যতম বড় ভাসমান পেয়ারা বাজার
ঝালকাঠি জেলা শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে ভিমরুলি গ্রামে বসে দেশের সবচেয়ে বড় ভাসমান পেয়ারা বাজার। বরিশাল, ঝালকাঠি ও পিরোজপুরের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে গড়ে উঠেছে এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ পেয়ারা বাগান, যার প্রাণকেন্দ্র এই ভাসমান বাজার।
তিন দিক থেকে আসা খালের মোহনায় প্রতিদিন ছোট ছোট ডিঙ্গি নৌকায় করে চাষিরা নিয়ে আসেন টাটকা পেয়ারা। বড় ইঞ্জিনচালিত নৌকায় এসে আড়তদাররা সেই পেয়ারা কিনে নিয়ে যান দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। শুধু পেয়ারাই নয়, মৌসুমে আমড়া, কাঁচা কলাসহ বিভিন্ন ফলও পাওয়া যায় এখানে।
নৌকায় ভেসে সবুজের রাজ্যে
ভিমরুলির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো নৌকাভ্রমণ। স্বচ্ছ পানির খাল ধরে ছোট ডিঙ্গি নৌকায় এগিয়ে যেতে যেতে দুই পাশে চোখে পড়বে সবুজ পেয়ারা বাগান। কোথাও গাছের ডাল খালের পানির ওপর ঝুঁকে আছে, কোথাও হাত বাড়ালেই ছুঁয়ে ফেলা যায় টাটকা পেয়ারা বা আমড়া।
খালের ধারে ছোট ছোট ঘর, কাঠের সেতু, স্কুল আর গ্রামের শান্ত পরিবেশ ভ্রমণকে করে তোলে আরও উপভোগ্য। বর্ষার দিনে চারপাশে পানির প্রাচুর্য আর সবুজ প্রকৃতির সৌন্দর্য যেন আরও কয়েক গুণ বেড়ে যায়।
সেতু থেকে দেখা যায় পুরো বাজার
ভাসমান বাজারের উত্তর পাশে একটি সেতু রয়েছে। এই সেতু থেকে পুরো বাজারের ব্যস্ততা, খালে ভাসমান অসংখ্য নৌকা এবং চারপাশের সবুজ প্রকৃতি একসঙ্গে উপভোগ করা যায়। ছবি তোলার জন্যও এটি একটি আদর্শ জায়গা।
কখন যাবেন
জুলাই ও আগস্ট মাস পেয়ারার মৌসুম। এ সময় বাজার সবচেয়ে প্রাণবন্ত থাকে। দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৩টার মধ্যে সবচেয়ে বেশি কেনাবেচা হয়। তাই এই সময়ের মধ্যে বাজারে পৌঁছালে ভাসমান বাজারের আসল রূপ দেখা যায়। তবে ছুটির দিনে পর্যটকের ভিড় তুলনামূলক বেশি থাকে।
ঘুরে দেখতে পারেন আটঘর কুড়িয়ানা
ভাসমান বাজারে যাওয়ার পথে আটঘর কুড়িয়ানা এলাকার পেয়ারা বাগান ও পেয়ারা পার্কও ঘুরে দেখতে পারেন। এখানে একটি ওয়াচ টাওয়ার রয়েছে, যেখান থেকে চারপাশের সবুজ পেয়ারা বাগানের মনোরম দৃশ্য দেখা যায়।
পার্কে প্রবেশমূল্য জনপ্রতি ৩০ টাকা। ভেতরে যত খুশি পেয়ারা খেতে পারবেন, তবে বাইরে নিয়ে আসা যাবে না। অবশ্যই বাগানের কোনো ক্ষতি করবেন না।
কীভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে বাস বা লঞ্চে সহজেই বরিশাল যাওয়া যায়।
বাসে গেলে পদ্মা সেতু হয়ে প্রায় ৩ থেকে ৪ ঘণ্টায় বরিশাল পৌঁছানো যায়। ভাড়া বাসের ধরন অনুযায়ী প্রায় ৫০০ থেকে ১,২০০ টাকা।
লঞ্চে যেতে চাইলে সদরঘাট থেকে প্রতিদিন রাতের লঞ্চ ছেড়ে যায়। সকালে বরিশাল পৌঁছে সেখান থেকে চৌমাথা হয়ে লেগুনা বা সিএনজিতে আটঘর ট্রলারঘাট যেতে হবে। এরপর ইঞ্জিনচালিত নৌকা বা ডিঙ্গি নৌকায় করে ভাসমান পেয়ারা বাজারে পৌঁছানো যায়।
কী খাবেন
ভিমরুল বাজারে বৌদির হোটেল স্থানীয়দের কাছে বেশ পরিচিত। এখানে ভাত, মাছ, মাংস, সবজি, ডাল এবং ঝালকাঠির বিখ্যাত গুঠিয়ার সন্দেশ খেতে পারেন।
বরিশাল শহরে গেলে সকাল-সন্ধ্যার লুচি-সবজি, সরমালাই, হকের রসমালাই, নিতাই মিষ্টি ভান্ডারের মিষ্টি কিংবা শশীর মিষ্টির স্বাদও নিতে পারেন।
কোথায় থাকবেন
ঝালকাঠি শহরে কম খরচে থাকার জন্য কয়েকটি বোর্ডিং রয়েছে। আর উন্নত মানের আবাসিক হোটেলে থাকতে চাইলে বরিশাল শহরে বিভিন্ন মানের হোটেল পাওয়া যায়।
ভ্রমণে কিছু পরামর্শ
- খাল বা আশপাশে কোনও ধরনের ময়লা ফেলবেন না।
- সাঁতার না জানলে নৌকায় লাইফ জ্যাকেট ব্যবহার করুন।
- নৌকা ভাড়া করার আগে দরদাম করে নিন।
- বাগানে ঢোকার আগে মালিকের অনুমতি নিন।
- স্থানীয় মানুষ ও মাঝিদের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ করুন।
- দলবেঁধে গেলে ভ্রমণ খরচ তুলনামূলক কম হয়।
ভিমরুলির ভাসমান পেয়ারা বাজার শুধু একটি বাজার নয়, এটি বাংলার জলজ জীবন, গ্রামীণ সংস্কৃতি আর প্রকৃতির এক অনন্য রূপ। খালের বুকে নৌকায় ভেসে তাজা পেয়ারার সুবাস, চারপাশের সবুজ আর গ্রামের শান্ত পরিবেশ সব মিলিয়ে এটি এমন একটি ভ্রমণ, যা প্রকৃতিপ্রেমীদের মনে দীর্ঘদিন রয়ে যাবে। জুলাই-আগস্টের পেয়ারার মৌসুমে একদিন সময় করে ঘুরে আসতে পারেন এই অনন্য ভাসমান বাজার থেকে।