ঐতিহ্যবাহী তকমা পেয়েও যে স্থান পর্যটকশূন্য

ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে শত শত বছর ধরে দাঁড়িয়ে আছে রাজস্থানের গাগরণ দুর্গ। তিন দিক থেকে দুই নদী ঘিরে রেখেছে এই প্রাচীন দুর্গকে। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, যেন কোনও দ্বীপের ওপর গড়ে উঠেছে বিশাল এই স্থাপত্য। ২০১৩ সালে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যের তালিকায় জায়গা পেলেও এখনও পর্যটকদের ভিড়ে মুখর হয়ে ওঠেনি গাগরণ। বরং নীরবে, একাকী নিজের ইতিহাস বয়ে চলেছে দুর্গটি।

রাজস্থানের জনপ্রিয় দুর্গগুলোর তালিকায় জয়পুর, যোধপুর, চিতোর বা রণথম্ভোরের নাম যতটা পরিচিত, গাগরণ দুর্গ ততটাই আড়ালে। এর অন্যতম কারণ, দুর্গটির অবস্থান রাজ্যের বড় শহরগুলোর মূল পর্যটনপথ থেকে কিছুটা দূরে। রাজস্থানের ঝালাওয়ার জেলায় অবস্থিত এই দুর্গটি কোটা শহর থেকে প্রায় ৮৫ কিলোমিটার দূরে।

নদী ও পাথরের ওপর গড়া অনন্য দুর্গ

গাগরণ দুর্গের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য এর অবস্থান। আহু ও কালীসিন্ধ—এই দুই নদী তিন দিক থেকে দুর্গটিকে ঘিরে রেখেছে। বর্ষায় নদীর জল বেড়ে গেলে অনেক সময় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। প্রকৃতিই যেন একসময় এই দুর্গের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হয়ে উঠেছিল।

রাজস্থানের অন্য অনেক দুর্গ পাহাড়ের চূড়ায় বা মরুভূমির মাঝে তৈরি হলেও গাগরণ দুর্গ গড়ে উঠেছে পাথরের ওপর। সময়ের সঙ্গে দুর্গের দেয়াল ও প্রাচীরের ফাঁকে জন্মেছে গাছপালা। পাথরের ধূসর রং আর সবুজের মেলবন্ধনে তৈরি হয়েছে এক অন্যরকম দৃশ্য।

যুদ্ধের ইতিহাস বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে

গাগরণ দুর্গের ইতিহাস বহু পুরোনো। ধারণা করা হয়, দ্বাদশ শতকে রাজপুত শাসক বিজলদেব সিং ডোড়ের হাত ধরে দুর্গ নির্মাণের সূচনা হয়। যদিও এর আগে এই এলাকায় দুর্গ থাকার কথাও কিছু ইতিহাসবিদ উল্লেখ করেছেন।

পরবর্তীতে ডোড় রাজপুতদের পর দুর্গের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় খিচি চৌহানদের হাতে। বহু আক্রমণ ও যুদ্ধের সাক্ষী এই দুর্গ। শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করতে তৈরি করা হয়েছিল শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।

গভীর পরিখা, বিশাল প্রবেশদ্বার, প্রশস্ত দেয়াল এবং ত্রিস্তরীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা গাগরণ দুর্গকে করেছিল দুর্ভেদ্য। দুর্গের ভিতরে রয়েছে ভৈরব পোল, সূরজ পোলসহ একাধিক ঐতিহাসিক প্রবেশদ্বার। রয়েছে মন্দির, রাজদরবার এবং রাজপরিবারের স্মৃতিবাহী নানা স্থাপনা।

কেন ঘুরে আসবেন গাগরণ দুর্গে

যারা ভিড় এড়িয়ে ইতিহাস ও স্থাপত্য উপভোগ করতে চান, তাদের জন্য আদর্শ জায়গা হতে পারে গাগরণ দুর্গ। রাজস্থানের অন্যান্য জনপ্রিয় দুর্গের মতো এখানে পর্যটকের ভিড় নেই। তাই নিরিবিলি পরিবেশে কয়েক ঘণ্টা ধরে দুর্গ ঘুরে দেখা যায়।

দুর্গটি ভালোভাবে দেখতে প্রায় ৪-৫ ঘণ্টা সময় হাতে রাখা ভালো। শরৎ ও শীতকাল ভ্রমণের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত সময়।

আশপাশে কী দেখবেন

ঝালাওয়ারে গাগরণ দুর্গ ছাড়াও রয়েছে গড় প্যালেস ও একটি জাদুঘর। ঘুরে দেখা যায় ঐতিহাসিক চন্দ্রভাগা মন্দিরও। ইতিহাসপ্রেমীদের জন্য এই অঞ্চলটি বেশ আকর্ষণীয়।

কোথায় থাকবেন

গাগরণ দুর্গের খুব কাছে থাকার ব্যবস্থা নেই। তবে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরের ঝালাওয়ার শহরে সরকারি ও বেসরকারি হোটেল পাওয়া যায়। চাইলে কোটা শহরেও থাকা যেতে পারে।

কীভাবে যাবেন

বাংলাদেশ থেকে প্রথমে দিল্লি, এরপর সেখান থেকে ঝালাওয়ার যেতে প্রায় ৮-৯ ঘণ্টার সড়কপথ। ট্রেনে গেলে কোটা স্টেশনে নেমে সেখান থেকে গাড়িতে প্রায় ৮৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হবে। কোটা শহরে বিমানবন্দরও রয়েছে।

নদীঘেরা, ইতিহাসে ভরপুর এবং পর্যটকের ভিড় থেকে দূরে থাকা গাগরণ দুর্গ যেন রাজস্থানের এক লুকিয়ে থাকা রত্ন, যেখানে গেলে দেখা মিলবে অতীতের সঙ্গে একান্ত আলাপের সুযোগ।