উটি নয়, বর্ষায় নীলগিরির নিরিবিলি ঠিকানা কোটাগিরি

বর্ষা মানেই চিরসবুজের আহ্বান। প্রকৃতির শ্যামলিমা উপভোগের আদর্শ ঠিকানা হতে পারে তামিলনাড়ুর নীলগিরি পাহাড়। পশ্চিমঘাট পর্বতমালার অংশ এই পাহাড় হিমালয়ের মতো সুউচ্চ না হলেও, সবুজে মোড়া তার সৌন্দর্য পর্যটকদের বারবার টেনে আনে।

নীলগিরি জেলার উটি বরাবরই জনপ্রিয় পাহাড়ি পর্যটনকেন্দ্র। পাহাড়ের সৌন্দর্যের পাশাপাশি শহরজুড়ে রয়েছে একাধিক ভিউ পয়েন্ট, চা-বাগান, হ্রদ ও পাইনবন। বর্ষায় মেঘ-কুয়াশায় মোড়া উটির রূপ আরও মায়াবী হয়ে ওঠে। তবে জনপ্রিয়তার কারণে পর্যটকের ভিড়ও থাকে বেশি।

তাই বর্ষায় একটু নিরিবিলি পাহাড়ের স্বাদ পেতে চাইলে গন্তব্য হতে পারে কোটাগিরি। কোয়েম্বত্তূর থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার এবং উটি থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে নীলগিরির এই পাহাড়ি শহরটি এখনও তুলনামূলকভাবে কম পরিচিত। পাহাড়ি ঝরনা, চা-বাগান, কুয়াশা আর সবুজ উপত্যকার মাঝে এখানে প্রকৃতিকে অনেকটা নির্জনেই উপভোগ করা যায়।

পাহাড়ের সৌন্দর্যের পাশাপাশি শহরজুড়ে রয়েছে একাধিক চা-বাগান। ছবি: সংগৃহীত

উটি নয়, কোটাগিরি কেন?

উটির সৌন্দর্য নিয়ে প্রশ্ন নেই। ঐতিহ্যবাহী নীলগিরি মাউন্টেন রেলওয়ের টয় ট্রেনও পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ। কিন্তু জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র হওয়ায় রোজ় গার্ডেন, বটানিক্যাল গার্ডেন কিংবা ডোড্ডাবেট্টা ভিউ পয়েন্টে ভিড় এড়ানো কঠিন। বর্ষাকালেও পর্যটকদের আনাগোনা থাকে চোখে পড়ার মতো।

অন্যদিকে কোটাগিরি অনেকটাই শান্ত। চা-বাগানে ঘেরা পাহাড়ি রাস্তা, ঝরনা আর মেঘ-কুয়াশায় ঢাকা উপত্যকা বর্ষার আবহকে করে তোলে আরও মনোরম। নিরিবিলিতে পাহাড় উপভোগ করতে চাইলে তাই উটির তুলনায় কোটাগিরি হতে পারে আকর্ষণীয় বিকল্প।

জনপ্রিয়তার কারণে পর্যটকের ভিড়ও থাকে বেশি। ছবি: সংগৃহীত।

কোডনাড ভিউ পয়েন্ট

কোটাগিরির অন্যতম জনপ্রিয় দর্শনীয় স্থান কোডনাড ভিউ পয়েন্ট। শহর থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরের এই জায়গা থেকে দেখা যায় সবুজ পাহাড়, বিস্তীর্ণ উপত্যকা, নদী এবং ভবানীসাগর বাঁধের মনোরম দৃশ্য। বর্ষায় মেঘ ও কুয়াশার চাদরে মোড়া চারপাশের দৃশ্য যেন আরও জীবন্ত হয়ে ওঠে।

ক্যাথরিন জলপ্রপাত

জঙ্গলের গভীরে প্রায় ২৫০ ফুট উপর থেকে নেমে এসেছে ক্যাথরিন জলপ্রপাত। প্রধান সড়ক থেকে চা-বাগানের মধ্য দিয়ে পথ ধরে এগোতে হয়। ট্রেকিংপ্রেমীদের কাছে জলপ্রপাতের পথে এই যাত্রাও হতে পারে আলাদা অভিজ্ঞতা। বর্ষায় জলপ্রপাতের রূপ আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।

বর্ষায় মেঘ-কুয়াশায় মোড়া উটির রূপ আরও মায়াবী হয়ে ওঠে। ছবি: সংগৃহীত।

জন সুলিভান মেমোরিয়াল

কোটাগিরি থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে কন্নেরীমুক্কু গ্রামে রয়েছে জন সুলিভান মেমোরিয়াল। ১৮১৯ সালে নীলগিরি অঞ্চলের আধুনিক রূপকার হিসেবে পরিচিত ব্রিটিশ সিভিল সার্ভেন্ট জন সুলিভান এই বাড়িটি তৈরি করেছিলেন। বর্তমানে এখানে নীলগিরির স্থানীয় টোডা জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি এবং ব্রিটিশ আমলের ইতিহাসের নানা নিদর্শন সংরক্ষিত রয়েছে।

লংউড শোলা সংরক্ষিত বনাঞ্চল

প্রকৃতিপ্রেমী ও পাখিপ্রেমীদের জন্য লংউড শোলা সংরক্ষিত বনাঞ্চল হতে পারে আকর্ষণীয় গন্তব্য। শহরের কাছেই এই বনাঞ্চলের শান্ত পরিবেশে হাঁটতে হাঁটতে দেখা মিলতে পারে নানা প্রজাতির পাখি ও বন্যপ্রাণীর। তবে বনাঞ্চলে প্রবেশের ক্ষেত্রে বন বিভাগের অনুমতি প্রয়োজন হতে পারে।

কোটাগিরির আশপাশে আরও রয়েছে এল্ক জলপ্রপাত ও রঙ্গস্বামী পিক। তবে এই পাহাড়ি শহরের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ বিস্তীর্ণ চা-বাগান। মাইলের পর মাইল সবুজ চা-বাগানের দৃশ্য বর্ষায় যেন আরও সতেজ হয়ে ওঠে। স্থানীয় খাবার, কেক, পেস্ট্রি ও চকলেটও পর্যটকদের কাছে বেশ জনপ্রিয়।

কীভাবে যাবেন

কলকাতা থেকে বিমানপথে বেঙ্গালুরু বা কোয়েম্বত্তূর পৌঁছে সেখান থেকে সড়কপথে কোটাগিরি যাওয়া যায়। ট্রেনে চেন্নাই পৌঁছে নীলগিরি এক্সপ্রেসে মেট্টুপালয়ম যাওয়া যায়। মেট্টুপালয়ম থেকে কোটাগিরির দূরত্ব প্রায় ৩৩ কিলোমিটার। সেখান থেকে গাড়িতে সহজেই পৌঁছনো যায় পাহাড়ি শহরটিতে।

কোথায় থাকবেন

কোটাগিরিতে বেশ কয়েকটি হোমস্টে ও রিসর্ট রয়েছে। উটির তুলনায় থাকার জায়গার সংখ্যা কম হলেও নিরিবিলি পরিবেশে কয়েক দিন কাটাতে চাইলে এখানকার হোমস্টেগুলি হতে পারে ভালো বিকল্প।

বর্ষায় নীলগিরির সবুজ পাহাড় দেখতে চাইলে উটির চেনা ভিড়ের বাইরে কোটাগিরি তাই হতে পারে অন্যরকম এক গন্তব্য, যেখানে মেঘ, বৃষ্টি, চা-বাগান আর পাহাড়ি নীরবতা মিলেমিশে তৈরি করে এক শান্ত ভ্রমণ-অভিজ্ঞতা।