ভ্যাম্পায়ার নয়, পাহাড়ি সৌন্দর্যেই মুগ্ধ করবে ট্রান্সিলভানিয়া

ভ্যাম্পায়ার, রহস্যময় দুর্গ আর ড্রাকুলার গল্পের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত রোমানিয়ার ট্রান্সিলভানিয়া এবার পর্যটকদের সামনে তুলে ধরছে তার অন্য এক রূপ। মধ্য রোমানিয়ার হারঘিতা কাউন্টির পাহাড়, বন, আগ্নেয় হ্রদ, ঐতিহ্যবাহী গ্রাম ও বন্যপ্রাণীকে ঘিরে তৈরি হচ্ছে প্রকৃতিনির্ভর ভ্রমণের নতুন আকর্ষণ।

আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কাছে এখনও তুলনামূলক অপরিচিত এই অঞ্চলটি বিশেষ করে পরিবার নিয়ে ভ্রমণের জন্য আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। বিস্তীর্ণ কার্পাথিয়ান বন, পাহাড়ি পথ, শান্ত কেবিন, স্থানীয় খাবার এবং বন্য ভালুক দেখার সুযোগ সব মিলিয়ে প্রচলিত ট্রান্সিলভানিয়ার বাইরে নতুন অভিজ্ঞতা দিতে পারে হারঘিতা।

এ অঞ্চলে ভ্রমণের আরেকটি সুবিধা হলো খরচ। ইতালির ডলোমাইটস কিংবা ফ্রান্স ও সুইজারল্যান্ডের আল্পসের তুলনায় এখানে ছুটি কাটানোর ব্যয় তুলনামূলকভাবে কম। একই সঙ্গে পর্যটকের ভিড়ও কম হওয়ায় প্রকৃতির কাছাকাছি সময় কাটানোর সুযোগ রয়েছে।

হারঘিতা কাউন্টির গুরঘিউ পাহাড়ের কিছু এলাকায় সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১ হাজার ৫৫০ মিটার উচ্চতায় পৌঁছে যায় ভ্রমণপথ। ঘন স্প্রুস, ফার, বিচ ও পাইনবনে ঘেরা এসব এলাকায় শহর কিংবা জনবসতির দেখা মেলে খুব কম।

পাহাড়ি এলাকায় স্থানীয় ঐতিহ্য অনুযায়ী আগুনে গরম করা পাথরের ওপর ট্রাউট মাছ রান্নার অভিজ্ঞতাও পর্যটকদের আকর্ষণ করতে পারে। দূরের পাহাড়ের সারি, বনভূমি এবং নির্জন পরিবেশ মিলিয়ে এসব স্থান প্রকৃতিনির্ভর পর্যটনের জন্য উপযোগী।

হারঘিতার বনাঞ্চলে এখনও ভালুক, নেকড়ে ও লিংক্সের বিচরণ রয়েছে। ফলে প্রকৃতি ও বন্যপ্রাণীপ্রেমীদের কাছেও অঞ্চলটির গুরুত্ব বাড়ছে।

ট্রান্সিলভানিয়ায় ভ্রমণকারীদের অন্যতম পরিচিত গন্তব্য ব্রান দুর্গ। ড্রাকুলার কিংবদন্তির সঙ্গে যুক্ত এই দুর্গকে ঘিরে প্রতিবছর বিপুল পর্যটক সমাগম হয়।

তবে হারঘিতার পথে গেলে সেই ভিড় থেকে অনেকটাই দূরে থাকা যায়। ব্রাশভ থেকে উত্তরের দিকে গাড়িতে এগোলে দ্রুত বদলে যায় দৃশ্যপট। শহরের বদলে চোখে পড়ে খোলা গ্রামাঞ্চল, ঘোড়ায় টানা কৃষকের গাড়ি, পুরোনো গির্জা এবং বিদ্যুতের খুঁটির ওপর বাসা বানানো সাদা সারস।

সানক্রাইয়েনি এলাকায় পর্যটকদের জন্য রয়েছে পাহাড়ি কেবিন ও লজ। এর মধ্যে অর্গানিকল লজ প্রকৃতির মধ্যে থাকার সুযোগ দেয়। কেবিন থেকে হারঘিতা পাহাড়ের দৃশ্য দেখা যায় এবং আশপাশের গ্রামীণ পরিবেশও উপভোগ করা যায়।

হারঘিতার অন্যতম প্রধান পর্যটন আকর্ষণ সেন্ট অ্যান হ্রদ। রোমানিয়ার একমাত্র আগ্নেয় হ্রদ হিসেবে পরিচিত এই জলাশয়টি ঘন বন ও পাহাড়ে ঘেরা। হ্রদের কাছেই রয়েছে মোহশ পিট বগ। বিরল উদ্ভিদ ও জলাভূমির পরিবেশের কারণে এলাকাটি প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণীয়।

জলাভূমি ঘুরে দেখার পর হ্রদে নৌভ্রমণ করা যায়। সবুজ পাহাড়ে ঘেরা শান্ত পানিতে নৌকায় সময় কাটানো এই অঞ্চলের অন্যতম জনপ্রিয় প্রকৃতিনির্ভর অভিজ্ঞতা।

হারঘিতা ইউরোপের উল্লেখযোগ্য ভালুক-সমৃদ্ধ অঞ্চলগুলোর একটি। পর্যটকদের জন্য বন্য ভালুক দেখার নিয়ন্ত্রিত সুযোগও রয়েছে।

মেডভেলেস সেকেইফোল্ড পর্যবেক্ষণকেন্দ্রে খাবারের জন্য আসা ভালুক পর্যবেক্ষণ করা যায়। সেখানে একসঙ্গে একাধিক ভালুক দেখা সম্ভব। তবে বন্য পরিবেশে হঠাৎ ভালুকের দেখা পাওয়ার ঘটনাও ঘটে। বনপথে গাড়ি চালানোর সময় রাস্তার পাশে একটি মা ভালুক ও তার শাবককে দেখা যাওয়ার অভিজ্ঞতা এই অঞ্চলের বন্য প্রকৃতিরই পরিচায়ক।

অবশ্য বন্য ভালুকের কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা না করে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা এবং স্থানীয় গাইডের নির্দেশনা অনুসরণ করাই গুরুত্বপূর্ণ।

প্রকৃতির পাশাপাশি হারঘিতা ভ্রমণে পাওয়া যাবে স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতাও। অঞ্চলটি একসময় অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সাম্রাজ্যের অংশ ছিল। বর্তমানে এখানকার বড় একটি অংশের মানুষ হাঙ্গেরীয় বংশোদ্ভূত সেকেই জনগোষ্ঠীর।

স্থানীয় খাবারেও সেই ঐতিহ্যের প্রভাব রয়েছে। পর্যটকরা গুলাশ ও কুর্তোশকালাচ বা চিমনি কেক-এর মতো খাবার চেখে দেখতে পারেন। বাড়ির সামনে দেখা যায় ঐতিহ্যবাহী কারুকাজ করা কাঠের সেকেই গেট।

হারঘিতায় ভ্রমণের বিশেষত্ব হলো একই সফরে নানা ধরনের অভিজ্ঞতা পাওয়া যায়। পাহাড়ি পথে হাঁটা, বনভ্রমণ, হ্রদে নৌকা চালানো, স্থানীয় খাবার চেখে দেখা, গ্রামীণ জীবন দেখা এবং বন্যপ্রাণী পর্যবেক্ষণ সবই রাখা যায় ভ্রমণসূচিতে। আর পর্যটকের ভিড় তুলনামূলক কম হওয়ায় পরিবার নিয়ে নিরিবিলি সময় কাটানোর সুযোগও বেশি।

ড্রাকুলার দুর্গ হয়তো ট্রান্সিলভানিয়ার সবচেয়ে পরিচিত পরিচয়, কিন্তু হারঘিতা দেখায় এই অঞ্চলের গল্প আরও অনেক বড়। পাহাড়, বন, আগ্নেয় হ্রদ, স্থানীয় সংস্কৃতি আর বন্যপ্রাণী মিলিয়ে ভৌতিক গল্পের বাইরেও ট্রান্সিলভানিয়া হতে পারে রোমানিয়ার অন্যতম আকর্ষণীয় প্রকৃতিনির্ভর ভ্রমণ গন্তব্য।

সূত্র: দ্যা গার্ডিয়ান