বিমানে উঠলে যাত্রীর চোখে হয়তো সবার আগে আসে আসন, জানালা কিংবা খাবারের কথা। কিন্তু আকাশপথের এই যাত্রার নেপথ্যে থাকা উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের নাম নিয়ে অনেকেরই কৌতূহল, বাংলাদেশি যাত্রীরা শেষ পর্যন্ত এয়ারবাসে বেশি ভ্রমণ করেন, নাকি বোয়িংয়ে?
এর সরাসরি উত্তর দিতে হলে বাংলাদেশের নিজস্ব বিমান সংস্থাগুলোর বহরের দিকে তাকাতে হয়। আর সেখানে বর্তমানে বোয়িংয়ের উপস্থিতিই তুলনামূলকভাবে বেশি, বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ক্ষেত্রে।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহরে বর্তমানে বোয়িংয়ের বিভিন্ন মডেলের উড়োজাহাজ রয়েছে। সংস্থাটির নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, তাদের বহরে চারটি বোয়িং ৭৭৭-৩০০ইআর, চারটি বোয়িং ৭৮৭-৮, দুটি বোয়িং ৭৮৭-৯ এবং চারটি বোয়িং ৭৩৭ রয়েছে। এর পাশাপাশি পাঁচটি ড্যাশ-৮ উড়োজাহাজও রয়েছে।
অর্থাৎ, বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থার আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক যাত্রায় বোয়িং উড়োজাহাজের ব্যবহারই বেশি।
বিশেষ করে দীর্ঘপথের আন্তর্জাতিক রুটে বিমান বাংলাদেশের বহরে থাকা বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। সংস্থাটির বহরে বর্তমানে ছয়টি ড্রিমলাইনার রয়েছে, চারটি ৭৮৭-৮ এবং দুটি ৭৮৭-৯।
বাংলাদেশের বেসরকারি বিমান সংস্থাগুলোর চিত্র অবশ্য কিছুটা আলাদা। ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের বহরে রয়েছে এয়ারবাস ও বোয়িং—দুই ধরনের উড়োজাহাজই।
২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, সংস্থাটির বহরে এয়ারবাস এ৩৩০ এবং বোয়িং ৭৩৭-৮০০ উভয় ধরনের উড়োজাহাজ রয়েছে। পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ ও স্বল্প দূরত্বের রুটে এটিআর ৭২-৬০০ উড়োজাহাজও ব্যবহার করে সংস্থাটি।
ফলে ইউএস-বাংলার যাত্রীদের কেউ এয়ারবাসে, আবার কেউ বোয়িংয়ে ভ্রমণ করছেন রুট ও নির্ধারিত উড়োজাহাজের ওপর বিষয়টি নির্ভর করে।
তবে এয়ারবাসে বাংলাদেশিরা কম ভ্রমণ করেন- এমনটা সরাসরি বলা ঠিক হবে না। কারণ বাংলাদেশের আকাশপথে শুধু দেশীয় বিমান সংস্থাই নয়, বহু বিদেশি এয়ারলাইনও চলাচল করে। এসব সংস্থার বহরে এয়ারবাস ও বোয়িং দুই নির্মাতার উড়োজাহাজই রয়েছে।
ফলে একজন বাংলাদেশি যাত্রী বিদেশি কোনও বিমান সংস্থার ফ্লাইটে ভ্রমণ করলে তিনি এয়ারবাসেও উঠতে পারেন, আবার বোয়িংয়েও। কোন নির্মাতার উড়োজাহাজে কতজন বাংলাদেশি যাত্রী ভ্রমণ করেছেন এমন নির্দিষ্ট সামগ্রিক পরিসংখ্যান নিয়মিতভাবে প্রকাশিত হয় না।
তাই ‘বাংলাদেশি যাত্রীরা মোট কতবার এয়ারবাসে আর কতবার বোয়িংয়ে ভ্রমণ করেছেন’ এমন নির্ভুল সংখ্যা বর্তমানে বলা সম্ভব নয়। তবে বাংলাদেশের নিজস্ব বিমান সংস্থাগুলোর বহরের ভিত্তিতে বোয়িংয়ের উপস্থিতি স্পষ্টতই শক্তিশালী।
এখানে সাম্প্রতিক একটি বড় পরিবর্তনও গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ সালের এপ্রিলে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স বোয়িংয়ের সঙ্গে ১৪টি নতুন উড়োজাহাজের চুক্তি ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে রয়েছে আটটি বোয়িং ৭৮৭-১০, দুটি বোয়িং ৭৮৭-৯ এবং চারটি বোয়িং ৭৩৭-৮।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এর আগে বাংলাদেশ এয়ারবাসের কাছ থেকে উড়োজাহাজ কেনার পরিকল্পনা করেছিল। শেষ পর্যন্ত বোয়িংয়ের সঙ্গে চুক্তির দিকে এগিয়ে যায় বাংলাদেশ।
অর্থাৎ, ভবিষ্যতেও বাংলাদেশের জাতীয় বিমান সংস্থার বহরে বোয়িংয়ের উপস্থিতি আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
শুধু বিমান বাংলাদেশ নয়, বেসরকারি খাতেও বোয়িংয়ের দিকে বড় সম্প্রসারণ পরিকল্পনা দেখা যাচ্ছে। ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স ২০২৬ সালের জুলাইয়ে ২১টি নতুন বোয়িং উড়োজাহাজ যুক্ত করার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে ১৫টি বোয়িং ৭৩৭-৮ এবং ছয়টি বোয়িং ৭৩৭-৮০০।
ফলে বাংলাদেশের বিমান পরিবহন খাতে আগামী কয়েক বছরে বোয়িংয়ের উপস্থিতি আরও দৃশ্যমান হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
শুধু নির্মাতার নাম দেখে কোনও উড়োজাহাজকে ভালো বা খারাপ বলা যায় না। এয়ারবাস ও বোয়িং দুই প্রতিষ্ঠানই বিশ্বের শীর্ষ বাণিজ্যিক উড়োজাহাজ নির্মাতা। একটি নির্দিষ্ট বিমানে যাত্রীর আরাম নির্ভর করে উড়োজাহাজের মডেল, আসনের বিন্যাস, কেবিনের নকশা, বিমান সংস্থার সেবা এবং রক্ষণাবেক্ষণের ওপর।
অর্থাৎ এয়ারবাসে উঠলেই বেশি আরাম, আর বোয়িংয়ে উঠলেই কম আরাম এমন কোনও নিয়ম নেই।
বাংলাদেশি যাত্রীদের জন্য এয়ারবাস ও বোয়িং দুই নির্মাতার উড়োজাহাজই নিয়মিত আকাশপথে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে বাংলাদেশের নিজস্ব বিমান সংস্থাগুলোর বহর বিবেচনায় বোয়িং বর্তমানে এগিয়ে। বিমান বাংলাদেশের বহরে বোয়িংয়ের আধিপত্য রয়েছে, আর ইউএস-বাংলাও নতুন করে বোয়িং উড়োজাহাজ যুক্ত করার বড় পরিকল্পনা নিয়েছে।
তাই একজন বাংলাদেশি যাত্রী বছরে ঠিক কতবার এয়ারবাসে আর কতবার বোয়িংয়ে ভ্রমণ করেন তার নির্দিষ্ট জাতীয় হিসাব না থাকলেও, দেশের বিমান পরিবহন খাতের বর্তমান চিত্র বলছে, বোয়িংয়ের সঙ্গে বাংলাদেশি যাত্রীদের আকাশযাত্রার সম্পর্ক আগামী দিনেও আরও গভীর হতে চলেছে।