বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে দীর্ঘপথের যাত্রায় এত দিন দুবাই, দোহা কিংবা আবুধাবি ছিল যাত্রীদের পরিচিত বিরতির জায়গা। ইউরোপ থেকে এশিয়া কিংবা অস্ট্রেলিয়ায় যাওয়ার পথে এসব মধ্যপ্রাচ্যীয় বিমান হাবের ওপর ছিল বিপুল নির্ভরতা। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ সেই চিত্র দ্রুত বদলে দিচ্ছে। এখন অনেক যাত্রী সরাসরি ফ্লাইট বেছে নিচ্ছেন, আবার কেউ কেউ বিকল্প হিসেবে হংকং, ইস্তাম্বুল, সিউল ও সিঙ্গাপুরের মতো এশীয় বিমানবন্দর ব্যবহার করছেন।
যুদ্ধ শুরুর আগে আন্তমহাদেশীয় বিমান চলাচলে এমিরেটস, কাতার এয়ারওয়েজ ও ইতিহাদ এয়ারওয়েজ ছিল বড় শক্তি। ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে যাতায়াতকারী প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এবং ইউরোপ থেকে অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যাওয়া প্রায় অর্ধেক যাত্রী এসব মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভর করতেন।
কিন্তু যুদ্ধ শুরুর পর এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্য হয়ে যাতায়াতকারী ট্রানজিট যাত্রীর সংখ্যা দ্রুত কমেছে। একটি হিসাবে, এ ধরনের ট্রানজিট যাত্রী চলাচল প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের বদলে এশিয়ায় নজর
দুবাই, আবুধাবি ও দোহা গত দুই দশকে বিপুল সরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ বিমান হাব হিসেবে গড়ে উঠেছে। আফ্রিকা, এশিয়া ও ইউরোপের মাঝামাঝি ভৌগোলিক অবস্থান তাদের এই সাফল্যের অন্যতম কারণ।
গত বছর বিশ্বের ৪১ কোটি ৭০ লাখ সংযোগকারী বা ট্রানজিট যাত্রীর ১৬ শতাংশ মধ্যপ্রাচ্যের বিমানবন্দর ব্যবহার করেছেন বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক এয়ার ট্রান্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশন (আইএটিএ)।
কিন্তু যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতি পাল্টে যায়। নিউইয়র্কভিত্তিক বিমান চলাচল পরামর্শক প্রতিষ্ঠান অল্টন এভিয়েশন কনসালট্যান্সির হিসাবে, এশিয়া ও পশ্চিম ইউরোপের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্য হয়ে যাতায়াতকারী ট্রানজিট যাত্রী এপ্রিল মাসে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪৭ শতাংশ কমেছে।
দোহা, দুবাই ও আবুধাবির বিমানবন্দরকে ঘিরে নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি হওয়ায় অনেক ফ্লাইট স্থগিত বা অন্য পথে পরিচালনা করা হয়। কয়েকটি দেশও যাত্রীদের মধ্যপ্রাচ্য হয়ে ভ্রমণ না করার পরামর্শ দেয়।
লন্ডনের এভিয়েশন পরামর্শক জন স্ট্রিকল্যান্ডের ভাষায়, মানুষ এখন বিকল্প রুট খুঁজছেন, আর এশিয়ার বড় বিমান হাবগুলো স্বাভাবিকভাবেই সেই বিকল্প হয়ে উঠেছে।
সিউলে বাড়ছে ট্রানজিট যাত্রী
এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগীদের একটি হয়ে উঠেছে দক্ষিণ কোরিয়ার ইনচন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। সিউলকে সেবা দেওয়া এই বিমানবন্দর জানিয়েছে, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে তাদের ট্রানজিট যাত্রী আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৮ শতাংশ বেড়েছে।
ইউরোপগামী রুটে প্রবৃদ্ধি আরও বেশি সেখানে ট্রানজিট যাত্রী বেড়েছে ৬৩ শতাংশ।
এই প্রবৃদ্ধির ফলে ইনচন ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে বিশ্বের সবচেয়ে ব্যস্ত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে উঠে এসেছে বলে প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে জানিয়েছে এয়ারপোর্টস কাউন্সিল ইন্টারন্যাশনাল। এর আগে তৃতীয় অবস্থানে থাকা ইনচন এবার পেছনে ফেলেছে দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও লন্ডনের হিথরো বিমানবন্দরকে।
ইনচন কর্তৃপক্ষের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক সংকটের কারণে যাত্রীরা উপসাগরীয় বিমান হাব এড়িয়ে চলায় এই পরিবর্তন এসেছে।
শুধু সিউল নয়, বাড়ছে হংকং-তাইওয়ান-সিঙ্গাপুরেও
মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তে যাত্রীদের বিকল্প গন্তব্য হয়ে উঠছে এশিয়ার আরও কয়েকটি বিমানবন্দর।
একই সময়ে হংকং আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আন্তর্জাতিক যাত্রী চলাচল বেড়েছে ১১ শতাংশের বেশি। তাইওয়ানের তাওইউয়ান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও আন্তর্জাতিক যাত্রী সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ১০ শতাংশ।
সিঙ্গাপুরের চাঙ্গি বিমানবন্দরও বাড়তি চাহিদার সুবিধা পাচ্ছে। ইউরোপ ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে চলাচলকারী প্রায় প্রতি চারজন যাত্রীর একজন এই বিমানবন্দরকে সংযোগস্থল হিসেবে ব্যবহার করেন।
নতুন চাহিদা সামলাতে মার্চ থেকে জুলাইয়ের মধ্যে সিঙ্গাপুর ও লন্ডন, মিউনিখ, প্যারিস ও সিডনির মতো শহরের মধ্যে ৮০০টির বেশি অতিরিক্ত ফ্লাইট যুক্ত করেছে বিভিন্ন এয়ারলাইন।
এশিয়ার এয়ারলাইনগুলোরও লাভ
পরিবর্তিত ভ্রমণপথের সুফল পাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরের এয়ারলাইনগুলোও।
হংকংভিত্তিক ক্যাথে প্যাসিফিক জানিয়েছে, মার্চে তাদের যাত্রী সংখ্যা আগের বছরের একই মাসের তুলনায় ২৪ শতাংশ বেড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির কারণে ভ্রমণ চাহিদার পরিবর্তন এই প্রবৃদ্ধির অন্যতম কারণ।
সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনসের যাত্রী চলাচলও বেড়েছে ৭ শতাংশ। ইউরোপ ও আমেরিকাগামী যাত্রীদের রুট পরিবর্তনের কারণে এই প্রবৃদ্ধি হয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
অন্যদিকে, টার্কিশ এয়ারলাইনস চীন, হংকং ও থাইল্যান্ডে সক্ষমতা বাড়িয়েছে। লুফথানসা গ্রুপ এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন রুটে অতিরিক্ত ফ্লাইট দিয়েছে। আর এয়ার ফ্রান্স এশিয়াগামী রুটে বাড়তি চাহিদা সামলাতে উড়োজাহাজ পুনর্বিন্যাস করেছে।
ফলে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ যেখানে একদিকে আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে, অন্যদিকে তা এশিয়ার বিমানবন্দর ও এয়ারলাইনগুলোর জন্য নতুন ব্যবসার সুযোগও তৈরি করেছে।
বাড়তি যাত্রী মানেই বাড়তি আয়
ট্রানজিট যাত্রী বাড়লে শুধু ফ্লাইটের সংখ্যা বাড়ে না, বিমানবন্দরগুলোর আয়ও বাড়ে। যাত্রীদের কাছ থেকে প্যাসেঞ্জার ফি পাওয়ার পাশাপাশি বিমানবন্দরের দোকান, রেস্তোরাঁ ও অন্যান্য সেবায় তাঁদের ব্যয়ও গুরুত্বপূর্ণ আয়ের উৎস।
এয়ারপোর্টস কাউন্সিল ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুযায়ী, একজন যাত্রী গড়ে প্রায় ৭ দশমিক ৫৭ ডলার বিমানবন্দরের কেনাকাটা, খাবার ও অন্যান্য বিমান চলাচল-বহির্ভূত খাতে ব্যয় করেন।
অর্থাৎ, মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তে সিউল, হংকং কিংবা সিঙ্গাপুরে বেশি যাত্রী ট্রানজিট করলে এসব বিমানবন্দরের জন্য তা সরাসরি আর্থিক সুবিধা তৈরি করতে পারে।
এই পরিবর্তন কতদিন থাকবে?
এশিয়ার বিমানবন্দরগুলোর এই বাড়তি সুবিধা কতদিন স্থায়ী হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি যদি স্বাভাবিক হতে শুরু করে, তাহলে যাত্রীদের একটি অংশ আবার দুবাই, দোহা ও আবুধাবির মতো পুরোনো ট্রানজিট হাব ব্যবহার করতে পারেন।
ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের বড় এয়ারলাইনগুলো যাত্রীদের আস্থা ফেরাতে টিকিটের দাম কমানোসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। আইএটিএ-ও জানিয়েছে, এপ্রিলের পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যগামী বুকিং ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে।
অল্টন এভিয়েশন কনসালট্যান্সি-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক জেফরি গো মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্যের এয়ারলাইনগুলো এত কম দামে টিকিট দিচ্ছে যে কিছু যাত্রী আবার ঝুঁকি নিয়ে ওই অঞ্চল হয়ে ভ্রমণের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
তাই আপাতত সিউল, হংকং ও সিঙ্গাপুর আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের নতুন সুবিধাভোগী হলেও, এটি দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন নাকি যুদ্ধের কারণে তৈরি সাময়িক প্রবণতা—তার উত্তর নির্ভর করবে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও যাত্রীদের আস্থার ওপর।
একটি বিষয় অবশ্য স্পষ্ট, যুদ্ধ শুধু আকাশপথের নিরাপত্তা বদলায়নি, বদলে দিচ্ছে বিশ্বের দীর্ঘপথের যাত্রীদের যাত্রাবিরতির মানচিত্রও।
সূত্র: দ্যা নিউ ইয়র্ক টাইমস









