ভ্রমণের প্রস্তুতি শেষ, ব্যাগ গোছানো, বিমানবন্দরে যাওয়ার সময়ও ঠিক করা। হঠাৎ মোবাইলে এলো বার্তা, ‘ফ্লাইট বাতিল’। খারাপ আবহাওয়া, ঝড়, ভারী বৃষ্টি কিংবা বিমানবন্দরের কার্যক্রমে বিঘ্নের কারণে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে বর্ষা বা ঝড়প্রবণ মৌসুমে যাত্রীদের জন্য এটি বেশ ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
তবে ফ্লাইট বাতিলের খবর পেলেই দুশ্চিন্তায় পড়ে যাওয়ার দরকার নেই। কিছু বিষয় দ্রুত যাচাই করে এবং সঠিকভাবে পদক্ষেপ নিলে পরবর্তী যাত্রা অনেকটাই সহজ করা সম্ভব।
প্রথমেই এয়ারলাইনসের কাছ থেকে নিশ্চিত হন
ফ্লাইট বাতিলের খবর পাওয়ার পর প্রথম কাজ হলো এয়ারলাইনসের কাছ থেকে বিষয়টি নিশ্চিত করা। এয়ারলাইনসের ওয়েবসাইট, মোবাইল অ্যাপ, এসএমএস বা ই-মেইল দেখুন। একই সঙ্গে বিমানবন্দরের ওয়েবসাইটেও ফ্লাইটের সর্বশেষ অবস্থা যাচাই করা ভালো।
আবহাওয়ার কারণে ফ্লাইট বাতিল হলে নতুন ফ্লাইটের সময়সূচি কখন দেওয়া হবে, সেটিও জেনে নিন। খারাপ আবহাওয়া বিমান চলাচলে এমন বিঘ্ন ঘটাতে পারে, যার ওপর এয়ারলাইনসের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ থাকে না।
নতুন ফ্লাইটের ব্যবস্থা কীভাবে হবে, জেনে নিন
ফ্লাইট বাতিল হওয়ার পর এয়ারলাইনস সাধারণত পরবর্তী কোনও ফ্লাইটে যাত্রা পুনর্নির্ধারণের সুযোগ দিতে পারে। তাই কাউন্টারে বা কাস্টমার সার্ভিসে যোগাযোগ করে কখন এবং কীভাবে নতুন ফ্লাইটে যাত্রা করা যাবে, তা জেনে নিন।
তবে তাড়াহুড়ো করে নিজে থেকে নতুন টিকিট কিনে ফেলবেন না। আগে দেখুন আপনার মূল টিকিটের ক্ষেত্রে এয়ারলাইনস পুনরায় বুকিং বা রিরাউটিংয়ের কী সুযোগ দিচ্ছে। এতে অপ্রয়োজনীয় অতিরিক্ত খরচ এড়ানো যেতে পারে।
ফেরত টাকা পাওয়ার সুযোগ আছে কি না দেখুন
ফ্লাইট বাতিল হলে টাকা ফেরতের নিয়ম দেশ, এয়ারলাইনস, টিকিটের ধরন এবং বাতিলের কারণভেদে আলাদা হতে পারে। উদাহরণ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের পরিবহন দফতরের নিয়মে, এয়ারলাইনস কোনও ফ্লাইট বাতিল করলে এবং যাত্রী বিকল্প যাত্রা গ্রহণ না করে ভ্রমণ না করার সিদ্ধান্ত নিলে টিকিটের মূল্য ফেরত পাওয়ার অধিকার থাকে।
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিকভাবে যাত্রী অধিকারও পরিস্থিতি ও সংশ্লিষ্ট আইনের ওপর নির্ভর করে। ইন্টারন্যাশনাল এয়ার ট্রান্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশন (আইএটিএ) বলছে, খারাপ আবহাওয়ার মতো এয়ারলাইনসের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা কারণে ফ্লাইট বাতিল হলে ক্ষতিপূরণের নিয়ম সাধারণত এয়ারলাইনসের নিয়ন্ত্রণাধীন পরিস্থিতির মতো নয়।
তাই টাকা ফেরত বা ভাউচার নেওয়ার আগে আপনার টিকিটের শর্ত ও সংশ্লিষ্ট দেশের যাত্রী অধিকার দেখে নেওয়া জরুরি।
হোটেল বুকিং থাকলে কী করবেন
ফ্লাইট বাতিলের কারণে যদি গন্তব্যে পৌঁছাতে দেরি হয়, তাহলে হোটেল বুকিংয়ের বিষয়টিও দ্রুত সামলাতে হবে। বুকিংটি পরিবর্তন বা বাতিল করা যায় কি না, তা দেখে নিন।
এ ক্ষেত্রে যত দ্রুত সম্ভব হোটেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। একইভাবে বিমানবন্দর থেকে গন্তব্যে যাওয়ার জন্য আগে থেকে গাড়ি, ট্রেন বা অন্য কোনো পরিবহন বুক করা থাকলে সেগুলোর ক্ষেত্রেও পরিবর্তনের সুযোগ আছে কি না জেনে নিন।
গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র ও প্রমাণ সংরক্ষণ করুন
ফ্লাইট বাতিলের ক্ষেত্রে টিকিট, বোর্ডিং পাস, এয়ারলাইনসের এসএমএস বা ই-মেইল, নতুন বুকিংয়ের তথ্য এবং অতিরিক্ত খরচের রসিদ সংরক্ষণ করে রাখুন। পরে কোনও দাবি, টাকা ফেরত বা অভিযোগের প্রয়োজন হলে এসব নথি কাজে লাগতে পারে।
খারাপ আবহাওয়ায় নিজে থেকে বিমানবন্দরে ছুটবেন না
ফ্লাইট বাতিলের খবর যদি যাত্রার আগেই পাওয়া যায়, তাহলে শুধু তথ্য জানার জন্য বিমানবন্দরে ছুটে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। আগে এয়ারলাইনসের সঙ্গে যোগাযোগ করে জেনে নিন আপনাকে বিমানবন্দরে যেতে হবে কি না।
আবহাওয়ার পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে। তাই শুধু আগের কোনও তথ্যের ওপর নির্ভর না করে ফ্লাইটের সর্বশেষ স্ট্যাটাস দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়াই ভালো।
ভ্রমণবীমা থাকলে শর্ত দেখে নিন
ফ্লাইট বাতিল বা দীর্ঘ বিলম্বের ক্ষেত্রে ট্রাভেল ইন্স্যুরেন্স কিছু খরচের সুরক্ষা দিতে পারে। তবে সব পলিসিতে একই সুবিধা থাকে না। তাই বীমা করার সময়ই আবহাওয়াজনিত ফ্লাইট বাতিল, বিলম্ব, অতিরিক্ত হোটেল খরচ কিংবা সংযোগকারী ফ্লাইট মিস হলে কী ধরনের সুবিধা পাওয়া যাবে, তা দেখে নেওয়া ভালো।
কানেক্টিং ফ্লাইট থাকলে আরও সতর্ক
একটি ফ্লাইট বাতিলের প্রভাব পরবর্তী সংযোগকারী ফ্লাইটেও পড়তে পারে। বিশেষ করে আলাদা আলাদা টিকিটে যাত্রা করলে ঝুঁকি আরও বাড়ে। তাই প্রথম ফ্লাইট বাতিল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পরবর্তী ফ্লাইটের বুকিংও পরীক্ষা করুন।
প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনসের সঙ্গে যোগাযোগ করে নতুন সময়সূচি অনুযায়ী পুরো যাত্রাপথ সাজিয়ে নিন।
শান্ত থাকাই সবচেয়ে জরুরি
ঝড়-বৃষ্টির কারণে ফ্লাইট বাতিল হওয়া বিরক্তিকর হলেও এর পেছনে যাত্রীদের নিরাপত্তাই বড় বিষয়। আবহাওয়ার কারণে উড়োজাহাজ চলাচল বন্ধ বা সীমিত করা হলে সেটি অনেক সময় নিরাপদ পরিচালনার স্বার্থেই করা হয়। তাই কাউন্টারে দীর্ঘ লাইন বা ফোনে অপেক্ষার চাপের মধ্যেও শান্ত থেকে ধাপে ধাপে বিকল্প ব্যবস্থা খোঁজা সবচেয়ে ভালো।
মনে রাখবেন, ফ্লাইট বাতিল হলে প্রথমে এয়ারলাইনসের কাছ থেকে নিশ্চিত তথ্য নিন, বিকল্প ফ্লাইট বা টাকা ফেরতের সুযোগ যাচাই করুন, নিজের সিদ্ধান্তে নতুন টিকিট কেনার আগে এয়ারলাইনসের নীতিমালা দেখুন এবং সব রসিদ ও যোগাযোগের প্রমাণ সংরক্ষণ করুন। আবহাওয়াজনিত বাতিলের ক্ষেত্রে যাত্রীর অধিকার দেশ ও এয়ারলাইনসভেদে ভিন্ন হতে পারে—তাই নির্দিষ্ট ভ্রমণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনস ও দেশের সরকারি যাত্রী-অধিকার সংক্রান্ত তথ্যই চূড়ান্তভাবে অনুসরণ করা উচিত।