আকাশে উড়ে যাওয়া বিমানের পেছনে দেখা যাওয়া সরু সাদা রেখাগুলো দেখতে অনেকটা নিরীহ মেঘের মতো। কিন্তু এই কনট্রেইল বা বিমানের তৈরি বরফকণার রেখাই জলবায়ু পরিবর্তনে বাড়তি উষ্ণায়ন ঘটাতে পারে বলে দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছেন বিজ্ঞানীরা।
বিমানের ইঞ্জিন থেকে বের হওয়া উষ্ণ ধোঁয়া ও জলীয়বাষ্প উচ্চ আকাশের আর্দ্র পরিবেশের সঙ্গে মিশে ক্ষুদ্র বরফকণা তৈরি করে। অনুকূল পরিস্থিতিতে এসব কণা দীর্ঘ সময় আকাশে থেকে মেঘের মতো স্তর তৈরি করতে পারে, যা বায়ুমণ্ডলে তাপ আটকে রেখে বৈশ্বিক উষ্ণায়নে ভূমিকা রাখে।
এবার এই প্রভাব কমানোর নতুন উপায় পরীক্ষা করতে যাচ্ছে যুক্তরাজ্য। বিমানের উড়ানপথে সামান্য পরিবর্তন এনে কনট্রেইল তৈরির পরিমাণ কমানো যায় কি না, সেটিই যাচাই করবেন বিজ্ঞানী, বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রক ও ব্রিটিশ সরকারের সংশ্লিষ্টরা।
পরবর্তী দুই শীতকালে উত্তর আটলান্টিকের একটি ব্যস্ত বিমান করিডরে এ পরীক্ষা চালানো হবে। আবহাওয়ার তথ্য ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিশ্লেষণ ব্যবহার করে এমন উচ্চতা নির্ধারণ করা হবে, যেখানে দীর্ঘস্থায়ী কনট্রেইল তৈরির সম্ভাবনা কম। এরপর নির্দিষ্ট কিছু ফ্লাইটকে সামান্য উচ্চতা পরিবর্তন করে উড়তে বলা হবে।
বিশ্বে এ ধরনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষাগুলোর একটি হতে যাচ্ছে এই উদ্যোগ। পরীক্ষা চলবে আয়ারল্যান্ডের পশ্চিমে উত্তর আটলান্টিকের ব্যস্ত শ্যানউইক আকাশসীমায়।
দুই দফায় চার মাস করে চলবে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম। এ সময় নির্ধারিত আকাশসীমা দিয়ে প্রায় ১০ হাজার ফ্লাইট চলাচল করবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর মধ্যে একটি ছোট অংশের বিমানকে স্বাভাবিক পথ থেকে সামান্য বিচ্যুত করে ভিন্ন উচ্চতায় উড়তে বলা হবে।
গবেষকেরা স্যাটেলাইটের ছবি ও অন্যান্য তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখবেন, রুট পরিবর্তনের ফলে কনট্রেইল কতটা কমেছে এবং এর প্রকৃত জলবায়ুগত প্রভাব কী।
ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের বায়ুমণ্ডলীয় পদার্থবিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক এডওয়ার্ড গ্রিসপিয়ার্ট বলেন, বিমানের উচ্চতায় সামান্য পরিবর্তনও কনট্রেইল তৈরির ক্ষেত্রে বড় পার্থক্য তৈরি করতে পারে।
তার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বায়ুমণ্ডলের একটি নির্দিষ্ট আর্দ্র স্তরের মধ্য দিয়ে বিমান গেলে কনট্রেইল তৈরির সম্ভাবনা বেড়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে এই স্তরটি মাত্র প্রায় এক হাজার ফুট পুরু হতে পারে।
বিমান যখন ওই স্তরে প্রবেশ করে, তখন ইঞ্জিন থেকে বের হওয়া কণা বরফকণা তৈরির সূচনা করে। পরে এসব বরফকণা বায়ুমণ্ডলের জলীয়বাষ্প শোষণ করে বড় হতে থাকে এবং দীর্ঘস্থায়ী কনট্রেইলে পরিণত হয়।
কখনও এসব রেখা কয়েক মিনিটের মধ্যেই মিলিয়ে যায়। আবার অনুকূল পরিবেশে কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত টিকে থেকে অন্য কনট্রেইলের সঙ্গে মিশে বিস্তৃত মেঘের স্তর তৈরি করতে পারে। তখন বায়ুমণ্ডলে আটকে পড়া তাপের পরিমাণও বেড়ে যায়।
একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, বিমান চলাচলের কারণে সৃষ্ট মোট উষ্ণায়নের ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত কনট্রেইল প্রভাবের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। অন্য গবেষণায় এই প্রভাব আরও বেশি হতে পারে বলেও ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
কনট্রেইল নিয়ে কাজ করা অলাভজনক প্রতিষ্ঠান কনট্রেইলস ডট অর্গ-এর হিসাবে, কনট্রেইল মানবসৃষ্ট মোট বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রায় ১ থেকে ২ শতাংশের জন্য দায়ী হতে পারে।
এ কারণেই বিমান চলাচলের কার্বন নিঃসরণ কমানোর পাশাপাশি কনট্রেইল নিয়ন্ত্রণকেও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার সম্ভাবনাময় একটি ক্ষেত্র হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কনট্রেইলস ডট অর্গ-এর নির্বাহী পরিচালক মার্ক শাপিরো মনে করেন, উপযুক্ত আবহাওয়ায় বিমানের রুটে ছোট ও নির্দিষ্ট পরিবর্তন আনা গেলে বিমান চলাচলের জলবায়ুগত প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
তার হিসাব অনুযায়ী, এ পদ্ধতি বিশ্বজুড়ে সফলভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে বৈশ্বিক কনট্রেইলের পরিমাণ তাত্ত্বিকভাবে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব হতে পারে।
তিনি আশা করছেন, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে এ ধরনের ব্যবস্থা আরও ব্যাপকভাবে বাস্তবায়নের উপযোগী হয়ে উঠতে পারে। তবে তার আগে বিভিন্ন দেশে আরও পরীক্ষার প্রয়োজন রয়েছে।
নতুন উদ্যোগটি গুগল, ব্রেকথ্রু এনার্জি ও আমেরিকান এয়ারলাইন্সের আগের গবেষণার ওপরও ভিত্তি করে এগোচ্ছে।
চলতি বছরের শুরুতে গুগল জানিয়েছিল, আমেরিকান এয়ারলাইন্সের সঙ্গে পরিচালিত একটি পরীক্ষায় কনট্রেইল তৈরির পূর্বাভাস ব্যবহার করে ফ্লাইট পরিচালনায় পরিবর্তন আনা হয়েছিল। এতে কনট্রেইল গঠন ৬০ শতাংশের বেশি কমানো সম্ভব হয়েছিল বলে গুগলের গবেষণায় দাবি করা হয়।
এবার আরও ব্যস্ত আন্তর্জাতিক আকাশপথে একই কৌশল ব্যবহার করে এর বাস্তব কার্যকারিতা যাচাই করা হবে।
কনট্রেইল কমানোর এই কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জও রয়েছে। বিমানের উড়ানপথে সামান্য পরিবর্তন আনলেও অতিরিক্ত জ্বালানি পোড়াতে হতে পারে। বিশেষ করে বিমানকে তুলনামূলক নিচু উচ্চতায় নামিয়ে আনলে বায়ুপ্রতিরোধ বাড়ায় জ্বালানি খরচও বাড়তে পারে।
ফলে একদিকে কনট্রেইল কমলেও অন্যদিকে অতিরিক্ত জ্বালানি পোড়ানোর কারণে কার্বন নিঃসরণ বেড়ে যেতে পারে। নতুন পরীক্ষায় তাই কনট্রেইল কমানোর সুবিধা বনাম অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যবহারের ক্ষতি দুই দিকই হিসাব করা হবে।
আগের কিছু গবেষণায় অবশ্য দেখা গেছে, অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যবহারের প্রভাব বিবেচনায় নেওয়ার পরও কনট্রেইল কমানোর সামগ্রিক জলবায়ুগত সুবিধা বেশি হতে পারে।
ইম্পেরিয়াল কলেজের গবেষক গ্রিসপিয়ার্টের মতে, আবহাওয়া, বিমান চলাচল ও মেঘ সবকিছুই অত্যন্ত জটিল ব্যবস্থা। তবে প্রযুক্তি, আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও উন্নত রুট পরিকল্পনা ব্যবহার করে ঝুঁকিপূর্ণ বায়ুমণ্ডলীয় স্তর এড়াতে পারলে কনট্রেইলের কারণে সৃষ্ট উষ্ণায়ন অন্তত উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হতে পারে।
ফলে আটলান্টিকের আকাশে শুরু হতে যাওয়া এই পরীক্ষা শুধু বিমান চলাচলের নতুন রুট নির্ধারণের বিষয় নয়; বরং বিমান পরিবহনের জলবায়ুগত প্রভাব কমানোর ক্ষেত্রে একটি সম্ভাব্য নতুন দিগন্তের পরীক্ষাও। সফল হলে ভবিষ্যতে বিশ্বের ব্যস্ত আকাশপথগুলোতেও আবহাওয়া ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তথ্য কাজে লাগিয়ে আরও জলবায়ুবান্ধবভাবে বিমান পরিচালনার পথ খুলতে পারে।
সূত্র: দ্যা নিউ ইয়র্ক টাইমস