এয়ারপোর্টের তিন অক্ষরের কোড সাধারণত কোনও শহর, বিমানবন্দর বা এর পুরোনো নামের সঙ্গে সম্পর্কিত। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট পাম বিচে সেই পরিচিত রীতিতেই এসেছে ব্যতিক্রম। বিমানবন্দরের নতুন কোড ডিজেটি, যা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড জে. ট্রাম্পের আদ্যক্ষর। দীর্ঘদিনের পিবিআই বদলে এখন পাম বিচ ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টের নতুন পরিচয় ডিজেটি।
দক্ষিণ ফ্লোরিডার এই বিমানবন্দরের নামও বদলে হয়েছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড জে. ট্রাম্প ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট। টার্মিনাল থেকে ‘পিবিআই’ লেখা পুরোনো লোগো প্রায় পুরোপুরি সরিয়ে ফেলা হয়েছে। বিমানবন্দরের বাইরে সড়কের ওপর বসানো হয়েছে বড় একটি সাইনবোর্ড। সেখানে পাঁচটি তারকা দিয়ে ঘেরা ঈগলের সোনালি প্রতীকের পাশে লেখা হয়েছে নতুন নাম।
নাম ও কোড দুইয়ের এই পরিবর্তনই বিমানবন্দরটির প্রায় ৮০ বছরের ইতিহাসে বড় এক পরিবর্তন। ১৮ আগস্টের মধ্যে বৈশ্বিক বিমান চলাচল খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থায় নতুন নাম ও কোড কার্যকর হয়েছে। ফলে স্থানীয়রা হয়তো আগের মতো পিবিআই বললেও এয়ারলাইনস, পাইলট, এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলার এবং যাত্রীদের ব্যবহৃত বিভিন্ন ব্যবস্থায় বিমানবন্দরটি এখন থেকে ডিজেটি নামেই শনাক্ত হবে।
ওয়েস্ট পাম বিচের এই বিমানবন্দরটি যেন অতীতের স্মৃতি বহন করে চলেছে। এর রঙিন কাচের গেজেবো এবং ভূমধ্যসাগরীয় প্রাঙ্গণের আদলে তৈরি প্রধান টার্মিনাল সেই পুরোনো আবহই তুলে ধরে। এখানে পানি ছিটানো সিংহের একটি ফোয়ারা, এমনকি অন্দরমহলে একটি পাটিং গ্রিনও রয়েছে। তবে আধুনিক অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা খুব বেশি নেই।
নজিরবিহীন নাম ও কোড পরিবর্তন
এই নতুন নামকরণ নজিরবিহীন। কোনও ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের নামে কোনও বিমানবন্দরের নামকরণ এটাই প্রথম। তবে বিমানবন্দরের তিন অক্ষরের কোড পরিবর্তনও অত্যন্ত বিরল বলে জানিয়েছে বিমান চলাচল খাতের বিভিন্ন সংগঠন। এ কারণেই, উদাহরণ হিসেবে, শিকাগো ও’হেয়ার বিমানবন্দরের কোড এখনও ওআরডি, যা বিমানবন্দরটির মূল নাম ‘অর্চার্ড ফিল্ড’-এর সঙ্গে সম্পর্কিত।
বিমানবন্দরগুলোকে একটি অভিন্ন বৈশ্বিক ব্যবস্থার আওতায় তিন ও চার অক্ষরের কোড দেওয়া হয়, যা ১৯৪০-এর দশক থেকে চালু রয়েছে। তিন অক্ষরের কোড নির্ধারণ করে ইন্টারন্যাশনাল এয়ার ট্রান্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশন (আইএটিএ)।
আইএটিএর এক তথ্যপত্রে বলা হয়েছে, এসব কোডকে ‘স্থায়ী হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং প্রায় কখনোই পরিবর্তন করা হয় না’। পরিবর্তন করা হলেও এর পেছনে অবশ্যই জোরালো যৌক্তিকতা থাকতে হয়, যার প্রধান কারণ হতে হয় বিমান চলাচলের নিরাপত্তা।
রয়্যাল পাম বিচ গ্রামের বাসিন্দা ২৭ বছর বয়সী লোগান রবিনসন বলেন, “বিমানবন্দরের নতুন কোডটির সঙ্গে মানিয়ে নিতে অবশ্যই কিছুটা সময় লাগবে। সারা জীবন আমি পিবিআই বলে এসেছি, তাই সামনে আরও কিছুদিন নিশ্চিতভাবেই পিবিআই বলবো। বলতে গেলে, আমার কাছে এটি সব সময়ই পিবিআই হয়ে থাকবে।”
ধাপে ধাপে বদল
বিমানবন্দরের নাম পরিবর্তনের প্রক্রিয়াটি ধাপে ধাপে সম্পন্ন করা হয়েছে, যাতে বিমান চলাচল খাতের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের ব্যবস্থাপনা সমন্বয়ের জন্য সময় দেওয়া যায়। বিমানবন্দরটি শনাক্ত করার জন্য ব্যবহৃত বিভিন্ন ব্যবস্থার মাধ্যমে এয়ারলাইনস, পাইলট, এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলার ও যাত্রীরা বিমানবন্দরটির তথ্য পান।
গত এক মাস ধরে বিমানবন্দরটির সরকারি নাম ও কোডের মধ্যে অসামঞ্জস্যতা যাত্রীদের বিভ্রান্ত করেছে। কেউ কেউ জানিয়েছেন, এয়ারলাইনস ও অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সিগুলো থেকে তাদের ফ্লাইটের সূচি পরিবর্তনের নোটিশ পেয়ে তারা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন।
সোমবার (১৭ আগস্ট) পর্যন্ত যাত্রীরা পিবিআই কোড ব্যবহার করে বিমানবন্দরে আসা-যাওয়ার ফ্লাইট বুক করতে পারলেও মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) থেকে আর তা পারছেন না। এতেও যাত্রীদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।
রাজনৈতিক বিতর্ক
যুক্তরাষ্ট্রে বিমানবন্দরের নামকরণের সিদ্ধান্ত স্থানীয় পর্যায়েই নেওয়া হয় বলে জানিয়েছেন দেশটির বেসামরিক বিমান চলাচল তদারককারী সংস্থা ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (এফএএ) এক মুখপাত্র।
পাম বিচ ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টের নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্তটি বিতর্কিত হয়েছে। গভর্নর রন ডেস্যান্টিস মার্চে এ পরিবর্তনকে অঙ্গরাজ্যের আইনে স্বাক্ষর করে অনুমোদন দেন। নাম পরিবর্তনের বিরোধিতা করে এরই মধ্যে অন্তত দুটি মামলা হয়েছে। নতুন নামের বিরোধিতা করে অনলাইনে কয়েক হাজার মানুষ পিটিশনেও স্বাক্ষর করেছেন।
তাদের অভিযোগ, নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্তটি রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্ট। একই সঙ্গে নতুন নামের সাইনবোর্ডসহ অন্যান্য পরিবর্তন করতে কয়েক মিলিয়ন ডলারের ঘাটতি রয়েছে বলেও তারা আপত্তি জানিয়েছেন।
মি. ডেস্যান্টিস চলতি বছরের শুরুতে টাম্পায় এক অনুষ্ঠানে এই সিদ্ধান্তের পক্ষে অবস্থান নেন। তিনি বলেন, বিমানবন্দরের নাম পরিবর্তনের উদ্যোগটি প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে নয়, বরং ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের আইনসভা থেকে নেওয়া হয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের আরও আটটি বাণিজ্যিক বিমানবন্দরের নামে দেশটির প্রেসিডেন্টদের নাম রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মিশিগানের গ্র্যান্ড র্যাপিডসের কাছে জেরাল্ড আর. ফোর্ড ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট, হিউস্টনের জর্জ বুশ ইন্টারকন্টিনেন্টাল এয়ারপোর্ট এবং আরকানসাসের লিটল রকের বিল অ্যান্ড হিলারি ক্লিনটন ন্যাশনাল এয়ারপোর্ট। তবে এই আটটি বিমানবন্দরের কোনোটিরই নাম সংশ্লিষ্ট প্রেসিডেন্টের ক্ষমতাসীন থাকাকালে পরিবর্তন করা হয়নি।
৬৫ বছর বয়সী মিস ব্রিগস বলেন, “এটা আসলে নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার বিষয়। পরিবর্তন তো হতেই থাকে। তারা চাইলে দুই বছর পর, পাঁচ বছর পর কিংবা ২০ বছর পরও নামটি পরিবর্তন করতে পারে। কোনও কিছুই চিরস্থায়ী নয়।”
৮০ বছরের পুরোনো নামের অবসান
১৯৩৬ সালে বিমানবন্দরটি যখন বাণিজ্যিক ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করে, তখন এর নাম ছিল মরিসন ফিল্ড। পাম বিচ কাউন্টির হিস্টোরিক্যাল সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, এলাকার প্রথম নারী হিসেবে এককভাবে উড়োজাহাজ চালানোর কৃতিত্ব ছিল গ্রেস মরিসনের। বিমানবন্দরটি নির্মাণের উদ্যোগেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
১৯৪৮ সালে স্থানীয় কমিশনাররা বিমানবন্দরটির নতুন নাম পাম বিচ ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট রাখার পক্ষে ভোট দেন। প্রায় ৮০ বছর ধরে বিমানবন্দরটি এই নামেই পরিচিত ছিল।
নতুন নামে নতুন বাণিজ্য
ট্রাম্প ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে নাম পরিবর্তনের ছাপ খুব একটা চোখে পড়ে না। মূল টার্মিনালের ছোট আর্ট গ্যালারিসহ বিভিন্ন স্থানের সাইনবোর্ডে নতুন নাম ব্যবহার করা হয়েছে। উপহারের দোকানে এয়ার ফোর্স ওয়ানের খেলনা মডেলও বিক্রি হচ্ছে।
গত মে মাসে পাম বিচ কাউন্টির কমিশনাররা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পারিবারিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একটি ট্রেডমার্ক ও লাইসেন্সিং চুক্তি অনুমোদন করেন। চুক্তি অনুযায়ী, বিমানবন্দরে ট্রাম্পের নামসংবলিত পণ্য বিক্রির জন্য কোনো বিক্রেতা নিয়োগ করতে হলে পারিবারিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের অনুমোদিত তালিকা থেকে তা বেছে নিতে হবে।
সূত্র: দ্যা নিউ ইয়র্ক টাইমস









