দীর্ঘদিনের কৌশল বদলে উড়োজাহাজের কেবিনে আবারও গুরুত্ব পাচ্ছে সিট-ব্যাক বিনোদন ব্যবস্থা। আমেরিকান এয়ারলাইনস জানিয়েছে, ২০২৮ সাল থেকে তাদের অভ্যন্তরীণ রুটে ব্যবহৃত সব ন্যারো-বডি উড়োজাহাজের প্রতিটি আসনের পেছনে বিনোদন স্ক্রিন বসানো হবে। নতুন করে বহরে যুক্ত হওয়া এয়ারবাস ও বোয়িং উড়োজাহাজে শুরু থেকেই থাকবে এই সুবিধা। পাশাপাশি বর্তমানে বহরে থাকা উড়োজাহাজগুলোতেও ধাপে ধাপে স্ক্রিন সংযোজন করা হবে।
একসময় ব্যক্তিগত ডিভাইসে স্ট্রিমিং সুবিধা দেওয়ার জন্য সিট-ব্যাক স্ক্রিন সরিয়ে নিয়েছিল আমেরিকান এয়ারলাইনস। এবার সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে যাত্রী অভিজ্ঞতাকে আরও উন্নত করার পরিকল্পনা করছে তারা। বড় স্ক্রিন, বিস্তৃত বিনোদন কনটেন্ট, ব্যক্তিগতভাবে সিনেমার সুপারিশ এবং ওয়্যারলেস হেডফোনের জন্য ব্লুটুথ সংযোগ—সব মিলিয়ে নতুন ব্যবস্থাটি আগের সিট-ব্যাক বিনোদন ব্যবস্থার তুলনায় আরও আধুনিক হতে যাচ্ছে।
ফিরে আসছে ব্যক্তিগত বিনোদন
২০২৮ সাল থেকে আমেরিকান এয়ারলাইনসের অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটে যাত্রীরা নিজেদের আসন থেকেই বড় পর্দায় সিনেমা ও অন্যান্য বিনোদন কনটেন্ট উপভোগ করতে পারবেন। নতুন ব্যবস্থায় যাত্রীর পছন্দ অনুযায়ী কনটেন্ট সাজেস্ট করার সুবিধাও থাকবে। ফলে দীর্ঘ বা স্বল্প যে কোনো অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটে নিজের ফোন বা ট্যাবলেটের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করতে হবে না।
আরও একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হলো ব্লুটুথ সংযোগ। যাত্রীরা নিজেদের ওয়্যারলেস হেডফোন সরাসরি সিট-ব্যাক স্ক্রিনের সঙ্গে যুক্ত করতে পারবেন। ফলে পুরোনো ধরনের তারযুক্ত ইয়ারফোন ব্যবহারের প্রয়োজন কমবে।
বিমান চলাচল খাতের পর্যবেক্ষকদের মতে, সিট-ব্যাক স্ক্রিন ফিরিয়ে আনা আমেরিকান এয়ারলাইনসের যাত্রীসেবা কৌশলে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত। বিশেষ করে ডেল্টা ও ইউনাইটেডের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী এয়ারলাইনগুলো নিজেদের প্রিমিয়াম সেবা হিসেবে তুলে ধরায় আমেরিকানও সেই প্রতিযোগিতায় আরও শক্ত অবস্থান নিতে চাইছে।
বাজেট এয়ারলাইন থেকে আলাদা হওয়ার চেষ্টা
সিটের পেছনে কোনো স্ক্রিন না থাকায় আমেরিকান এয়ারলাইনসের ইকোনমি কেবিন অনেক সময় কম খরচের বাজেট এয়ারলাইনগুলোর সঙ্গে খুব বেশি আলাদা করা যেত না বলে মনে করছেন শিল্প বিশ্লেষকেরা। তাই নতুন স্ক্রিন সংযোজনকে শুধু বিনোদন সুবিধা বাড়ানোর উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে না। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে পূর্ণাঙ্গ সেবাদাতা এয়ারলাইন হিসেবে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করার পরিকল্পনা।
প্রিমিয়াম যাত্রীদের আকর্ষণ করতে বিমান সংস্থাটি কেবিনের পাশাপাশি বিমানবন্দরের সেবাতেও পরিবর্তন আনছে। বিমানবন্দরের লাউঞ্জ উন্নত করার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে বর্তমানে মোট আসনের প্রায় ২৫ শতাংশ প্রিমিয়াম সিট থাকলেও তা বাড়িয়ে ৪০ শতাংশে নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
অর্থাৎ, সিট-ব্যাক স্ক্রিনের প্রত্যাবর্তন আসলে আমেরিকান এয়ারলাইনসের আরও বড় একটি পরিবর্তনের অংশ।
কেন সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল স্ক্রিন?
সিট-ব্যাক স্ক্রিন একসময় আমেরিকান এয়ারলাইনসের ইকোনমি কেবিনের স্বাভাবিক সুবিধা ছিল। কিন্তু ২০১৮ সালে স্বল্পপথের উড়োজাহাজগুলো থেকে ধীরে ধীরে এসব স্ক্রিন সরিয়ে নেওয়া শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। এর পরিবর্তে যাত্রীদের নিজেদের স্মার্টফোন, ট্যাবলেট বা ল্যাপটপে বিনোদন কনটেন্ট স্ট্রিম করার সুযোগ দেওয়া হয়।
তখন ব্যক্তিগত ডিভাইস যাত্রীদের মধ্যে আরও সহজলভ্য হয়ে উঠছিল। পাশাপাশি সিট-ব্যাক স্ক্রিন ও সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি স্থাপনের খরচ এবং অতিরিক্ত যন্ত্রপাতির ওজনও এয়ারলাইনগুলোর জন্য বিবেচনার বিষয় ছিল। উড়োজাহাজের ওজন বাড়লে জ্বালানি ব্যবহারের ওপরও প্রভাব পড়ে।
বর্তমানে অবশ্য আমেরিকান এয়ারলাইনসের দীর্ঘপথের আন্তর্জাতিক ও কিছু আন্তমহাদেশীয় রুটে ব্যবহৃত ওয়াইড-বডি উড়োজাহাজে সিট-ব্যাক স্ক্রিন রয়েছে। অল্পসংখ্যক ন্যারো-বডি এয়ারবাসেও এই সুবিধা আছে। তবে ২০২৮ সাল থেকে সেই সুবিধা পুরো ন্যারো-বডি বহরে ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
বদলে গেছে যাত্রীদের চাহিদা
ব্যক্তিগত ডিভাইসের ব্যবহার বাড়লেও যাত্রীদের চাহিদা পুরোপুরি সেদিকে সরে যায়নি। বিশেষ করে কোভিড-১৯ মহামারির পর বড় স্ক্রিনে কনটেন্ট দেখার সুবিধার প্রতি যাত্রীদের আগ্রহ আরও স্পষ্ট হয়েছে বলে মনে করছে আমেরিকান এয়ারলাইনস।
বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের যাত্রীরা একাধিক ডিভাইস ব্যবহার করলেও বিমানের আসনে বসে বড় স্ক্রিনে বিনোদন দেখার সুবিধাকে মূল্য দিচ্ছেন। ফলে ব্যক্তিগত ডিভাইসনির্ভর বিনোদনের পাশাপাশি আবারও সিট-ব্যাক স্ক্রিনের প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।
এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমেরিকান এয়ারলাইনস এবার শুধু স্ক্রিন ফিরিয়ে আনছে না, বরং প্রযুক্তিনির্ভর পুরো ইন-ফ্লাইট অভিজ্ঞতাই নতুন করে সাজাচ্ছে।
আকাশে আসছে দ্রুতগতির ইন্টারনেট
যাত্রীসেবার আরেকটি বড় পরিবর্তন হলো স্টারলিংক ওয়াই-ফাই। ২০২৭ সাল থেকে উড়োজাহাজে স্টারলিংক ইন্টারনেট চালুর পরিকল্পনা করেছে আমেরিকান এয়ারলাইনস। প্রচলিত বিমান ওয়াই-ফাইয়ের তুলনায় দ্রুতগতির এই সেবা যাত্রীদের আকাশে বসেও আরও ভালো অনলাইন অভিজ্ঞতা দেওয়ার সুযোগ তৈরি করবে।
এই প্রযুক্তি ইতোমধ্যে অন্য এয়ারলাইনগুলোর কাছেও গুরুত্ব পাচ্ছে। ইউনাইটেড এয়ারলাইনসও স্টারলিংক চালু করছে এবং জুন পর্যন্ত তাদের প্রায় ৪০০টি উড়োজাহাজে এই সেবা যুক্ত হয়েছিল। বছরের শেষ নাগাদ সেই সংখ্যা ১ হাজারে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
ফলে ভবিষ্যতের ফ্লাইটে বিনোদন ও ইন্টারনেট দুই ক্ষেত্রেই যাত্রীদের অভিজ্ঞতা বদলে যেতে পারে। একদিকে থাকবে সিটের পেছনে ব্যক্তিগত বড় স্ক্রিন, অন্যদিকে থাকবে দ্রুতগতির ইন্টারনেট।
কেবিন থেকে লাউঞ্জ সবখানেই পরিবর্তন
আমেরিকান এয়ারলাইনসের পরিবর্তনের পরিধি কেবল উড়োজাহাজের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নয়। বিমানবন্দরের লাউঞ্জ সুবিধা উন্নত করার পাশাপাশি প্রিমিয়াম আসনের সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।
এর ফলে সাধারণ ইকোনমি যাত্রীদের বিনোদন সুবিধা বাড়ানোর পাশাপাশি বেশি অর্থ ব্যয় করতে আগ্রহী যাত্রীদের জন্যও উন্নত সেবা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। এয়ারলাইনটির লক্ষ্য, পুরো ভ্রমণ অভিজ্ঞতাকে আরও উন্নত করে প্রিমিয়াম যাত্রীদের কাছে নিজেদের আকর্ষণীয় করে তোলা।
সব মিলিয়ে ২০১৮ সালে যে প্রযুক্তি থেকে সরে গিয়েছিল আমেরিকান এয়ারলাইনস, ২০২৮ সালে সেটিই নতুন প্রযুক্তি ও উন্নত সুবিধা নিয়ে আবার ফিরছে। সিট-ব্যাক স্ক্রিন, ব্লুটুথ হেডফোন, দ্রুতগতির স্টারলিংক ইন্টারনেট, উন্নত লাউঞ্জ এবং প্রিমিয়াম আসন—সব মিলিয়ে বিমান সংস্থাটি এবার যাত্রী অভিজ্ঞতায় বড় ধরনের বিনিয়োগের পথে হাঁটছে।
আমেরিকান এয়ারলাইনসের প্রধান কাস্টমার অফিসার হিদার গারবডেন বলেন, উড়োজাহাজে যাত্রী অভিজ্ঞতা উন্নয়নে এটি প্রতিষ্ঠানটির ইতিহাসের অন্যতম বড় বিনিয়োগ।
সূত্র: দ্যা নিউ ইয়র্ক টাইমস