দুই দেশের মিলিত ভূপ্রকৃতিতে গড়ে উঠছে নতুন পর্যটন এলাকা

ইতালি ও স্লোভেনিয়ার সীমান্তঘেঁষা কার্স্ট অঞ্চলকে ঘিরে গড়ে উঠছে নতুন এক আন্তঃসীমান্ত পর্যটন এলাকা। ভূগর্ভস্থ গুহা, নদী, চুনাপাথরের অনন্য গঠন, মধ্যযুগীয় গ্রাম, স্থানীয় খাবার ও শতাব্দীপ্রাচীন সংস্কৃতির সমন্বয়ে অঞ্চলটি ধীরে ধীরে নিজস্ব পর্যটন পরিচয় তৈরি করছে। অতিরিক্ত পর্যটনের চাপে থাকা ইতালি ও স্লোভেনিয়ার জনপ্রিয় গন্তব্যগুলোর বিকল্প হিসেবে তুলনামূলক নিরিবিলি ও স্থানীয় অভিজ্ঞতার খোঁজে থাকা পর্যটকদের আকৃষ্ট করাই এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।

এই অভিন্ন ভূপ্রকৃতি, ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে সামনে আনতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আন্তঃসীমান্ত ভূউদ্যান জিওকার্স্ট। ভবিষ্যতে অঞ্চলটির জন্য ইউনেস্কোর স্বীকৃতি পাওয়ারও উদ্যোগ চলছে।

ভূগর্ভে লুকিয়ে থাকা কার্স্টের বিস্ময়

পশ্চিম স্লোভেনিয়া ও পূর্ব ইতালিজুড়ে বিস্তৃত কার্স্ট অঞ্চল মূলত পানিতে সহজে দ্রবীভূত হওয়া ছিদ্রযুক্ত চুনাপাথরের ভূপ্রকৃতির জন্য পরিচিত। এই বিশেষ ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের কারণে ভূ-পৃষ্ঠে তৈরি হয়েছে দাগকাটা পাথর, গভীর গর্ত ও ধসেপড়া চুনাপাথরের অসংখ্য অববাহিকা। আর মাটির নিচে রয়েছে বিশাল গুহা, গভীর গর্ত ও ভূগর্ভস্থ নদীর বিস্ময়কর জগৎ।

এ অঞ্চলের অন্যতম পরিচিত গুহা ভিলেনিৎসা। পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত বিশ্বের প্রাচীনতম গুহাগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত এই গুহায় ১৬৩৩ সাল থেকেই দর্শনার্থীদের আগমনের তথ্য রয়েছে। লৌহ অক্সাইডের প্রভাবে লাল, পোড়ামাটি ও কমলা রঙের ছোপ পড়া স্ট্যালাগমাইট-স্ট্যালাকটাইট এবং ঝিকমিক করা স্ফটিক গুহাটিকে করেছে অনন্য।

আরেক গুরুত্বপূর্ণ আকর্ষণ শকোচিয়ান গুহা। এখানে প্রায় ১৫০ মিটার উঁচু বিশাল ভূগর্ভস্থ কক্ষের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত ভূগর্ভস্থ নদী কার্স্ট অঞ্চলের ভূতাত্ত্বিক বৈচিত্র্যের অন্যতম বড় উদাহরণ।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আন্তঃসীমান্ত ভূউদ্যান জিওকার্স্ট। ছবি: সংগৃহীত

দুই দেশের এক অভিন্ন ভূদৃশ্য

কার্স্ট অঞ্চলের গ্রামগুলোও এর বিশেষ আকর্ষণ। গত শতাব্দীতে ইতালি ও স্লোভেনিয়ার সীমান্ত একাধিকবার পরিবর্তিত হলেও বর্তমানে অঞ্চলটির অনেক মানুষ নিজেদের দুই দেশের বিস্তৃত একটি অভিন্ন ভূখণ্ডের অংশ হিসেবে দেখছেন।

দ্বিভাষিক গ্রাম, অভিন্ন প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং পারস্পরিক সাংস্কৃতিক যোগাযোগ এই অঞ্চলের স্বাতন্ত্র্য তৈরি করেছে। পর্যটন পরিকল্পনায় তাই শুধু একটি দেশের গন্তব্য নয়, বরং সীমান্তের দুই পাশের ইতিহাস, প্রকৃতি ও সংস্কৃতিকে একসঙ্গে তুলে ধরা হচ্ছে।

মধ্যযুগীয় শ্তানিয়েলে

কার্স্টের অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্য শ্তানিয়েলে। প্রাগৈতিহাসিক ও রোমান যুগের ইতিহাস বহন করা এই মধ্যযুগীয় গ্রামটির স্থাপত্যে এখনও স্থানীয় কার্স্ট পাথরের ব্যবহার স্পষ্ট। শত শত বছর পরেও অনেক ভবন প্রায় অক্ষত রয়েছে।

গ্রামটির পাথর বিছানো রাস্তা, ঐতিহাসিক স্থাপনা এবং তুলনামূলক কম পর্যটকসমাগম এটিকে ধীরগতির ভ্রমণের জন্য আকর্ষণীয় করে তুলেছে। স্থানীয় খাবার ও পানীয়ও পর্যটকদের অভিজ্ঞতায় যোগ করছে নতুন মাত্রা।

ত্রিয়েস্তেতে ইতালি ও অস্ট্রিয়ার মেলবন্ধন

কার্স্টের ইতালীয় অংশের অন্যতম প্রধান শহর ত্রিয়েস্তে। ইতালীয় সংস্কৃতির পাশাপাশি দীর্ঘ অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় শাসনের প্রভাব শহরটির স্থাপত্য ও জীবনযাত্রায় এখনও দৃশ্যমান। ভিয়েনার শিল্পরীতির স্থাপত্য ও ইতালীয় ক্যাফে সংস্কৃতির মেলবন্ধন শহরটিকে দিয়েছে আলাদা বৈশিষ্ট্য।

স্থানীয়দের মতে, এই সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ত্রিয়েস্তেকে তুলনামূলক উদার ও সহনশীল শহরে পরিণত করেছে। বয়স্ক বাসিন্দাদের মধ্যে অস্ট্রিয়ার সঙ্গে পুরোনো সম্পর্কের স্মৃতিও এখনও প্রবল।

শহরের আরেক আকর্ষণ প্রকৃতির সহজ সান্নিধ্য। কেন্দ্র থেকে প্রায় ১৫ মিনিট দূরেই রয়েছে প্রায় ৩ মাইল দীর্ঘ ভিয়া নাপোলেওনিকা হাঁটার পথ। এই পথ থেকে ত্রিয়েস্তে উপসাগরের বিস্তৃত দৃশ্য দেখা যায় এবং এটি অপিচিনা ও প্রোসেক্কো শহরকে যুক্ত করেছে। প্রোসেক্কো থেকেই একই নামের বিখ্যাত ঝকঝকে মদের নাম এসেছে।

কার্স্ট অঞ্চলের ভূতাত্ত্বিক বৈচিত্র্য। ছবি: সংগৃহীত

স্থানীয় খাবারে কার্স্টের স্বাদ

কার্স্ট অঞ্চলের পর্যটনের আরেকটি বড় আকর্ষণ স্থানীয় খাদ্যসংস্কৃতি। অধিকাংশ খাদ্যপণ্য স্থানীয় কৃষকদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়। এর মধ্যে বিশেষ অভিজ্ঞতা হতে পারে পারিবারিকভাবে পরিচালিত ছোট খামার ও আঙুরখেত, যেগুলো স্থানীয়ভাবে ‘ওসমিৎসে’ নামে পরিচিত।

কান্তিনা পারোভেলে এমনই একটি পারিবারিক উদ্যোগ। পাইনগাছের ছায়ায় সেখানে পরিবেশন করা হয় ঘরে তৈরি চিজ, ওয়াইন, প্রোসিউতো, মধু ও জলপাইয়ের তেল।

পারোভেলে পরিবারের ইতিহাসও এই অঞ্চলের সীমান্ত পরিবর্তনের প্রতিচ্ছবি। পরিবারের টানা তিন প্রজন্ম একই গ্রামে জন্মেছেন। তবে দাদা-দাদির প্রজন্মের জন্ম অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সাম্রাজ্যের সময়, বাবা-মায়ের প্রজন্মের জন্ম ইতালিতে এবং সন্তানদের প্রজন্মের জন্ম স্লোভেনিয়ায়।

হাঁটার পথেই ওসমিৎসে

রোসান্দ্রা উপত্যকার মধ্য দিয়ে প্রায় ৪ মাইলের একটি হাঁটার পথ পেরিয়ে পৌঁছানো যায় পারোভেলে পরিবারের ওসমিৎসেতে। মিহেলে গ্রাম থেকে শুরু হওয়া এই পথে আলপে আদ্রিয়া ট্রেইলের ৩৬ নম্বর ধাপের একটি অংশও রয়েছে।

বুনো চেরিগাছ ও হরিণে ভরা এই পথের আরেক আকর্ষণ অস্থায়ী ‘ওয়াইন গুহা’। প্রাকৃতিক গহ্বরের মধ্যে স্থানীয় ওয়াইন ও চিজ রেখে দেওয়া হয়, যাতে পথিকেরা সেগুলো নিয়ে খেতে পারেন এবং ইচ্ছামতো মূল্য রেখে যেতে পারেন। কোথাও কোথাও কাঠের বসার ব্যবস্থা রয়েছে, যেখান থেকে উপত্যকার দৃশ্য উপভোগ করা যায়।

ধীরগতির পর্যটনের নতুন সম্ভাবনা

কার্স্ট অঞ্চলের নতুন আন্তঃসীমান্ত ভূউদ্যান উদ্যোগের মূল লক্ষ্য শুধু নতুন পর্যটনকেন্দ্র তৈরি নয়; বরং দুই দেশের অভিন্ন প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে একসঙ্গে তুলে ধরা। গুহা ও ভূগর্ভস্থ নদী থেকে শুরু করে মধ্যযুগীয় গ্রাম, স্থানীয় খাবার, হাঁটার পথ ও পারিবারিক ঐতিহ্য—সব মিলিয়ে এখানে তৈরি হচ্ছে তুলনামূলক ধীরগতির ও স্থানীয় অভিজ্ঞতাভিত্তিক পর্যটনের সুযোগ।

জনপ্রিয় গন্তব্যগুলোর অতিরিক্ত পর্যটনের চাপ এড়িয়ে যারা প্রকৃতি, ইতিহাস ও স্থানীয় জীবনযাত্রার কাছাকাছি যেতে চান, তাদের জন্য ইতালি-স্লোভেনিয়ার সীমান্তবর্তী কার্স্ট অঞ্চল হয়ে উঠতে পারে ইউরোপের নতুন আকর্ষণ।

এই ভ্রমণের আয়োজন করেছিল ফ্রিউলি-ভেনেজিয়া জুলিয়া অঞ্চলের পর্যটন সংস্থা প্রোমো তুরিজমো এফভিজি এবং স্লোভেনিয়ার ভিজিট ক্রাস।