ঢাকার বুকে পর্তুগিজ আমলের স্মৃতি জপমালা রানী গির্জায় একদিন

ঢাকার তেজগাঁওয়ের ব্যস্ত সড়ক, যানজট আর আধুনিক ভবনের ভিড় পেরিয়ে হঠাৎ চোখে পড়বে কয়েক শতাব্দী পুরোনো এক স্থাপনা। পবিত্র জপমালা রানী গির্জা বা হলি রোজারি চার্চ, যার সম্মুখভাগে খোদাই করা ১৬৭৭ সালের তারিখটি ঢাকার দীর্ঘ ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। ঢাকার আর্চডায়োসিসও গির্জাটিকে ১৬৭৭ সালের বলে উল্লেখ করেছে।

পর্তুগিজদের হাত ধরে ঢাকায় গির্জার ইতিহাস

মুঘল আমলে বাণিজ্যের প্রসারের সঙ্গে ঢাকায় এসেছিলেন ইউরোপীয় ব্যবসায়ী ও ধর্মপ্রচারকেরা। পর্তুগিজদের উপস্থিতি ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হয় ১৬ শতকের শেষভাগে। তাদের সঙ্গে এসেছিলেন খ্রিষ্টান ধর্মপ্রচারকরাও। তেজগাঁওয়ের এই গির্জাটি সেই সময়ের স্মৃতি বহন করে আসছে।

ঐতিহাসিক সূত্রে গির্জাটির নির্মাণকাল নিয়ে কিছু মতভেদ রয়েছে। কোনও কোনও পুরোনো বিবরণে ১৫৯৯ সালের কথা বলা হয়েছে, আবার ইতিহাসবিদ আহমদ হাসান দানির মতে বর্তমান গির্জাটি ১৬৭৭ সালে নির্মিত। ভবনের সম্মুখভাগে ১৬৭৭ সালের উল্লেখ থাকায় এই তারিখটিই সবচেয়ে বেশি স্বীকৃত।

স্থাপত্যেও ইতিহাসের ছাপ

গির্জাটির স্থাপত্যে ইউরোপীয় ও স্থানীয় নির্মাণশৈলীর মিশ্র প্রভাব দেখা যায়। দীর্ঘ আয়তাকার মূল প্রার্থনাকক্ষ, দুই পাশে সরু অংশ এবং পুরোনো খিলান ও স্তম্ভে স্থাপনাটির চেহারায় রয়েছে কয়েক শতাব্দী আগের নির্মাণরীতির ছাপ।

সময়ের সঙ্গে গির্জাটিতে সংস্কারও হয়েছে। ১৯৪০ সালে বড় ধরনের সংস্কারের পাশাপাশি পরবর্তী সময়েও সংরক্ষণকাজ চালানো হয়েছে। ২০০০ সালে একটি বড় সংরক্ষণ প্রকল্পও সম্পন্ন হয়।

দেয়ালে-দেয়ালে পুরোনো সময়ের গল্প

গির্জার ভেতরে ও আশপাশে রয়েছে পুরোনো সমাধি ও স্মৃতিফলক। এসব শিলালিপির কিছু পর্তুগিজ, লাতিন ও ইংরেজি ভাষায় লেখা। ফলে এখানে শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়, পুরোনো ঢাকার আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও ইউরোপীয় যোগাযোগের ইতিহাসেরও নানা চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায়।

আধুনিক ঢাকার মাঝেও অন্য এক আবহ

আজকের তেজগাঁও পুরোপুরি বদলে গেলেও গির্জার প্রাঙ্গণে ঢুকলে ব্যস্ত রাজধানীর সঙ্গে যেন তৈরি হয় এক অদ্ভুত বৈপরীত্য। চারপাশের আধুনিক ভবন ও যানবাহনের কোলাহলের মধ্যে কয়েক শতাব্দী পুরোনো স্থাপত্যটি দর্শনার্থীকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় ঢাকার অতীতের এক ভিন্ন সময়ে।

ইতিহাস ও স্থাপত্যপ্রেমীদের জন্য তাই এটি হতে পারে রাজধানীর ভেতরেই ছোট্ট এক হেরিটেজ ট্রিপের গন্তব্য। তবে এটি সক্রিয় ধর্মীয় উপাসনালয় হওয়ায় দর্শনার্থীদের প্রার্থনার সময় ও ধর্মীয় পরিবেশের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা উচিত।

একদিকে ব্যস্ত তেজগাঁও, অন্যদিকে প্রায় সাড়ে তিন শতাব্দীর ইতিহাস এই বৈপরীত্যই পবিত্র জপমালা রানী গির্জাকে ঢাকার অন্যতম আকর্ষণীয় ঐতিহাসিক স্থাপনায় পরিণত করেছে।