শহরে রাত মানেই আলো। রাস্তার বাতি, বাড়ির জানলা, গাড়ির হেডলাইট, দোকানের সাইনবোর্ড সব মিলিয়ে অন্ধকার যেন শহর থেকে হারিয়েই গেছে। অথচ পৃথিবীর কোথাও কোথাও এমন গ্রামও রয়েছে, যেখানে রাতের অন্ধকারকে আগলে রাখাই স্থানীয়দের অন্যতম লক্ষ্য। সেখানে রাত যত গভীর হয়, আকাশ তত স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একসময় শহরের আলোয় হারিয়ে যাওয়া অসংখ্য তারা তখন চোখের সামনে জ্বলজ্বল করতে থাকে।
মহারাষ্ট্রের নাশিক জেলার পাহাড়ি গ্রাম উধমাল ঠিক তেমনই এক জায়গা। এখানে অন্ধকার কোনও সমস্যা নয়, বরং সেটিই পর্যটনের মূল আকর্ষণ। কৃত্রিম আলোর ব্যবহার নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় রাতের আকাশ দেখা যায় অনেক বেশি পরিষ্কারভাবে। তাই শহরের আলো থেকে দূরে গিয়ে নক্ষত্রখচিত আকাশ দেখতে এখন এই ছোট্ট গ্রামটিতে ভিড় করছেন পর্যটকেরা।
যেখানে রাত মানেই তারার উৎসব
উধমালে রাত নামার পর শহুরে জীবনের পরিচিত দৃশ্যগুলোর অনেকটাই অনুপস্থিত। নেই উজ্জ্বল বিজ্ঞাপনের আলো, নেই রাস্তার সর্বত্র তীব্র আলোকসজ্জা। রাত ৮টার পর অপ্রয়োজনীয় কৃত্রিম আলো জ্বালানোও নিষিদ্ধ।
ফলে আলো কমতেই আকাশের আসল রূপ ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একের পর এক তারা ফুটে ওঠে অন্ধকার আকাশে। পরিষ্কার রাতে নক্ষত্রপুঞ্জের পাশাপাশি চোখে পড়তে পারে ছায়াপথও। যারা রাতের আকাশ দেখতে ভালোবাসেন, তাদের কাছে এমন অভিজ্ঞতা শহুরে জীবনে প্রায় অসম্ভব।
এই কারণেই উধমাল ধীরে ধীরে ভারতের অ্যাস্ট্রো-ট্যুরিজমের মানচিত্রে জায়গা করে নিচ্ছে।
অন্ধকারই যেখানে সম্পদ
উধমাল নাশিক জেলার সুরগাণা তালুকের একটি ছোট পাহাড়ি গ্রাম। এখানে বাস করেন মূলত কোকনা আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ। জনসংখ্যাও খুব বেশি নয়, প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০।
গ্রামটিতে নেই বড় কোনও ঐতিহাসিক স্থাপনা, বিলাসবহুল রিসর্ট কিংবা শহুরে বিনোদনের আয়োজন। এত দিন পর্যটন মানচিত্রেও খুব পরিচিত ছিল না উধমাল। কিন্তু প্রকৃতির একটি সম্পদকে ঘিরেই বদলাতে শুরু করেছে গ্রামের পরিচিতি, সেটি হলো নির্মল রাতের আকাশ।
স্থানীয় বাসিন্দারাই প্রথম উপলব্ধি করেন, তাদের গ্রামের অন্ধকার আকাশ আসলে বিরল এক প্রাকৃতিক সম্পদ। সেটিকে সংরক্ষণ করার উদ্যোগ শুরু হয়। ‘পেসা’ আইনের আওতায় গ্রামটিকে ‘ডার্ক স্কাই কমিউনিটি’ হিসেবে গড়ে তোলার প্রস্তাব দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘ডার্কস্কাই ইন্টারন্যাশনাল’-এর কর্মসূচির সঙ্গেও উধমালের নাম যুক্ত হয়।
আলোর দূষণ থেকে মুক্ত আকাশ
শহরের রাতের আকাশ কেন এত অন্ধকারহীন, তার অন্যতম কারণ আলোক দূষণ। রেস্তোরাঁ, শপিং মল, বাজার, রাস্তার বাতি, বাড়ির বাইরের আলো কিংবা বিজ্ঞাপনের সাইনবোর্ডে রাতেও শহরের আকাশে বিপুল পরিমাণ কৃত্রিম আলো ছড়িয়ে পড়ে।
এই অতিরিক্ত আলো শুধু রাতের স্বাভাবিক পরিবেশই বদলায় না, আকাশের অসংখ্য নক্ষত্রকেও মানুষের চোখের আড়ালে ঠেলে দেয়। কৃত্রিম আলোর উজ্জ্বলতার কারণে দূরের ক্ষীণ আলোর তারাগুলো আর স্পষ্ট দেখা যায় না।
আলোক দূষণের বিভিন্ন ধরন রয়েছে। কোনও বাইরের আলো যখন অন্যের বাড়ির ভেতরে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে ঢুকে পড়ে, তাকে বলা হয় ‘লাইট ট্রেসপাস’। প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত উজ্জ্বল আলো ব্যবহারের সঙ্গে যুক্ত সমস্যা ‘ওভার ইলুমিনেশন’। আবার বিভিন্ন রঙ ও উৎসের অতিরিক্ত আলো একসঙ্গে ব্যবহারের ফলে তৈরি হয় ‘লাইট ক্লাটার’।
উধমালে এই ধরনের কৃত্রিম আলোর ব্যবহার যতটা সম্ভব সীমিত রাখা হয়। ফলে রাতের অন্ধকার সেখানে অক্ষুণ্ণ থাকে এবং আকাশও থাকে অনেক বেশি পরিষ্কার।
পর্যটকের চোখে অন্য এক রাত
উধমালে বেড়াতে গেলে মূল আকর্ষণ কোনো স্থাপত্য বা বিনোদনকেন্দ্র নয়। বরং কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকাই হয়ে উঠতে পারে ভ্রমণের সবচেয়ে বড় অভিজ্ঞতা।
দূরবিন ছাড়াও পরিষ্কার রাতে আকাশে দেখা যেতে পারে অসংখ্য তারা ও নক্ষত্রপুঞ্জ। শহরের কৃত্রিম আলোর আড়ালে যেসব দৃশ্য হারিয়ে যায়, এখানে সেগুলোই রাতের প্রধান সৌন্দর্য।
অন্ধকারে বসে তারাভরা আকাশ দেখা, স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে পরিচিত হওয়া এবং প্রকৃতির কাছাকাছি কিছুটা সময় কাটানো উধমালের ভ্রমণকে অন্যরকম করে তুলতে পারে।
কীভাবে যাবেন?
কলকাতা থেকে উধমাল যেতে প্রথমে নাশিক পৌঁছাতে হবে। হাওড়া বা শালিমার থেকে মুম্বইগামী ট্রেনে নাশিক রোড স্টেশনে নামা যায়। সেখান থেকে বাস বা গাড়িতে সুরগাণা তালুকে পৌঁছাতে হবে। এরপর পাহাড়ি পথ ধরে ট্যাক্সি বা জিপে উধমাল গ্রামে যাওয়া যায়।
বিমানে যেতে চাইলে কলকাতা থেকে মুম্বই বা পুণে যাওয়া যায়। সেখান থেকে সড়কপথ বা ট্রেনে নাশিক পৌঁছে পরবর্তী যাত্রা করা সম্ভব।
কোথায় থাকবেন?
উধমালে শহরের মতো বড় হোটেল বা বিলাসবহুল রিসর্টের প্রত্যাশা না করাই ভালো। বরং স্থানীয় মানুষের আতিথেয়তাই এই ভ্রমণের অন্যতম আকর্ষণ হতে পারে। কোকনা আদিবাসী পরিবারের মাটির বাড়িতে থাকার সুযোগ পাওয়া যেতে পারে। স্থানীয়ভাবেই খাবারের ব্যবস্থাও করা হয়।
পর্যটকের আনাগোনা বাড়ায় এলাকায় হোম-স্টের ব্যবস্থাও ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছে। তবে থাকার পাশাপাশি স্থানীয় নিয়ম মেনে চলাটাও জরুরি। বিশেষ করে রাত ৮টার পর অপ্রয়োজনীয় আলো ব্যবহার না করাই এই গ্রামের পরিবেশ ও ‘ডার্ক স্কাই’ বৈশিষ্ট্য ধরে রাখার অন্যতম শর্ত।
শহরের বাইরে অন্ধকারের খোঁজে
আজকের পৃথিবীতে অন্ধকারকে আমরা অনেক সময় এড়িয়ে চলতে চাই। অথচ উধমাল দেখাচ্ছে, অন্ধকারও যে একটি মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ হতে পারে। শহরের আলোর নিচে হারিয়ে যাওয়া রাতের আকাশকে ফিরিয়ে আনাই যে একটি পর্যটন আকর্ষণ হয়ে উঠতে পারে, তারই উদাহরণ এই ছোট্ট পাহাড়ি গ্রাম।
তাই ভ্রমণে যদি সমুদ্র, পাহাড় কিংবা জঙ্গলের বদলে এবার একটু অন্যরকম অভিজ্ঞতা খুঁজে থাকেন, উধমাল হতে পারে আপনার গন্তব্য। সেখানে রাত কাটানোর সবচেয়ে বড় আয়োজন কোনো আলো নয়, আলো থেকে দূরে সরে গিয়ে অসংখ্য তারার আলোয় রাতকে নতুন করে দেখা।