স্লোভেনিয়ার গোপন উপত্যকায় ধীরগতির ভ্রমণের নতুন গল্প

স্লোভেনিয়ার ভিপাভা উপত্যকা দীর্ঘদিন ধরে পর্যটন মানচিত্রে অনেকটাই আড়ালে। সাধারণত ওয়াইন অঞ্চল হিসেবেই পরিচিত এই উপত্যকা এখন স্থানীয় উদ্যোক্তাদের ছোট ছোট উদ্যোগে ধীরে ধীরে গড়ে তুলছে ভিন্নধারার পর্যটন অভিজ্ঞতা। লক্ষ্য, পর্যটক বাড়ানো হলেও এলাকার নিজস্ব সংস্কৃতি ও জীবনযাপন যেন বদলে না যায়।

রাজধানী লিউব্লিয়ানা থেকে গাড়িতে প্রায় এক ঘণ্টা দক্ষিণ-পশ্চিমে ভিপাভা উপত্যকা। সীমান্তবর্তী নোভা গোরিৎসার কাছে এসে এটি ইতালির সঙ্গে মিলেছে। উত্তরের সোচা উপত্যকার মতো এখানে পর্যটকদের ভিড় নেই। বরং পাহাড়, আঙুরখেত, গ্রাম ও ভিপাভা নদী ঘিরে শান্ত পরিবেশই এখানকার প্রধান আকর্ষণ।

আল্পস থেকে নেমে আসা প্রবল ‘বুরজা’ বাতাস ভিপাভার ভূদৃশ্য ও কৃষিকে প্রভাবিত করেছে। শুষ্ক মাটি ও আবহাওয়া এখানকার ওয়াইন ও শুকনো মাংস তৈরির জন্য উপযোগী।

পুরোনো খামারবাড়িতে নতুন আবাসন

প্লানিনা গ্রামের ওয়েলবা গেস্টহাউসের মাধ্যমে পর্যটনের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছেন স্থানীয় দম্পতি মার্কো ও তেরেজা কোবাল। পরিত্যক্ত একটি পুরোনো খামারবাড়ি তারা ঐতিহ্যবাহী উপকরণ ও কারুশিল্প ব্যবহার করে অতিথিকক্ষ ও অ্যাপার্টমেন্টে রূপান্তর করেছেন।

বাড়িটির পুরোনো ‘ব্ল্যাক কিচেন’ এখনও সংরক্ষিত। বারান্দা থেকে দেখা যায় পাশের খামার ও উপত্যকার দৃশ্য। পাশের আরেকটি পুরোনো ভবনও সংস্কার করে ২০২৭ সালে চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।

পেদ্রোভোয় ফিরছে প্রাণ

পাহাড়ি গ্রাম পেদ্রোভোতেও গড়ে উঠছে ছোট পারিবারিক উদ্যোগ। চিলচেভি ফার্মস্টেডে টম লোচনিশকার ও বোরুত কোকাল স্থানীয় ভেড়া ও ছাগল পালন করেন এবং সেগুলোর দুধ থেকে তৈরি করেন বিভিন্ন ধরনের চিজ।

একসময় পেদ্রোভোর জনসংখ্যা প্রায় ১,০০০ হলেও ১৯৭০-এর দশকে স্থায়ী বাসিন্দা কমে মাত্র দু’জনে নেমে এসেছিল। বর্তমানে সেখানে প্রায় ২০ জন স্থায়ী বাসিন্দা রয়েছেন। পর্যটন ও স্থানীয় ব্যবসার বিকাশে গ্রামটি আবারও প্রাণ ফিরে পাচ্ছে।

এখানে স্থানীয় খাবার ও ব্যারেল থেকে সরাসরি পরিবেশন করা ওয়াইনের সঙ্গে পর্যটকেরা উপভোগ করতে পারেন ঘরোয়া পরিবেশ।

সাইকেল, হাইকিং ও ওয়াইন

স্থানীয় উদ্যোক্তা জানি পেলহানের প্রতিষ্ঠান ওয়াজদুশনা জিপিএস-নির্দেশিত সাইকেল ট্যুর, হাইকিং ও প্যারাগ্লাইডিংয়ের আয়োজন করে। আঙুরখেতের মধ্য দিয়ে ই-বাইকে ঘোরার পাশাপাশি রোমান আমলের ধ্বংসাবশেষ ও ভিপাভস্কি ক্রিঝে দেখার সুযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া ‘ওয়াইন ট্রেন’ চালুর পরীক্ষাও চলছে। নোভা গোরিৎসা থেকে পর্যটকদের আঙুরখেতে নিয়ে গিয়ে স্থানীয় ওয়াইন প্রস্তুতকারকের নেতৃত্বে ওয়াইন চেখে দেখার আয়োজন করা হচ্ছে।

ওয়াইন ও খাবারে স্থানীয় স্বাদ

ভিপাভায় ওয়াইন পর্যটন মানে শুধু বড় ব্র্যান্ডের আয়োজন নয়। জালোশ্চের ভিনা লিসজাকে স্থানীয় খামারের শুকনো মাংস, পাহাড়ি চিজ, ফ্রিটাটা ও অন্যান্য খাবারের সঙ্গে পরিবেশন করা হয় স্থানীয় ওয়াইন।

ফেরিয়ানচিচ ভিনইয়ার্ডে সপ্তম প্রজন্মের ওয়াইন প্রস্তুতকারক মাতিচ ফেরিয়ানচিচ পারিবারিক ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন। তার পরিবারের আঙুরখেত এখন ৫০ হাজার গাছে বিস্তৃত।

আর জেমোনো ম্যানরের গোস্তিলনা প্রি লইজেতু রেস্তোরাঁয় স্থানীয় উপকরণ নিয়ে আধুনিক রান্না পরিবেশন করেন মিশেলিন তারকাপ্রাপ্ত শেফ তোমাশ কাভচিচ। ভিপাভা নদীর ট্রাউট, স্থানীয় এপ্রিকট এবং ঐতিহ্যবাহী ‘জোতা’ স্টু মেনুর উল্লেখযোগ্য পদ।

ভিপাভার স্থানীয় উদ্যোক্তাদের লক্ষ্য তাই দ্রুত জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র হয়ে ওঠা নয়। তাদের ভাবনা, পর্যটন এমনভাবে বাড়বে, যাতে স্থানীয় মানুষ উপকৃত হন এবং একই সঙ্গে উপত্যকার প্রকৃতি, খাবার, ওয়াইন ও গ্রামীণ জীবনযাপনের স্বকীয়তাও অটুট থাকে।

সূত্র: দ্যা গার্ডিয়ান