ইতিহাসের পাতায় শুধু রাজপ্রাসাদ, দুর্গ কিংবা বিশাল মন্দিরই গল্প বলে না। কখনও কখনও একটি পুরোনো ঢিবি, ভগ্ন স্থাপনা কিংবা পোড়ামাটির নকশাতেও লুকিয়ে থাকে কয়েক শত বছরের ইতিহাস। তেমনই এক আকর্ষণীয় প্রত্নস্থল গোকুল মেড়।
বগুড়ার মহাস্থানগড়ে অবস্থিত প্রত্নস্থল গোকুল মেধ। বগুড়া সদর উপজেলার গোকুল গ্রামে অবস্থিত এই প্রত্নস্থল মহাস্থানগড় দুর্গনগরী থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে। স্থানীয়ভাবে এটি লখিন্দরের মেধ বা বেহুলা-লখিন্দরের বাসরঘর নামেও পরিচিত।
লোককথায় গোকুল মেধের সঙ্গে বেহুলা ও লখিন্দরের কাহিনি জড়িয়ে থাকলেও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এর চেয়েও প্রাচীন ইতিহাসের ইঙ্গিত দেয়। খননে এখানে একটি বিশাল ধর্মীয় স্থাপনার ভিত্তি পাওয়া যায়, যা প্রাথমিক পর্যায়ে বৌদ্ধ স্তূপ বা ধর্মীয় স্থাপনা হিসেবে নির্মিত হয়েছিল বলে প্রত্নতাত্ত্বিকদের ধারণা। এর নির্মাণকাল আনুমানিক ষষ্ঠ-সপ্তম শতক।
১৭২টি প্রকোষ্ঠের অনন্য স্থাপত্য
গোকুল মেধের সবচেয়ে বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য এর নির্মাণকৌশল। প্রত্নতাত্ত্বিক খননে একটি উঁচু ভিত্তির মধ্যে ১৭২টি অন্ধ প্রকোষ্ঠ বা কক্ষের সন্ধান পাওয়া যায়। এগুলো ধাপে ধাপে ওপরের দিকে উঠে গেছে এবং মাটিতে শক্তভাবে ভরাট করা ছিল। এই ধরনের স্তরভিত্তিক প্রকোষ্ঠ-নির্ভর নির্মাণ প্রাচীন বাংলার স্থাপত্যে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
১৯৩৪ থেকে ১৯৩৬ সালের মধ্যে প্রত্নতত্ত্ববিদ এন জি মজুমদার এখানে খননকাজ পরিচালনা করেন। খননের ফলে বেরিয়ে আসে স্থাপনাটির বিস্ময়কর কাঠামো ও নানা প্রত্ননিদর্শন।
বৌদ্ধ স্থাপনা থেকে শিবমন্দির?
গোকুল মেধের ইতিহাসের আরেকটি আকর্ষণীয় দিক হলো এর ধর্মীয় ব্যবহারের পরিবর্তন। প্রাথমিক স্থাপনাটি বৌদ্ধ ধর্মীয় স্থাপনা বা স্তূপের ভিত্তি ছিল বলে ধারণা করা হয়। পরে সেন আমলে এখানে একটি বর্গাকার মন্দির ও বারান্দা নির্মিত হয়।
খননের সময় কেন্দ্রীয় অংশে একটি পাথরের ফলক পাওয়া যায়। তাতে ছোট ছোট গর্তের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় অংশে থাকা একটি ক্ষুদ্র সোনার পাতের ওপর শুয়ে থাকা ষাঁড়ের অবয়ব পাওয়া যায়। এই নিদর্শন থেকে পরবর্তী পর্যায়ে স্থাপনাটির সঙ্গে শিব উপাসনার সম্পর্কের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
পোড়ামাটির ফলকেও প্রাচীন বাংলার গল্প
গোকুল মেধে খননের সময় দেরি গুপ্ত যুগের পোড়ামাটির ফলকসহ বিভিন্ন প্রত্ননিদর্শন পাওয়া গেছে। এসব নিদর্শন প্রাচীন বাংলার শিল্প, ধর্ম ও স্থাপত্যের ইতিহাস বুঝতে গুরুত্বপূর্ণ।
আজ প্রত্নস্থলে দাঁড়িয়ে সেই প্রাচীন স্থাপনার পুরো রূপ কল্পনা করা সহজ নয়। তবে মাটির উঁচু ভিত্তি, ইটের কাঠামো এবং একসময়কার প্রকোষ্ঠগুলোর বিন্যাস দর্শনার্থীদের সামনে কয়েক শতাব্দী আগের নির্মাণপ্রযুক্তির একটি ধারণা তুলে ধরে।
বেহুলা-লখিন্দরের গল্পও শুনবেন
গোকুল মেধের সঙ্গে স্থানীয় লোকবিশ্বাসের সবচেয়ে পরিচিত যোগ বেহুলা-লখিন্দরের কাহিনি। প্রচলিত বিশ্বাসে এটিকে লখিন্দরের মেধ বা তাঁদের বাসরঘর হিসেবে অভিহিত করা হয়। তবে এই পরিচয় মূলত লোককথার অংশ; প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ স্থাপনাটির প্রাচীন ধর্মীয় স্থাপনার ইতিহাসের দিকেই ইঙ্গিত করে।
মহাস্থানগড়ের সঙ্গে এক সফরে
গোকুল মেধের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এটি মহাস্থানগড়ের খুব কাছেই। ফলে বগুড়া ভ্রমণে মহাস্থানগড়ের পাশাপাশি গোকুল মেধ ঘুরে দেখা যায়। প্রাচীন নগর, মন্দির, স্তূপ ও অন্যান্য প্রত্নস্থলের সঙ্গে এই জায়গাটি মিলিয়ে দেখলে উত্তরবঙ্গের প্রাচীন ইতিহাস সম্পর্কে আরও বিস্তৃত ধারণা পাওয়া সম্ভব।
ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্বের পাশাপাশি বেহুলা-লখিন্দরের লোককথার প্রতি আগ্রহ থাকলেও গোকুল মেধ আলাদা আকর্ষণ তৈরি করবে। প্রাচীন বাংলার স্থাপত্য, প্রত্নতত্ত্ব আর লোককথা এই তিনটি ভিন্ন অভিজ্ঞতা এক জায়গায় পাওয়ার সুযোগ রয়েছে এখানে।









