মধ্য এশিয়ার দেশ কাজাখস্তানের বিস্তীর্ণ প্রান্তরজুড়ে এমন কিছু ভূদৃশ্য রয়েছে, যেগুলো দেখলে মনে হতে পারে অন্য কোনও গ্রহের ছবি দেখছেন। রঙিন গিরিখাত, স্তরে স্তরে সাজানো পাহাড় আর দুর্গের মতো পাথুরে কাঠামো। সব মিলিয়ে অঞ্চলটি যেন পৃথিবীর বাইরের কোনও জগৎ।
এই অদ্ভুত ভূদৃশ্য ঘুরে দেখতে প্রায় ৭০০ কিলোমিটারের যাত্রাপথে বের হন স্থানীয় গাইড ২৭ বছর বয়সী গাউখার ইয়েসিরকেপোভা। কাজাখস্তানের বিস্তীর্ণ স্টেপ অঞ্চলের এই ভ্রমণে পর্যটকদের সামনে আসে দেশটির অন্যতম আকর্ষণীয় কয়েকটি প্রাকৃতিক নিদর্শন।
যাত্রাপথের অন্যতম উল্লেখযোগ্য গন্তব্য বোকটি পর্বত। এর ঢালে দেখা যায় দীর্ঘ সময় ধরে প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হওয়া নানা স্তরের শিলাস্তর। এরপর রয়েছে কিজিলকুপ ক্যানিয়ন। এর পাথরের গায়ে সাদা, লাল ও বাদামি রঙের পরপর স্তর তৈরি করেছে ব্যতিক্রমী নকশা। দেখতে অনেকটা তিরামিসু কেকের স্তরের মতো হওয়ায় স্থানীয়ভাবে জায়গাটি ‘তিরামিসু ক্যানিয়ন’ নামেও পরিচিত।
তবে কাজাখস্তানের এই অঞ্চলের সবচেয়ে চমকপ্রদ আকর্ষণগুলোর একটি ইয়বিকটি সাই গিরিখাত। এর অস্বাভাবিক আকৃতি ও পাথুরে দেয়াল দেখে মনে হয়, এটি যেন পৃথিবীর কোনও ভূদৃশ্য নয়, কোনও দূর গ্রহের পৃষ্ঠ।
আরও দক্ষিণে রয়েছে বোঝিরা ক্যানিয়ন। বিশাল চুনাপাথরের পাহাড় ও খাড়া পাথুরে গঠন এখানে দুর্গের প্রাচীর বা প্রাসাদের মতো দেখতে। মরুভূমির বিস্তীর্ণ প্রান্তরের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা এসব শিলা কাজাখস্তানের অন্যতম পরিচিত প্রাকৃতিক দৃশ্য হয়ে উঠেছে।
এই ভূদৃশ্যগুলোর সৌন্দর্যের পেছনে রয়েছে আরও বিস্ময়কর এক ইতিহাস। কোটি কোটি বছর ধরে ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে তৈরি হওয়া এসব ভূমির বড় একটি অংশ একসময় সমুদ্রের তলায় ছিল। প্রাচীন টেথিস মহাসাগরের নিচে চাপা পড়ে থাকা সেই ভূখণ্ড পরবর্তী সময়ে ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তনের ফলে ধীরে ধীরে ওপরে উঠে আসে।
ফলে আজকের কাজাখস্তানের এই শুষ্ক ও মরুভূমির মতো ভূদৃশ্য আসলে বহন করছে এক প্রাচীন সমুদ্রের স্মৃতি। পাথরের স্তর, পাহাড়ের গঠন আর গিরিখাতের দেয়ালে সেই দীর্ঘ ভূতাত্ত্বিক ইতিহাসের ছাপ এখনও স্পষ্ট।
প্রকৃতির এই বৈচিত্র্যই কাজাখস্তানের পশ্চিমাঞ্চলকে অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় ভ্রমণকারীদের কাছে ক্রমেই আকর্ষণীয় করে তুলছে। শহরের কোলাহল থেকে দূরে, বিস্তীর্ণ স্টেপ, রঙিন ক্যানিয়ন ও অস্বাভাবিক পাথুরে ভূদৃশ্যের মধ্যে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা এখানে একই সঙ্গে রোমাঞ্চকর এবং ইতিহাসময়।
আজ যে ভূমিকে দেখে মনে হয় ভিনগ্রহের কোনও দৃশ্য, সেটিই একসময় ছিল প্রাচীন টেথিস মহাসাগরের তলদেশ। সেই কারণেই কাজাখস্তানের এই অঞ্চল শুধু সৌন্দর্যের জন্য নয়, পৃথিবীর বহু পুরোনো ভূতাত্ত্বিক ইতিহাসের এক অনন্য জানালা হিসেবেও ভ্রমণকারীদের আকর্ষণ করে।