ইতালির তাসকানি উপকূল ও কর্সিকার মাঝামাঝি সমুদ্রজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে টাস্কান দ্বীপপুঞ্জের সাতটি দ্বীপ। মূল ভূখণ্ডের তাসকানির তুলনায় এখানকার পরিবেশ একেবারেই আলাদা। সাতটি দ্বীপই একটি সংরক্ষিত জাতীয় উদ্যানের অন্তর্ভুক্ত হলেও প্রত্যেকটির রয়েছে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য। কোনও দ্বীপ প্রাণচঞ্চল ও পর্যটনসমৃদ্ধ, আবার কোনওটি ছোট, নির্জন এবং জনবসতিও খুব কম।
মন্তেক্রিস্তো ও গর্গোনা দ্বীপে প্রবেশের সুযোগ অত্যন্ত সীমিত এবং নির্দিষ্ট গাইডেড ট্যুরের মাধ্যমেই সেখানে যাওয়া যায়। তবে এলবা, জিলিও, ক্যাপ্রাইয়া, পিয়ানোসা ও জিয়ান্নুত্রি এই পাঁচ দ্বীপে রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতার হাতছানি। কোথাও ইতিহাস ও সৈকত, কোথাও পাহাড়ি পথ ও বন্য প্রকৃতি, আবার কোথাও নির্জনতার মধ্যে হারিয়ে যাওয়ার সুযোগ।
এলবা: সারা বছর ভ্রমণের জন্য উপযুক্ত
ইতালির তৃতীয় বৃহত্তম দ্বীপ এলবা টাস্কান দ্বীপপুঞ্জের অন্যতম প্রধান পর্যটনকেন্দ্র। সারা বছরই এখানে মানুষের বসবাস রয়েছে। নেপোলিয়নের ইতিহাস, পাহাড়ি প্রাকৃতিক দৃশ্য, প্রাণবন্ত সমুদ্রতীরবর্তী শহর এবং মনোরম সৈকত সব মিলিয়ে এলবার আকর্ষণ বেশ বৈচিত্র্যময়।
১৮১৪ সালে নেপোলিয়নের স্বল্পকালীন নির্বাসনের স্মৃতি বহন করছে পালাজ্জিনা দেই মুলিনি। তবে দ্বীপটির ইতিহাস আরও পুরোনো। উপকূলজুড়ে রয়েছে ১৬ শতকে মেডিচি পরিবারের তৈরি প্রতিরক্ষা দুর্গ, যা জলদস্যুদের হামলা ঠেকাতে ব্যবহৃত হত। দ্বীপের ভেতরে রয়েছে মধ্যযুগীয় পাহাড়ি শহরও। কয়েকটি শহরের অবস্থান এমন জায়গায়, যেখানে রোমান আমল থেকেই জনবসতি ছিল।
সৈকতপ্রেমীদের কাছে এলবার উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূল বিশেষ আকর্ষণীয়। উত্তরে পোর্তোফেরাইয়োর কাছে রয়েছে সাদা নুড়িপাথরের সানসোনে ও কাপো বিয়াঙ্কো। দক্ষিণ-পশ্চিমে মন্টে কাপান্নের পাদদেশে রয়েছে ফেতোভাইয়া ও কাভোলির সোনালি বালির সৈকত। দক্ষিণ উপকূলের মারিনা দি কাম্পো জলক্রীড়াপ্রেমীদের পছন্দের জায়গা। প্রক্কিও থেকে লাকোনা পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে উইন্ডসার্ফিং ও পালতোলা নৌকা চালানোর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও রয়েছে।
হাইকিংপ্রেমীদের জন্য এলবার অন্যতম আকর্ষণ গ্রান্ডে ত্রাভেরসাতা এলবানা। প্রায় ৫৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এই ট্রেক উত্তর-পূর্বের কাভো থেকে পশ্চিম উপকূলের পোমন্তে বা পাতরেসি পর্যন্ত বিস্তৃত। পাহাড়ের চূড়া, ঢাল ও ঐতিহ্যবাহী গ্রাম পেরিয়ে এই পথ অতিক্রম করতে সাধারণত তিন থেকে চার দিন সময় লাগে। বসন্ত ও শরৎকাল এই ট্রেকের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত।
পোর্তোফেরাইয়োয় রিস্তোরান্তে দা জিয়ান্নি-তে হাতে তৈরি পাস্তা, সামুদ্রিক খাবার ও ঐতিহ্যবাহী ইতালীয় পদ পাওয়া যায়। চিংড়ি ও জুচিনি দিয়ে তৈরি অরেকিয়েতে পাস্তা এখানকার বিশেষ পদ। মারিনা দি কাম্পোতে সমুদ্রসৈকতের পাশে দা পিয়েরো-তে পাওয়া যায় সামুদ্রিক খাবারের নানা আয়োজন।
থাকার জন্য ফেতোভাইয়ার কাছে হোটেল মন্তেমেরলো-তে জলপাইবাগানের মধ্যে নিরিবিলি পরিবেশ পাওয়া যায়। মারিনা দি কাম্পোতে রয়েছে পারিবারিকভাবে পরিচালিত হোটেল পুন্তো ভার্দে। পশ্চিম উপকূলে হোটেল গালো নেরো থেকে কাপো সান্ট’আন্দ্রেয়া উপসাগরের দৃশ্য দেখা যায়। আর পোর্তোফেরাইয়োর ঐতিহাসিক কেন্দ্রে ১৮ শতকের একটি ভবনে রয়েছে ইন্দারসেনা।
ইতালির মূল ভূখণ্ডের পিওম্বিনো থেকে পোর্তোফেরাইয়োতে ফেরিতে পৌঁছাতে প্রায় এক ঘণ্টা সময় লাগে। তোরেমার, মোবি ও ব্লু নেভি এই পথে ফেরি পরিষেবা দেয়।
জিলিও: ছোট্ট দ্বীপে শান্তির ঠিকানা
মাত্র ২১ বর্গকিলোমিটার আয়তনের জিলিও ছোট হলেও বৈচিত্র্যে ভরপুর। এখানে রয়েছে তিনটি গ্রাম, নির্জন উপসাগর, দীর্ঘ উপকূলরেখা এবং ঐতিহাসিক ধাপ-ধাপ আঙুরখেত। আগস্ট মাসে ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে দ্বীপে চলাচল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত থাকে। ফলে দ্বীপের শান্ত পরিবেশ অনেকটাই অটুট থাকে। বন্দর, গ্রাম ও সৈকতের মধ্যে বাস ও ট্যাক্সির ব্যবস্থা থাকায় গাড়ি ছাড়াই দ্বীপ ঘোরা সম্ভব।
জিলিও পোর্তো থেকে হাঁটার বিভিন্ন পথ চলে গেছে নির্জন উপসাগর ও পাহাড়চূড়ার দর্শনীয় স্থানের দিকে। আর ১২ শতকের দুর্গবেষ্টিত পাহাড়ি গ্রাম জিলিও কাস্তেলোর মধ্যযুগীয় সরু গলিতে সন্ধ্যায় হাঁটতে হাঁটতে স্থানীয় পরিবেশ উপভোগ করা যায়।
উত্তর-পশ্চিম উপকূলের কাম্পেসে দ্বীপের সবচেয়ে বড় সৈকত। লালচে-সোনালি বালির এই সৈকত থেকে ১৬ শতকের তোরে দেল কাম্পেসে দেখা যায়। পূর্বদিকে কান্নেলে রয়েছে হালকা রঙের বালি ও স্বচ্ছ জল। আর উত্তরের আরেনেল্লায় সোনালি বালির সঙ্গে রয়েছে গ্রানাইটের বড় পাথর এবং স্বচ্ছ জল, যা স্নরকেলিংয়ের জন্য উপযোগী।
জিলিও পোর্তোয় সমুদ্রের দৃশ্য-সহ টেরেসের জন্য রিস্তোরান্তে দোরিয়া জনপ্রিয়। সামুদ্রিক শজারুর মাংস ও টোস্ট করা ব্রেডক্রাম্ব দিয়ে তৈরি স্প্যাগেটি আল্লা কিতাররা এখানকার উল্লেখযোগ্য পদ। কাম্পেসেতে দা জিও মেইনো-তে পাওয়া যায় ঐতিহ্যবাহী ইতালীয় ‘কুচিনা পোভেরা’ বা সাধারণ মানুষের ঘরোয়া রান্না।
থাকার জন্য জিলিও পোর্তোর পাহাড়ের ঢালে রয়েছে বিবি লা ভেলা। কাম্পেসে উপসাগরের ওপরে লে পোস্টে দি সিমপ্লিচিও থেকেও সমুদ্রের বিস্তৃত দৃশ্য উপভোগ করা যায়।
পোর্তো সান্তো স্তেফানো থেকে তোরেমার বা মারেগিলিও-র ফেরিতে প্রায় এক ঘণ্টায় জিলিও পোর্তো পৌঁছানো যায়।
ক্যাপ্রাইয়া: হাইকারদের জন্য বুনো প্রকৃতির স্বর্গ
এলবার উত্তর-পশ্চিমে প্রায় ৩৩ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ক্যাপ্রাইয়া টাস্কান দ্বীপপুঞ্জের সবচেয়ে দুর্গম দ্বীপগুলোর একটি। গাড়ির চলাচল এখানে খুবই সীমিত এবং রাস্তাও হাতে গোনা। তাই দ্বীপটি ঘুরে দেখার সবচেয়ে ভালো উপায় হাঁটা।
সমুদ্রের খাড়া পাথুরে প্রান্তর, নির্জন উপসাগর এবং ১৬ শতকের জেনোয়িজ দুর্গের পাশ দিয়ে চলে যাওয়া পুরনো সরু পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে দ্বীপের প্রকৃত সৌন্দর্য আবিষ্কার করা যায়। উল্লেখযোগ্য আকর্ষণের মধ্যে রয়েছে লালচে পাথরের কালা রোসা, জেনোয়িজ দুর্গ সান জর্জিও এবং ১৬ শতকের তোরে দেল্লো জেনোবিতো।
দ্বীপে সৈকত খুব বেশি নেই। তবে কালা সান ফ্রান্সেসকোতে সাঁতার কাটা যায়। হাঁটার পথে পৌঁছানো যায় কালা দেল চেপ্পো ও কালা দেল্লো জুরলেত্তোতে। আর ট্যাক্সি নৌকায় যাওয়া যায় স্পিয়াজ্জা দেল্লা মর্তোলায়, যা দ্বীপের হাতে গোনা কয়েকটি বালুকাবেলার সৈকতের একটি।
দ্বীপের প্রধান গ্রামের ক্যারাবোত্তিনো রেস্তোরাঁয় নির্দিষ্ট মেনু স্থানীয় জেলেদের সেদিনের ধরা মাছের ওপর নির্ভর করে বদলে যায়। একটু আধুনিক স্বাদের খাবারের জন্য রয়েছে পিগিয়োলো। এখানে দ্বীপের ঐতিহ্যবাহী উপকরণকে আধুনিক রান্নার কৌশলে পরিবেশন করা হয়।
ক্যাপ্রাইয়ায় থাকার সুযোগ সীমিত। বন্দর এলাকার কাছে লা মান্দোলা ইকো হোস্টেল হাঁটাপ্রেমী, সৈকতপ্রেমী ও ডাইভিং করতে আসা পর্যটকদের জন্য ভালো আবাসন। ক্যাপ্রাইয়া গ্রামে রয়েছে ইল সারাচিনো বুটিক স্যুটস, যেখান থেকে সমুদ্রের মনোরম দৃশ্য উপভোগ করা যায়। লিভোর্নো থেকে তোয়েরামার ফেরিতে ক্যাপ্রাইয়া পৌঁছাতে প্রায় ১ ঘণ্টা ৪৫ মিনিট সময় লাগে।
পিয়ানোসা: প্রকৃতির সুরক্ষায় শান্ত এক দ্বীপ
পিয়ানোসার ভঙ্গুর প্রাকৃতিক পরিবেশ ও শান্ত আবহ রক্ষা করতে প্রতিদিন কত জন পর্যটক দ্বীপে যেতে পারবেন, তার সংখ্যা কঠোরভাবে নির্ধারিত। সীমিত ফেরি পরিষেবার টিকিট কেটে সরাসরি যাওয়া যায়, আবার অনুমোদিত গাইডেড ট্যুরেও অংশ নেওয়া যায়।
প্রকৃতির পাশাপাশি ইতিহাসও পিয়ানোসার বড় আকর্ষণ। দ্বীপে রয়েছে রোমান আমলের বিভিন্ন নিদর্শন, যার মধ্যে প্রাচীন খ্রিস্টানদের ক্যাটাকোম্বও রয়েছে। একসময় দ্বীপটি দণ্ড উপনিবেশ হিসেবে ব্যবহৃত হত। সেই সময়ের পরিত্যক্ত কারাগারগুলিও আজ অতীতের সাক্ষী। এ ছাড়া সংস্কার করা কাসা দেল্ল’আগ্রোনোমো এবং ভূতাত্ত্বিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক বিজ্ঞান জাদুঘর-তে দ্বীপের কৃষি, ভূতত্ত্ব ও প্রত্নতাত্ত্বিক ইতিহাস সম্পর্কে জানা যায়।
পিয়ানোসা ঘুরে দেখার অন্যতম সেরা উপায় হলো গাইডের সঙ্গে হাঁটা, সাইকেল চালানো কিংবা কায়াক ভ্রমণ। সামুদ্রিক পরিবেশ রক্ষার জন্য অবশ্য যত্রতত্র সাঁতার কাটার অনুমতি নেই। নির্ধারিত কালা জিওভান্নাতেই সাঁতার কাটা যায়।
ছোট বন্দর এলাকার দা ব্রুনেল্লো পিয়ানোসার একমাত্র ক্যাফে-রেস্তোরাঁ। স্থানীয় মাছ ও দ্বীপে উৎপাদিত তাজা সবজি দিয়ে তৈরি খাবার এখানকার প্রধান আকর্ষণ। থাকার জন্য রয়েছে আলবের্গো মিলেনা, যা দ্বীপের একমাত্র আবাসন।
এলবা থেকে অ্যাকুয়াভিশনের অনুমোদিত ভ্রমণে প্রায় ৪৫ মিনিটে পিয়ানোসায় পৌঁছানো যায়। এ ছাড়া পিওম্বিনো থেকে তোয়েরামারের সীমিত ফেরি পরিষেবাতেও যাওয়া যায়; এ পথে সময় লাগে প্রায় তিন ঘণ্টা।
জিয়ান্নুত্রি: রাস্তা-বিহীন নিরিবিলি আশ্রয়
এলবার ব্যস্ত পর্যটন পরিবেশের একেবারে বিপরীত ছবি দেখা যায় জিয়ান্নুত্রিতে। ছোট্ট, গাড়িবিহীন এই চুনাপাথরের দ্বীপটি আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা থেকে দূরে নিরিবিলি সময় কাটানোর সুযোগ দেয়। সুগন্ধি বুনো ঝোপঝাড়ে ঢাকা পাহাড়ের ঢাল নেমে মিশেছে গাঢ় নীল সমুদ্রে।
দ্বীপে রয়েছে মাত্র একটি রেস্তোরাঁ-ক্যাফে, সেটিই আবার ছোট মুদি দোকানের কাজও করে। তাই দিনের সফরে যাঁরা আসবেন, তাঁদের সঙ্গে পর্যাপ্ত পানি ও দুপুরের খাবার রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়।
সাঁতারের জন্য পর্যটকদের কাছে কালা স্পালমাতোইও ও কালা মায়েস্ত্রা জনপ্রিয়। উপকূলের বড় একটি অংশ সংরক্ষিত সামুদ্রিক এলাকার অন্তর্ভুক্ত। স্বচ্ছ নীল জল ডাইভিং ও স্নরকেলিংয়ের জন্যও আকর্ষণীয়।
তবে সমুদ্রের সৌন্দর্যের পাশাপাশি ইতিহাসও জিয়ান্নুত্রির অন্যতম আকর্ষণ। ডোমিতিই আহেনোবারবি পরিবারের সঙ্গে যুক্ত একটি প্রাচীন রোমান ভিলার ধ্বংসাবশেষ দেখতে গাইডেড ট্যুরে যাওয়া যায়।
দ্বীপের একমাত্র খাবারের জায়গা লা ভেলা জিয়ান্নুত্রি-তে সামুদ্রিক খাবারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। টুনা টারটার থেকে স্প্যাগেটি আল্লে ভঙ্গোলে—বিভিন্ন পদ পাওয়া যায়।
থাকার সুযোগ খুবই সীমিত। পরিবারের পরিচালনায় থাকা আ কাসা দিয়ানায় রয়েছে সাধারণ ঘর ও সমুদ্রের দৃশ্য। এ ছাড়া দ্বীপে কিছু হলিডে রেন্টালও রয়েছে।
পোর্তো সান্তো স্তেফানো থেকে মারেজিলিওর ফেরিতে জিয়ান্নুত্রি যাওয়া যায়। মরসুমভিত্তিক এক্সকারশন বোটেও পৌঁছানো সম্ভব এবং সময় লাগে প্রায় এক ঘণ্টা। গ্রীষ্মকালে জিলিও ও জিয়ান্নুত্রির মধ্যে এক্সকারশন ও মিনি-ক্রুজের ব্যবস্থাও থাকে।
সূত্র: দ্যা গার্ডিয়ান









