এক দেশে চুইংগাম আমদানি নিষিদ্ধ, অন্য কোথাও রাস্তায় কবুতরকে খাবার দিলেই গুনতে হতে পারে জরিমানা। কোথাও আবার ঐতিহাসিক স্থাপনার সামনে নির্দিষ্ট আচরণ করা বেআইনি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে স্থানীয় সংস্কৃতি, পরিবেশ, পরিচ্ছন্নতা ও জননিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে এমন কিছু নিয়ম চালু রয়েছে, যা অন্য দেশের মানুষের কাছে বেশ অদ্ভুত মনে হতে পারে।
সিঙ্গাপুরের কথা দিয়েই শুরু করা যাক। শহরটির পরিচ্ছন্নতা নিয়ে কড়া নিয়মের কথা বিশ্বজুড়ে পরিচিত। সাধারণ চুইংগাম আমদানির উপর সেখানে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তবে দাঁতের পরিচর্যা বা চিকিৎসার প্রয়োজনে নির্দিষ্ট ধরনের চুইংগামের ক্ষেত্রে অনুমতি রয়েছে। ফলে ‘সিঙ্গাপুরে চুইংগাম একেবারেই নিষিদ্ধ’—বিষয়টি পুরোপুরি ঠিক নয়, মূলত সাধারণ চুইংগাম আমদানির ওপর কড়া বিধিনিষেধ রয়েছে।
ইতালির ভেনিসে রয়েছে আর এক অদ্ভুত নিয়ম। শহরের বিভিন্ন জায়গায় কবুতরকে খাবার দেওয়া নিষিদ্ধ। পর্যটকদের কাছে পাখিকে খাবার দেওয়ার বিষয়টি নিরীহ মনে হলেও, অতিরিক্ত পাখির কারণে ঐতিহাসিক স্থাপনা নোংরা হওয়া এবং পরিচ্ছন্নতার সমস্যা তৈরি হওয়ায় সেখানে এ ধরনের বিধিনিষেধ রয়েছে।
থাইল্যান্ডে রাজপরিবারকে নিয়ে অসম্মানজনক আচরণ করা গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। পর্যটকদের তাই রাজপরিবার সম্পর্কে মন্তব্য বা আচরণের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্ক থাকতে হয়। স্থানীয় আইন না জানার কারণে বিদেশি পর্যটকরাও সমস্যায় পড়তে পারেন।
জাপানেও রয়েছে এমন কিছু নিয়ম, যা বিদেশিদের কাছে অস্বাভাবিক মনে হতে পারে। দেশটির অনেক জায়গায় রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে ধূমপানের উপর স্থানীয় নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। নির্দিষ্ট ধূমপান এলাকায় দাঁড়িয়েই ধূমপান করতে হয়। শহরভেদে নিয়ম আলাদা হতে পারে, তাই পর্যটকদের স্থানীয় নির্দেশিকা মেনে চলতে হয়।
ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে ঐতিহাসিক স্থাপনা ও জনপরিসরের ব্যবহার নিয়েও বেশ কিছু কড়া বিধি রয়েছে। বিশেষ করে বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে ছবি তোলা, অনুষ্ঠান করা কিংবা বড় দল নিয়ে জমায়েতের ক্ষেত্রে স্থানীয় নিয়ম মানতে হয়। নিয়ম ভাঙলে জরিমানার মুখে পড়তে পারেন পর্যটকেরা।
অস্ট্রেলিয়ার কিছু এলাকায় পরিবেশ রক্ষার জন্যও বেশ কড়া বিধিনিষেধ রয়েছে। সমুদ্রসৈকত বা সংরক্ষিত প্রাকৃতিক এলাকায় নির্দিষ্ট প্রাণী, গাছপালা বা প্রাকৃতিক সম্পদ নিয়ে যাওয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা থাকতে পারে। এমনকি কোথাও কোথাও বালি, পাথর বা ঝিনুক সংগ্রহ করাও নিয়মবিরুদ্ধ হতে পারে। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করাই এই ধরনের নিয়মের মূল উদ্দেশ্য।
নিউজিল্যান্ডেও পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বিদেশ থেকে খাবার, উদ্ভিদ বা প্রাণিজ সামগ্রী নিয়ে ঢোকার ক্ষেত্রে কঠোর নিয়ম রয়েছে। বিমানবন্দরে আগত যাত্রীদের সঙ্গে থাকা নির্দিষ্ট খাদ্যসামগ্রী বা কৃষিজ পণ্য ঘোষণা করতে হয়। কারণ বিদেশি জীবাণু বা ক্ষতিকর প্রজাতি দেশের কৃষি ও পরিবেশের ক্ষতি করতে পারে।
সুইজারল্যান্ডের কিছু আবাসিক এলাকায় রাতের নির্দিষ্ট সময়ে শব্দ করা নিয়ে কড়া নিয়ম রয়েছে। প্রতিবেশীদের শান্তি বজায় রাখতে গভীর রাতে উচ্চস্বরে গান বাজানো, চিৎকার করা বা অতিরিক্ত শব্দ তৈরির মতো কাজের উপর স্থানীয় বিধিনিষেধ থাকতে পারে। ফলে রাতে পার্টি করার আগে এলাকার নিয়ম জেনে নেওয়াই নিরাপদ।
ইতালির আরও কিছু শহরে পর্যটকদের আচরণ নিয়েও স্থানীয় বিধি রয়েছে। ঐতিহাসিক স্থাপনা, ফোয়ারা কিংবা স্মৃতিসৌধে বসা, সেখানে খাবার খাওয়া অথবা নির্দিষ্ট ধরনের আচরণ করার উপর নিষেধাজ্ঞা থাকতে পারে। নিয়মগুলি জায়গাভেদে আলাদা হলেও উদ্দেশ্য একটাই ঐতিহাসিক সম্পদ এবং জনপরিসরকে সুরক্ষিত রাখা।
আর সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলিতে প্রকাশ্য স্থানে আচরণ ও পোশাকের ক্ষেত্রে স্থানীয় সংস্কৃতির প্রতি সম্মান দেখানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রকাশ্যে অশালীন আচরণ বা স্থানীয় সামাজিক রীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনও কাজ সমস্যার কারণ হতে পারে। পর্যটকদের তাই স্থানীয় সংস্কৃতি ও আইন সম্পর্কে আগে থেকেই ধারণা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
এই নিয়মগুলির কোনওটি শুনতে অদ্ভুত, আবার কোনওটি প্রথমে বেশ কঠোর বলেও মনে হতে পারে। কিন্তু প্রতিটি দেশের নিজস্ব ইতিহাস, সংস্কৃতি, পরিবেশ এবং সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে এই বিধিনিষেধগুলির যোগ রয়েছে। যে কাজ নিজের দেশে স্বাভাবিক, অন্য দেশে সেটিই আইনভঙ্গ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
তাই বিদেশ ভ্রমণের সময় শুধু কোথায় যাবেন বা কী খাবেন, তা জানলেই হবে না। কোন দেশে কী করা যাবে না, কোন আচরণে জরিমানা হতে পারে এবং স্থানীয় মানুষের সংস্কৃতিকে কী ভাবে সম্মান করতে হবে সেই বিষয়গুলিও জেনে রাখা জরুরি। কারণ অপরিচিত দেশে ছোট্ট একটি ভুলও কখনও কখনও বড় ঝামেলার কারণ হয়ে উঠতে পারে।