ঢাকার ব্যস্ত নগরজীবনের ভেতরেই এমন কিছু জায়গা আছে, যেখানে পা রাখলেই মনে হয় সময় কয়েকশ’ বছর পেছনে ফিরে গেছে। পুরান ঢাকার নারিন্দার ওয়ারীতে অবস্থিত কলম্বো সাহেবের সমাধি তেমনই এক বিস্ময়কর ঐতিহাসিক স্থাপনা।
বলধা গার্ডেনের কাছের খ্রিস্টান কবরস্থানের ভেতরে দাঁড়িয়ে থাকা এই পুরোনো সমাধিসৌধটি ঢাকার ইউরোপীয় বণিক, মিশনারি ও ঔপনিবেশিক সময়ের ইতিহাসের নীরব সাক্ষী। নারিন্দার এই কবরস্থানকে ঢাকার অন্যতম প্রাচীন খ্রিস্টান সমাধিক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
কে ছিলেন কলম্বো সাহেব-এখানেই সবচেয়ে বড় রহস্য। ‘কলম্বো সাহেব’ নামে পরিচিত মানুষটির প্রকৃত পরিচয় আজও নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। ১৮২৪ সালে বিশপ হেবার নারিন্দার খ্রিস্টান কবরস্থান পরিদর্শন করার সময়ও স্থানীয় তত্ত্বাবধায়ক তাঁকে জানান, এটি কলম্বো সাহেব নামের একজন কোম্পানি কর্মচারীর সমাধি। কিন্তু তাঁর পরিচয়, পদ কিংবা জীবনের বিস্তারিত ইতিহাসের নির্ভরযোগ্য তথ্য মেলেনি। আরও বিস্ময়ের বিষয়, সমাধিসৌধের ভেতরে তিনটি কবর থাকলেও সেগুলোর কোনোটি স্পষ্ট এপিটাফ বা পরিচয়ফলক বহন করে না। ফলে রহস্যটি আজও রয়ে গেছে।
কলম্বো সাহেবের সমাধির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক এর স্থাপত্য। বর্গাকার কাঠামোর সঙ্গে অষ্টভুজাকৃতির অংশ, অলংকৃত স্তম্ভ এবং গম্বুজ সব মিলিয়ে এতে ইউরোপীয় সমাধি স্থাপত্যের পাশাপাশি ভারতীয় ও মুঘল স্থাপত্যের প্রভাবও চোখে পড়ে। সমাধিটি খ্রিস্টান কবরস্থানের ‘এফ’ ধরনের সমাধির অন্তর্ভুক্ত।
প্রাচীন এই স্থাপনার আরেকটি বিশেষত্ব হলো— ১৮ শতকের ঢাকার একটি ইউরোপীয় চিত্রকর্মে এর সম্ভাব্য উপস্থিতির কথা গবেষকেরা উল্লেখ করেছেন। ১৭৮৭ সালে ইউরোপীয় শিল্পী জোহান জোফানির আঁকা ‘নাগাপন ঘাট’ চিত্রে যে দুর্গসদৃশ স্থাপনা দেখা যায়, সেটিকে গবেষক ওয়াকার এ খান কলম্বো সাহেবের সমাধি বলে শনাক্ত করেছিলেন।
শুধু সমাধি নয়, পুরান ঢাকার ইতিহাসের দরজা নারিন্দার খ্রিস্টান কবরস্থানেই রয়েছে বিভিন্ন সময়ের ইউরোপীয়দের সমাধি। পুরোনো সমাধিফলকগুলোতে পাওয়া যায় কোম্পানির কর্মচারী, ব্যবসায়ী, ধর্মযাজক ও অন্যান্য ইউরোপীয় বাসিন্দাদের স্মৃতি। ফলে জায়গাটি আসলে ঢাকার কয়েক শত বছরের সামাজিক ও বাণিজ্যিক ইতিহাসের একটি জীবন্ত দলিল।
নতুন করে সংরক্ষণের উদ্যোগ ঐতিহ্যবাহী এই স্থাপনাকে ঘিরে সাম্প্রতিক সময়েও সংরক্ষণ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে কলম্বো সাহেবের সমাধি ও ঐতিহাসিক মুরিশ গেটওয়ের পুনর্নির্মাণ প্রকল্পের উদ্বোধন করা হয়। প্রকল্পটি ওয়ারী খ্রিস্টান সেমেট্রি বোর্ডের উদ্যোগে এবং ব্রিটিশ অ্যাসোসিয়েশন ফর সেমেট্রিজ ইন সাউথ এশিয়া ও কমনওয়েলথ হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় বাস্তবায়িত হয়েছে।
ভ্রমণপ্রেমীদের জন্য পুরান ঢাকার চেনা ভিড়, রিকশার ঘণ্টি আর পুরোনো ভবনের মাঝখানে এই কবরস্থান যেন এক অন্য জগত। এখানে বেড়াতে গেলে শুধু স্থাপত্য দেখলেই হবে না, প্রতিটি পুরোনো সমাধিফলক, প্রতিটি দেয়াল এবং নীরব পথের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ইতিহাসটিও অনুভব করার চেষ্টা করতে হবে।
কলম্বো সাহেবের সমাধি এমন এক ইতিহাসের দরজা, যার ওপাশে রয়েছে পুরান ঢাকার বহুস্তরীয় অতীত। আর সেই দরজার সামনে দাঁড়িয়েও আজকের সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি রয়ে যায়, আসলে কে ছিলেন এই রহস্যময় কলম্বো সাহেব?