মন্দির, পাহাড় আর রাজস্থানি ঐতিহ্যে ভরা এক অন্যরকম ভ্রমণ ঠিকানা সিকার

রাজস্থান বলতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে জয়পুরের গোলাপি প্রাসাদ, জয়সলমেরের সোনালি মরুভূমি কিংবা উদয়পুরের হ্রদ। কিন্তু এই পরিচিত পর্যটনকেন্দ্রগুলোর বাইরে রাজস্থানের এমন কিছু জায়গা রয়েছে, যেখানে ইতিহাস, ধর্মীয় আবহ, পাহাড়ি প্রকৃতি আর পুরনো রাজস্থানি স্থাপত্য একসঙ্গে মিশে আছে। তেমনই একটি আকর্ষণীয় গন্তব্য সিকার। রাজস্থানের শেখাওয়াটি অঞ্চলের এই শহর ও তার আশপাশ ভ্রমণপ্রেমীদের জন্য এনে দিতে পারে একেবারেই ভিন্ন অভিজ্ঞতা।

এখানে ধর্মীয় আবহ, পাহাড়ি প্রকৃতি আর পুরনো রাজস্থানি স্থাপত্য একসঙ্গে মিশে আছে (ছবি: সংগৃহীত)

সিকারের অন্যতম আকর্ষণ এর পুরনো শহরের ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্য। রঙিন হাভেলি, পুরনো প্রাসাদ, ছত্রি এবং দেওয়ালজুড়ে আঁকা সূক্ষ্ম ফ্রেস্কোচিত্র শেখাওয়াটির নিজস্ব শিল্পরীতির পরিচয় বহন করে। পুরনো শহরের সরু রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে একদিকে যেমন রাজস্থানের প্রাচীন বণিকসমাজের ঐতিহ্যের ছোঁয়া পাওয়া যায়, অন্যদিকে তেমনই চোখে পড়ে অসাধারণ সব দেওয়ালচিত্র। ইতিহাস ও স্থাপত্য ভালোবাসেন এমন পর্যটকদের জন্য সিকারের এই অংশটি বিশেষ আকর্ষণীয়। 

সিকার ভ্রমণের সঙ্গে ধর্মীয় পর্যটন জুড়তে চাইলে গন্তব্যের তালিকায় সবার আগে রাখতে পারেন খাটু শ্যামজি। সিকার জেলার খাটু গ্রামে অবস্থিত এই বিখ্যাত মন্দিরকে ঘিরে সারা বছরই ভক্তদের আনাগোনা থাকে। মন্দিরের আশপাশে রয়েছে শ্যামকুণ্ড, শ্যামবাগিচা এবং গৌরীশঙ্কর মন্দিরের মতো দর্শনীয় স্থান। বিশেষ উৎসবের সময় গোটা এলাকা ভক্তদের সমাগমে মুখর হয়ে ওঠে। 

সিকার থেকে আরেকটি আকর্ষণীয় গন্তব্য জীনমাতা মন্দির। পাহাড়ের উপরে অবস্থিত এই মন্দিরে যাওয়ার পথেই মিলবে রাজস্থানের শুষ্ক ভূপ্রকৃতির মধ্যে পাহাড়ি সৌন্দর্যের অন্যরকম স্বাদ। মন্দিরের আশপাশের উঁচুনিচু ভূমি ও দূরের বিস্তৃত প্রাকৃতিক দৃশ্য ভ্রমণকে আরও মনোরম করে তোলে। কাছেই রয়েছে কাজল শিখর ও হর্ষনাথ ভৈরুজির মতো দর্শনীয় স্থান। সিকার থেকে জীনমাতা মন্দিরের দূরত্ব প্রায় ২৯ কিলোমিটার।

প্রকৃতি ও ইতিহাস দুইয়ের স্বাদ একসঙ্গে পেতে চাইলে ঘুরে আসতে পারেন হর্ষনাথ মন্দির থেকে। পাহাড়ের ওপর অবস্থিত প্রাচীন এই শিবমন্দির শুধু ধর্মীয় গুরুত্বের জন্য নয়, চারপাশের বিস্তৃত দৃশ্যের জন্যও আকর্ষণীয়। উঁচু স্থান থেকে রাজস্থানের বিস্তীর্ণ ভূদৃশ্য দেখার অভিজ্ঞতা সিকার ভ্রমণে আলাদা মাত্রা যোগ করে। 

সিকার ঘুরতে গেলে পুরনো শহরের ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যের পাশাপাশি আশপাশের শেখাওয়াটি অঞ্চলের হাভেলিগুলিও দেখা যেতে পারে। বিশেষ করে ফতেহপুর ও লক্ষ্মণগড়ের মতো এলাকায় রাজস্থানি বণিকদের তৈরি পুরনো হাভেলি ও দেওয়ালচিত্র এই অঞ্চলের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গল্প বলে। ফলে সিকারকে শুধু একটি ধর্মীয় গন্তব্য হিসেবে না দেখে ইতিহাস, স্থাপত্য ও সংস্কৃতির ভ্রমণ হিসেবেও উপভোগ করা যায়। 

রাজস্থানি সংস্কৃতি এখানকার প্রধান আকর্ষণ (ছবি: সংগৃহীত)

কীভাবে যাবেন

সিকার রাজস্থানের গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোর সঙ্গে সড়ক ও রেলপথে যুক্ত। বিমানে গেলে জয়পুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ব্যবহার করা সুবিধাজনক। জয়পুর থেকে সড়কপথে সিকার যাওয়া যায়। ট্রেনে এলে সিকার জংশন ব্যবহার করা যায়। আর যদি মূল লক্ষ্য হয় খাটু শ্যামজি মন্দির, তাহলে রিংগাস জংশন সবচেয়ে সুবিধাজনক রেলস্টেশনগুলোর একটি। সেখান থেকে খাটুর দূরত্ব প্রায় ১৭ কিলোমিটার এবং স্থানীয় ট্যাক্সি, জিপ বা অটো পাওয়া যায়। জয়পুর থেকে খাটু শ্যামজির দূরত্ব প্রায় ৮০ কিলোমিটার। 

কোথায় থাকবেন

সিকারে থাকতে চাইলে শহরের বিভিন্ন হোটেলে থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। শহরকে ঘাঁটি করে সিকার, জীনমাতা, হর্ষনাথ ও আশপাশের ঐতিহাসিক এলাকা ঘোরা সুবিধাজনক। সিকারের হোটেল পার্ক অ্যাভিনিউ অ্যান্ড রিসোর্টস, হোটেল রয়্যাল ইন কিংবা হোটেল অন্নপূর্ণা রিজেন্সির মতো হোটেল বিবেচনা করা যেতে পারে।

ঐতিহ্যবাহী পোশাকে ও নৃত্যে ব্যস্থা রাজস্তানি নারীরা (ছবি: সংগৃহীত)

আর যদি খাটু শ্যামজিকে কেন্দ্র করে ভ্রমণের পরিকল্পনা করেন, তাহলে মন্দিরের কাছাকাছি থাকা আরও সুবিধাজনক। খাটুতে হোটেল লাখদাতার, রাধে কি হাভেলি অথবা হোটেল এমবি নিরালা শ্যামের মতো থাকার বিকল্প রয়েছে।

কখন যাবেন

সিকার ভ্রমণের জন্য অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়টা তুলনামূলকভাবে আরামদায়ক। এই সময় রাজস্থানের আবহাওয়া তুলনামূলক শীতল থাকে, ফলে শহর ঘোরা, মন্দির দর্শন কিংবা পাহাড়ি এলাকায় যাওয়া বেশি উপভোগ্য হয়। বিশেষ করে সকাল ও বিকালের আলোয় পুরনো হাভেলির স্থাপত্য এবং পাহাড়ি এলাকার দৃশ্য আরও সুন্দর লাগে। 

রাজস্থানের পরিচিত পর্যটনকেন্দ্রগুলোর বাইরে একটু অন্যরকম অভিজ্ঞতা খুঁজলে সিকার হতে পারে দারুণ একটি পছন্দ। এখানে এক ভ্রমণেই মিলবে পুরনো হাভেলির শিল্প, রাজস্থানি সংস্কৃতির আবহ, পাহাড়ের ওপর প্রাচীন মন্দির, ধর্মীয় পরিবেশ এবং মরুপ্রদেশের স্বতন্ত্র ভূদৃশ্য। তাই রাজস্থান ভ্রমণের নতুন পরিকল্পনায় জয়পুর-জয়সলমেরের পাশাপাশি চাইলে সিকারকেও রাখা যেতে পারে ভ্রমণের বিশেষ ঠিকানা হিসেবে।