এক পাথর কেটেই তৈরি বিশ্বের বৃহত্তম একশিলা মন্দির

ভারতের মহারাষ্ট্রে এমন এক স্থাপত্য রয়েছে, যা দেখলে প্রথমে বিশ্বাসই হতে চায় না। এটি পাথর দিয়ে তৈরি কোনও সাধারণ মন্দির নয়। একটি বিশাল পাহাড়ের পাথর কেটে খোদাই করেই তৈরি করা হয়েছে পুরো মন্দিরটি। বিশ্বের বৃহত্তম একশিলা স্থাপনা হিসেবে পরিচিত এই বিস্ময়কর স্থাপত্যের নাম কৈলাস মন্দির।

মহারাষ্ট্রের ছত্রপতি সম্ভাজিনগরের কাছে অবস্থিত ইলোরা গুহার ১৬ নম্বর গুহায় রয়েছে মন্দিরটি। ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ ইলোরা গুহার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ এই কৈলাস মন্দির। ইতিহাস, ধর্ম, ভাস্কর্য ও প্রাচীন স্থাপত্যের অনন্য সমন্বয়ের কারণে এটি ভারতের অন্যতম বিস্ময়কর ভ্রমণগন্তব্য।

পাথর জুড়ে নয়, পাথর কেটেই তৈরি

সাধারণত একটি মন্দির নির্মাণের সময় পাথরের ব্লক কেটে এনে একটির সঙ্গে আরেকটি জুড়ে দেওয়া হয়। কৈলাস মন্দিরের ক্ষেত্রে ঘটেছে ঠিক উল্টোটা।

কারিগরেরা বিশাল একটি ব্যাসল্ট পাহাড়ের ওপরের অংশ থেকে খোদাইয়ের কাজ শুরু করেন। এরপর ধীরে ধীরে ওপর থেকে নিচের দিকে পাথর সরিয়ে বের করে আনেন মন্দিরের পুরো কাঠামো।

অর্থাৎ, বাইরে থেকে পাথর এনে মন্দির তৈরি করা হয়নি। বরং যে পাহাড়টি সেখানে আগে থেকেই ছিল, সেটির বাড়তি অংশ কেটে বাদ দিয়ে ধীরে ধীরে মন্দিরের আকৃতি তৈরি করা হয়েছে।

গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের তথ্য অনুযায়ী, একটি মাত্র পাথর থেকে খোদাই করে তৈরি বিশ্বের সবচেয়ে বড় স্থাপনা হিসেবে কৈলাস মন্দিরের স্বীকৃতি রয়েছে। এর দৈর্ঘ্য প্রায় ৫০ মিটার, প্রস্থ ৩৩ মিটার এবং সর্বোচ্চ উচ্চতা প্রায় ৩০ মিটার।

সরানো হয়েছিল লাখ লাখ টন পাথর

এত বিশাল স্থাপনা তৈরি করতে কতটা পাথর কাটা হয়েছিল, তার সঠিক হিসাব জানা যায় না। তবে গিনেসের অনুমান, নির্মাণকাজের সময় প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ টন ব্যাসল্ট পাথর সরিয়ে ফেলা হয়েছিল।

এই পদ্ধতিতে ভুল করার সুযোগ ছিল অত্যন্ত কম। কারণ একবার পাহাড়ের কোনও অংশ কেটে ফেলা হলে সেটি আবার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার কোনও সুযোগ ছিল না।

তাই কারিগরদের আগে থেকেই অত্যন্ত নিখুঁতভাবে পরিকল্পনা করতে হয়েছিল কোথায় কতটা পাথর থাকবে, কোথায় স্তম্ভ তৈরি হবে, কোথায় ভাস্কর্য থাকবে এবং কীভাবে পুরো মন্দিরের কাঠামো বের করে আনা হবে।

শিবের আবাস কৈলাসের আদলে

কৈলাস মন্দির উৎসর্গ করা হয়েছে ভগবান শিবকে। হিন্দু ঐতিহ্যে কৈলাস পর্বতকে শিবের আবাসস্থল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সেই পৌরাণিক কৈলাস পর্বতের আদলেই মন্দিরটির নকশা করা হয়েছে।

মন্দির কমপ্লেক্সে রয়েছে প্রধান উপাসনাস্থল, স্তম্ভবেষ্টিত হল, ছোট ছোট উপাসনালয় এবং অসংখ্য পাথরখোদাই করা ভাস্কর্য।

এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ভাস্কর্যগুলোর একটি হলো রাবণের কৈলাস পর্বত তুলে ধরার দৃশ্য। পাথরের ওপর এমন সূক্ষ্ম ও জীবন্তভাবে দৃশ্যটি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে যে, প্রাচীন শিল্পীদের দক্ষতা দেখে আজও বিস্মিত হন দর্শনার্থীরা।

‘গুহা’ হলেও দেখতে গুহার মতো নয়

কৈলাস মন্দিরকে ইলোরা গুহার ১৬ নম্বর গুহা বলা হলেও এটি সাধারণ গুহার মতো নয়। এখানে কোনো অন্ধকার, সরু পাহাড়ি কক্ষে প্রবেশের অভিজ্ঞতা নেই।

বরং সামনে খুলে যায় বিশাল একটি খোলা প্রাঙ্গণ। চারপাশে স্তম্ভ, উপাসনাস্থল, ভাস্কর্য ও বিশাল পাথরের কাঠামো দেখে মনে হতে পারে এটি বুঝি আলাদা আলাদা পাথর দিয়ে তৈরি কোনো মন্দির।

কিন্তু আসল বিস্ময়টি হলো, এই পুরো স্থাপত্যই একই মূল পাথরের অংশ খোদাই করে তৈরি।

ইলোরা মানেই শুধু কৈলাস নয়

কৈলাস মন্দির ইলোরা গুহার সবচেয়ে বিখ্যাত আকর্ষণ হলেও পুরো প্রত্নস্থাপনাটি আরও অনেক সমৃদ্ধ। এখানে বৌদ্ধ, হিন্দু ও জৈন ধর্মের বিভিন্ন গুহা ও স্থাপত্য রয়েছে।

ইউনেসকোর তথ্য অনুযায়ী, ইলোরা এলাকায় রয়েছে ৩৪টি প্রধান গুহা ও স্মৃতিস্তম্ভ। এগুলো প্রায় পঞ্চম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যে কয়েক শতাব্দী ধরে তৈরি হয়েছে।

ফলে ইলোরা ভ্রমণে শুধু কৈলাস মন্দির দেখে ফিরে না এসে অন্য গুহাগুলোও ঘুরে দেখার সুযোগ রয়েছে।

আশপাশে যা দেখবেন

ইলোরা ঘুরতে গেলে কয়েকটি গুহা পর্যটকদের বিশেষভাবে আকর্ষণ করে।

১০ নম্বর গুহা বা কার্পেন্টার’স কেভ: বৌদ্ধ প্রার্থনাকক্ষ হিসেবে পরিচিত। এর অভ্যন্তরের স্থাপত্য বেশ আকর্ষণীয়।

১৫ নম্বর গুহা বা দশাবতার গুহা: হিন্দু ধর্মীয় ভাস্কর্যে সমৃদ্ধ। এখানে বিষ্ণুর বিভিন্ন অবতার-সম্পর্কিত শিল্পকর্ম রয়েছে।

২৯ নম্বর গুহা বা ধুমার লেনা: বড় আকারের হিন্দু গুহা, যার দেয়ালজুড়ে রয়েছে অসাধারণ ভাস্কর্য।

জৈন গুহাগুলো: ইলোরা গুহার শেষ অংশে থাকা এসব স্থাপনায় সূক্ষ্ম পাথরখোদাইয়ের পাশাপাশি প্রাচীন চিত্রকলার নিদর্শনও রয়েছে।

চোখের সামনে পাথর থেকে বেরিয়ে আসা এক মন্দির

কৈলাস মন্দিরের প্রকৃত বিশালত্ব সবচেয়ে ভালোভাবে বোঝা যায় এর প্রাঙ্গণে দাঁড়ালে। দূর থেকে মনে হতে পারে, বিশাল কোনো পাথরের মন্দির দাঁড়িয়ে আছে সেখানে।

কিন্তু কাছে গিয়ে জানা যায়, এর কোনো অংশই আলাদা পাথরের খণ্ড জুড়ে তৈরি নয়। একটি বিশাল পাহাড়কে ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত খোদাই করে, বাড়তি পাথর সরিয়ে ধীরে ধীরে গড়ে তোলা হয়েছে পুরো মন্দিরটি।

হাজার বছর পরও তাই কৈলাস মন্দির শুধু ধর্মীয় স্থাপনা নয়, প্রাচীন মানুষের প্রকৌশল, শিল্পবোধ ও অসাধারণ পরিকল্পনাশক্তির এক অনন্য নিদর্শন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।