গ্রীষ্মের ছুটিতে নতুন আকর্ষণ বাঘের রাজ্য পান্না ন্যাশনাল পার্ক

ফিচার ডেস্ক
০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৪০আপডেট : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৪০

গ্রীষ্মের ছুটি সামনে রেখে অনেক বাংলাদেশি পরিবারই দেশের বাইরে স্বল্প সময়ের ভ্রমণের পরিকল্পনা করছেন। ভারতের ক্ষেত্রে কলকাতা, দার্জিলিং, সিকিম কিংবা উত্তর ভারতের পাহাড়ি স্থানগুলো বরাবরই বাংলাদেশি পর্যটকদের পছন্দের তালিকায় থাকে। তবে একই ধরনের জনপ্রিয় গন্তব্যে ভিড় এড়াতে চাইলে এবারের ছুটিতে বেছে নেওয়া যেতে পারে ভারতের মধ্যপ্রদেশের তুলনামূলক কম পরিচিত একটি স্থান পান্না ন্যাশনাল পার্ক।

ভারতের মধ্যপ্রদেশের তুলনামূলক কম পরিচিত একটি স্থান পান্না ন্যাশনাল পার্ক (ছবি: সংগৃহীত)

বাঘ, চিতাবাঘ, ঘড়িয়াল, স্লথ ভালুক ও নানা প্রজাতির পাখির আবাসস্থল পান্না শুধু বন্যপ্রাণীপ্রেমীদের জন্য নয়, বিলাসবহুল ভ্রমণ পছন্দ করেন এমন পর্যটকদের জন্যও এটি হয়ে উঠছে আকর্ষণীয় একটি স্থান। বিশেষ করে গ্রীষ্মের সময়টিই এখানে বন্যপ্রাণী দেখার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত সময় বলে বিবেচিত হয়।

সাধারণত গরমের সময় বন্যপ্রাণী ভ্রমণ এড়িয়ে চলার প্রবণতা থাকলেও সাফারির ক্ষেত্রে বিষয়টি অনেকটা উল্টো। এপ্রিল থেকে জুনে তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জঙ্গলের প্রাকৃতিক পানির উৎসগুলো কমে আসে। ফলে বন্যপ্রাণীরা নির্দিষ্ট জলাশয় ও পানির উৎসের আশপাশে বেশি সময় কাটায়। এতে সাফারিতে প্রাণী দেখার সম্ভাবনা বাড়ে।

গাছে আরাম করছে একটি চিতা বাঘ (ছবি: সংগৃহীত)

এ সময় জঙ্গলের গাছপালার ঘনত্বও কিছুটা কমে যায়। ফলে ঘন বনাঞ্চলের ভেতর প্রাণীদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা তুলনামূলক সহজ হয়। শুধু হঠাৎ কোনও প্রাণীর দেখা পাওয়াই নয়, অনেক ক্ষেত্রে তাদের স্বাভাবিক আচরণও বেশ কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণের সুযোগ মেলে।

অর্থাৎ, গ্রীষ্মকালীন সাফারি হতে পারে ক্ষণিকের দর্শনের বদলে বন্যপ্রাণীর জীবনযাপন কাছ থেকে বোঝার একটি সুযোগ।

এই পার্কে রয়েছে খুব কাছ থেকে বন্যপ্রাণীদের জীবনযাপন দেখার সুযোগ (ছবি: সংগৃহীত)

আফ্রিকার খোলা সাভানার তুলনায় ভারতের জঙ্গলে বন্যপ্রাণী খুঁজে বের করার অভিজ্ঞতা অনেক বেশি ধৈর্য ও পর্যবেক্ষণনির্ভর। এখানে প্রাণী দেখার আগে বুঝতে হয় জঙ্গলের বিভিন্ন সংকেত।

কোথাও চিতল হরিণের সতর্কবার্তার ডাক, কোথাও গাছের মগডালে হনুমানের অস্বাভাবিক নড়াচড়া, আবার কোথাও ধুলোর ওপর সদ্য পড়া পায়ের ছাপ। এসবই সাফারির সম্ভাব্য সূত্র। অভিজ্ঞ ন্যাচারালিস্টরা এসব সংকেত বিশ্লেষণ করেই পর্যটকদের বন্যপ্রাণীর কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন।

চিতা বাঘের অলস সময় (ছবি: সংগৃহীত)

ফলে ভারতীয় সাফারি ভ্রমণ জঙ্গলের আচরণ, বন্যপ্রাণীর পারস্পরিক সম্পর্ক এবং প্রকৃতির সূক্ষ্ম পরিবর্তন বোঝারও সুযোগ।

পান্না ন্যাশনাল পার্কের আরেকটি বড় পরিচয় এর বাঘ সংরক্ষণ কার্যক্রম। ২০০০-এর দশকের শেষ দিকে বাঘের সংখ্যা প্রায় বিলুপ্তির পর্যায়ে নেমে যাওয়ার পর ব্যাপক সংরক্ষণ প্রচেষ্টায় পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটে।

বানরের জীবনাচরণ (ছবি: সংগৃহীত)

বর্তমানে পার্কটিতে ৭০টিরও বেশি বাঘ রয়েছে বলে বিভিন্ন শিল্পসূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে চিতাবাঘ, স্লথ ভালুক, ঘড়িয়াল এবং ২০০-রও বেশি প্রজাতির পাখি। ফলে পান্না এখন শুধু বাঘ দেখার জায়গা নয়, বরং একটি সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যময় বাস্তুতন্ত্রের অভিজ্ঞতা নেওয়ার সুযোগও তৈরি করছে।

েএখানে রয়েছে নানা প্রজাতির বন্যপ্রাণী (ছবি: সংগৃহীত)

পান্নার এই ওয়াইল্ডলাইফ অভিজ্ঞতাকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে মধ্য ভারতকেন্দ্রিক বিলাসবহুল ভ্রমণসূচি নিয়ে এসেছে অবেরয় হোটেল এন্ড রিসোর্ট। এর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে দ্যা অবেরয় রাজগার প্যালেস। এটি মণিয়াগড় পাহাড়ে ৭৬ একর বনভূমি ও প্রাকৃতিক হ্রদের মাঝে অবস্থিত প্রায় ৩৫০ বছরের পুরোনো একটি বুন্দেলা প্রাসাদ।

ময়ূরেরও দেখা মেলে এই পার্কে (ছবি: সংগৃহীত)

বুন্দেলা রাজবংশের মহারাজা হিন্দু পতের নির্মিত এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি এক দশকেরও বেশি সময় ধরে সংস্কার করা হয়েছে। সংস্কারের ক্ষেত্রে প্রাসাদের ঐতিহাসিক স্থাপত্যশৈলী সংরক্ষণের পাশাপাশি আধুনিক বিলাসিতাও যুক্ত করা হয়।

প্রাসাদটিতে রয়েছে ৬৫টি কক্ষ ও স্যুট। এর মধ্যে রয়েছে বড় আকারের প্যালেস স্যুট, ব্যক্তিগত পুলসহ ভিলা এবং নিজস্ব বাগান ও টেরেসযুক্ত আবাসন। পাহাড় ও বনভূমির দৃশ্য উপভোগ করার সুযোগও রয়েছে এসব আবাসন থেকে।

এই পার্কে ভ্রমণে মিলবে জঙ্গল ও বন্যপ্রাণীর একেবারে ভিন্ন অভিজ্ঞতা (ছবি: সংগৃহীত)

পান্না ন্যাশনাল পার্কের প্রবেশপথের কাছেই অবস্থান করায় রাজগড় প্যালেস থেকে সাফারিতে যাওয়া তুলনামূলক সহজ। বিশেষভাবে তৈরি ৪x৪ গাড়িতে সকাল ও বিকালের সাফারি এই ভ্রমণসূচির অন্যতম প্রধান আকর্ষণ।

অবেরয়ের নিজস্ব ন্যাচারালিস্টদের সহায়তায় পরিচালিত সাফারিতে বন্যপ্রাণীর পাশাপাশি জঙ্গলের পরিবেশ সম্পর্কেও জানার সুযোগ থাকে। তবে বন্যপ্রকৃতির সঙ্গে যোগাযোগ শুধু পার্কের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রাসাদ-চত্বরেই বিভিন্ন প্রজাতির পাখি, ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণী ও স্থানীয় উদ্ভিদ দেখা যায়।

গ্রীষ্মের সময় এখানে বন্যপ্রাণী দেখার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত (ছবি: সংগৃহীত)

বাংলাদেশি পর্যটকদের জন্য এই ভ্রমণের বাড়তি আকর্ষণ হতে পারে খাজুরাহো। পান্নার বন্যপ্রকৃতির পাশাপাশি একই সফরে ঘুরে দেখা যায় বিখ্যাত খাজুরাহো গ্রুপ অফ মনুমেন্ট, যা ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট।

৯ম থেকে ১২শ’ শতাব্দীর মধ্যে চন্দেল রাজবংশের শাসনামলে নির্মিত খাজুরাহোর মন্দিরগুলো সূক্ষ্ম স্থাপত্য, ভাস্কর্য ও ঐতিহাসিক গুরুত্বের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত। ফলে একটি ভ্রমণেই পাওয়া যায় জঙ্গল, বন্যপ্রাণী, রাজকীয় ঐতিহ্য ও প্রাচীন ভারতীয় স্থাপত্যের স্বাদ।

পান্না ভ্রমণের ক্ষেত্রে যাতায়াতও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দিল্লি থেকে খাজুরাহোতে সরাসরি ফ্লাইট যোগাযোগ থাকায় পর্যটকদের জন্য যাত্রাপথ তুলনামূলক সহজ হয়। বাংলাদেশ থেকে দিল্লি হয়ে এই অঞ্চলে যাওয়ার পরিকল্পনা করা যায়।

স্বল্প সময়ের মধ্যে একাধিক অভিজ্ঞতা নিতে চান এমন পর্যটকদের কাছে এই ধরনের ভ্রমণসূচি বিশেষভাবে আকর্ষণীয় হতে পারে। বিশেষ করে যারা একই সফরে ওয়াইল্ডলাইফ, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও বিলাসবহুল থাকার অভিজ্ঞতা চান, তাদের জন্য পান্না-খাজুরাহো একটি ভিন্নধর্মী বিকল্প।

বাংলাদেশ থেকে ভারতে ভ্রমণের ক্ষেত্রে পরিচিত স্থানের বাইরে নতুন কিছু দেখতে চাইলে পান্না হতে পারে আকর্ষণীয় একটি বিকল্প। গ্রীষ্মের ছুটিতে পাহাড়ি পর্যটনকেন্দ্রের ভিড় এড়িয়ে এখানে পাওয়া যেতে পারে জঙ্গল ও বন্যপ্রাণীর একেবারে ভিন্ন অভিজ্ঞতা।

আর বিলাসবহুল আবাসন, ব্যক্তিগত সাফারি অভিজ্ঞতা, ঐতিহাসিক প্রাসাদ, খাজুরাহোর মন্দির এবং মধ্য ভারতের প্রকৃতি সব মিলিয়ে এটি হয়ে উঠতে পারে একটি পূর্ণাঙ্গ বিলাসবহুল ভ্রমণ।

আজকের বিলাসবহুল ভ্রমণের সংজ্ঞাও বদলাচ্ছে। শুধু দামি হোটেল বা বিলাসবহুল কক্ষ নয়, বরং একটি গন্তব্যের স্বকীয়তা, প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগ, ইতিহাস-ঐতিহ্যের গভীরতা এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার মানই হয়ে উঠছে ভ্রমণের আসল বিলাসিতা। সেই জায়গা থেকে দেখলে, পান্না বাংলাদেশের পর্যটকদের জন্যও গ্রীষ্মের ছুটিতে ভারতের একটি নতুন ও সম্ভাবনাময় গন্তব্য হতে পারে।

/এমএএল/
সম্পর্কিত
‘বাঙালি মাছ-মাংস খাবেই’, বাঘেশ্বর বাবাকে রাজ্য বিজেপির জবাব
নীল তিমির রাজ্যে মরুভূমির দ্বীপ লোরেতোয় মিলবে অ্যাডভেঞ্চারের স্বাদ
পুঠিয়ার প্রাচীন মন্দিরপল্লিতে অনন্য স্থাপত্যের বড় আহ্নিক মন্দির
সর্বশেষ খবর
আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক দল নয়, মাফিয়া গ্যাং: তথ্য উপদেষ্টা
আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক দল নয়, মাফিয়া গ্যাং: তথ্য উপদেষ্টা
বাঁধনকে হেনস্তার ঘটনায় ক্ষুব্ধ মম, জানালেন, ‘এই অবস্থা চলতে থাকলে গৃহযুদ্ধ আসন্ন’
বাঁধনকে হেনস্তার ঘটনায় ক্ষুব্ধ মম, জানালেন, ‘এই অবস্থা চলতে থাকলে গৃহযুদ্ধ আসন্ন’
সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহার, আপত্তি বিজিএমইএ-বিকেএমইএর
সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহার, আপত্তি বিজিএমইএ-বিকেএমইএর
ধর্ষণ-হত্যা মামলার আসামিকে গুলি করে হত্যা, একজন গ্রেফতার
ধর্ষণ-হত্যা মামলার আসামিকে গুলি করে হত্যা, একজন গ্রেফতার
সর্বাধিক পঠিত
৪০০ হিট, ৫০ ব্লকবাস্টার: অমিতাভ-শাহরুখ-রজনীকান্তকে পেছনে ফেলা ভারতের সবচেয়ে সফল অভিনেতা
৪০০ হিট, ৫০ ব্লকবাস্টার: অমিতাভ-শাহরুখ-রজনীকান্তকে পেছনে ফেলা ভারতের সবচেয়ে সফল অভিনেতা
সিগারেটের দাম বাড়লো ৩ টাকা, মন্ত্রিসভায় অনুমোদন
সিগারেটের দাম বাড়লো ৩ টাকা, মন্ত্রিসভায় অনুমোদন
দুধে ডিটারজেন্ট আছে কি না সহজে জানবেন যেভাবে
দুধে ডিটারজেন্ট আছে কি না সহজে জানবেন যেভাবে
হিজড়া ‘গুরুমাকে’ হত্যা করে আরেক নেত্রীর ঘরে আশ্রয়, জানালেন খুনের কারণ
হিজড়া ‘গুরুমাকে’ হত্যা করে আরেক নেত্রীর ঘরে আশ্রয়, জানালেন খুনের কারণ
গতকাল নতুন বাসায় উঠেছিলেন চিকিৎসক, আজ মিললো লাশ
গতকাল নতুন বাসায় উঠেছিলেন চিকিৎসক, আজ মিললো লাশ